সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মানুষের কাছে বন্যা খুব স্বাভাবিক বিষয়। নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। হাওরবেষ্টিত এই উপজেলা প্রতি বছরই কমবেশি বন্যা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তবে এ বছর দফায় দফায় হওয়া বন্যার সঙ্গে লড়তে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠেছেন সেখানকার বাসিন্দরা। এবার তাদের করতে হচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াই। তবে বন্যার ৮ দিন পেরিয়ে গেলেও সুনামগঞ্জ ও সিলেটের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি। এখনো বিদ্যুৎহীন পুরো উপজেলা। স্বাভাবিক হয়নি মোবাইল নেটওয়ার্কও। হাসপাতাল, ব্যাংকসহ বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় সেবাও পুরোপুরি বন্ধ। প্রবল স্রোত আর ঢেউয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে ত্রাণ সরবরাহও। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি না হলেও বানভাসিদের দুর্ভোগ কমেনি। ফসল-মাছ ভেসে যাওয়ায় উপজেলার কৃষকরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।
দিরাই উপজেলা শহরের নৌকাঘাট এলাকায় স্থানীয়রা জানান, তাদের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। খাবার নেই, সুপেয় পানি নেই, নেই জরুরি চিকিৎসা সেবাও। কিন্তু তাদের এই অবস্থায়ও সংসদ সদস্য জয়া সেনগুপ্তকে এলাকায় দেখা যায়নি।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম চৌধুরী বলেন, বিপদের দিনে সংসদ সদস্য এখনো এলাকায় ফেরেননি। আসলে নৌকা ছাড়া যোগাযোগ করা যায় না। তারপরও উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ আমরা কাজ করে যাচ্ছি, ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছি। এখানে আরও ত্রাণ-সহায়তা দরকার।
সেনাবাহিনীর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা টিমের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন জানান, সেনাবাহিনী এমভি বোটের মাধ্যমে মানুষকে উদ্ধার করে নিয়ে এসে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে তুলে দিচ্ছে, জরুরি মেডিকেল সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ত্রাণ বিতরণ করতে আসা বেসরকারি ব্যক্তি ও সংস্থাকে সহযোগিতা করছে। তবে যোগাযোগ সংকটের কারণে উদ্ধার ও ত্রাণ সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে।
গতকাল সরেজমিনে দিরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, আগের বন্যায় বেশিরভাগ কৃষকই বোরো ধান হারিয়েছেন। আধা-পাকা যে ধান তুলতে পেরেছিলেন, এবার ঘরে থেকেই তা নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বছরের বাকি দিনগুলো কী করে কাটবে সে চিন্তায় দিশাহারা কৃষকরা। উপজেলা চেয়ারম্যান মঞ্জুর আলম বলেন, তার উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধান বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে।
এদিকে কৃষকদের মতো চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন মৎস্য চাষিরা। সুজানগর, শরিফপুর, শ্যামাপুর, বোয়াল্লাবাজার গ্রামের মৎস্য চাষিরা জানান, এবার বন্যায় তাদের অন্তত ১০ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। কেবল সুজানগর গ্রামেই ভেসে গেছে ৫ কোটি টাকার মাছ।
এদিকে সুনামগঞ্জ জেলার অন্যান্য উপজেলায় যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে, মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক হচ্ছে সেখানে দিরাই উপজেলায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। এখানে বিদ্যুৎ নেই, কবে বিদ্যুতের লাইন ঠিক হবে কেউ বলতে পারে না। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ব্যাংকিং লেনদেনও শুরু করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় এবং নদী ও হাওরের ঢেউ পেরিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয় বলে, দিরাইয়ে এখনো এসে পৌঁছায়নি বন্যায় বরাদ্দ পাওয়া সরকারি ত্রাণ।