দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল নামছে। সার্বিকভাবে দেশের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে শনিবার ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, শরীয়তপুর ও কুড়িগ্রামের কয়েকটি এলাকায় নতুন করে বেড়েছে বন্যার পানি। যদিও এ কারণে দুয়েক দিনের মধ্যে দেশের বন্যা পরিস্থিতি সার্বিকভাবে অবনতি হওয়ার শঙ্কা নেই। তবে জুনের শেষে বা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের বন্যা নতুন করে অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে গঙ্গা-পদ্মার উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বর্ষণ হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে ব্রহ্মপুত্রের উজানেও বৃষ্টি বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে দেশে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বন্যার প্রভাবে ও বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ জনে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে মৃত্যুর সংখ্যা ৮৪। এর মধ্যে পানিতে ডুবেই মৃত্যু হয়েছে ৫৮ জনের। গতকাল বিকেলে দেশের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম।
গতকাল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। বন্যাপ্রবণ নিম্নাঞ্চল কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও জামালপুরেও পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে পদ্মাপাড়ের তিন জেলা মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও মুন্সীগঞ্জের নিচু এলাকা প্লাবনের ঝুঁকিতে আছে এই সময়ে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুসারে, তিস্তা অববাহিকা ব্যতীত আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এবং ভারতের বিভিন্ন উজানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নেই। তবে একই সময়ে উত্তর হিমালয় পশ্চিমবঙ্গে (জলপাইগুড়ি এবং সিকিম) মাঝারি থেকে ভারী ধরনের বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এখন নতুন করে ভারী বর্ষণ শুরু হলে দেশের বন্যাপরিস্থিতি ফের খারাপ হতে পারে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা।
গতকাল আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, জুনের শেষে বা জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকতে পারে। অধিদপ্তরের পূর্বাভাস মতে, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে।
ভারতের আবহাওয়া দপ্তর বলছে, সোমবার সকালের মধ্যে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ারের কোনো কোনো জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বাকি জেলাগুলোর কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা অর্থাৎ ২৮ জুন মঙ্গলবার সকালের মধ্যে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারের কোনো কোনো জায়গায় ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বাকি জেলাগুলোর কোথাও কোথাও হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। এ পানি ভাটিতে নামলে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি থাকতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এদিকে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও সংবাদদাতাদের পাঠোনো তথ্যমতে, সিলেট অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও মানুষের দুর্ভোগ কমছে না। সুনামগঞ্জে বন্যার পানি কমায় জেলা ও উপজেলা শহরের বাসিন্দারা বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও গ্রামের মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। হবিগঞ্জে বন্যার কারণে আট দিন ধরে ছয়টি উপজেলার প্রায় ২০০ গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। সিলেট শহরে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আর নেত্রকোনায় ৩৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো প্রায় সোয়া লাখ মানুষ অবস্থান করছে।
সুনামগঞ্জে পাঁচ দিন ধরে বৃষ্টি হয়নি। এ সময় পাহাড়ি ঢলও নামেনি। এতে জেলার বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। তবে ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়ক এখনো তলিয়ে আছে। আর গ্রামে বাড়িঘর থেকে পানি না নামায় ফিরতে পারছে না অনেকে।
নেত্রকোনার ১০টি উপজেলায় বন্যায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪১০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি কমায় এরই মধ্যে কোনো কোনো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়িতে ফিরেছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নেত্রকোনার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি ও মদন উপজেলা। পাঁচটি উপজেলায় এখনো পানিবন্দি তিন লক্ষাধিক মানুষ। খালিয়াজুড়িতে গতকাল থেকে ফের বাড়তে শুরু করেছে পানি।
নীলফামারীতে তিস্তার পানি বিপদসীমার নিচে রয়েছে। জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। লালমনিরহাট জেলার দোয়ানীতে অবস্থিত তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে ২০ জুন পানি বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। এরপর ২১ জুন সন্ধ্যায় ওই পয়েন্টে পানি ছিল বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপরে। তবে ২২ জুন থেকে দফায় দফায় পানি কমতে থাকে। গতকাল বেলা ৩টায় পানি ছিল বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচে।
পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে।