শরীয়তপুরের পরিবহন খাতের পুনর্জন্ম

সকাল ৮টা ৪০ মিনিট। শরীয়তপুর কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড থেকে স্বস্তির যাত্রা শুরু করল ১৫টি চেয়ার কোচ। প্রতিটি বাসের যাত্রী ধারণক্ষমতা ৪২। পদ্মা সেতু দিয়ে প্রথম যাত্রার সঙ্গী হতে বাসস্ট্যান্ডে হাজির প্রায় ২ হাজার যাত্রী! তবে প্রথম দিনের স্বপ্নযাত্রার সঙ্গী হতে পেরেছেন মাত্র ৬৩০ জন। যাত্রীরা বলছেন, পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে শরীয়তপুর থেকে প্রথম দিনের যাত্রী হতে পারাটা ইতিহাসের ও গৌরবের।

গতকাল রবিবার পদ্মা সেতু দিয়ে যাত্রা শুরুর মাধ্যমে কয়েক যুগের ঝুঁকি ও কষ্টের অবসান ঘটল শরীয়তপুরের বাসযাত্রীদের।

শরীয়তপুর পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ফারুক আহমেদ তালুকদার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ভগ্নদশায় থাকা শরীয়তপুরের পরিবহন খাত পদ্মা সেতুর কারণে পুনর্জন্ম পেল। এ যে কী আনন্দের ও স্বস্তির, তা কেবল আমরা মালিক পক্ষই শুধু অনুভব করছি না। এই স্বস্তি ছড়িয়ে পড়েছে জেলার প্রতিটি যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিকের মাঝে।’  

শরীয়তপুর পৌরসভার পশ্চিম কোটাপাড়া গ্রামের আলী আহমেদ খান (৭৬) বলেন, ‘দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে আরামদায়ক গাড়িতে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে নিরাপদ যাত্রা ছিল আমাদের জন্য স্বপ্নের মতো। আমি প্রথম বাসের যাত্রী হতে পেরে আনন্দে আত্মহারা। এ যে কী আনন্দের তা বলে বোঝানো যাবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারণেই আমাদের শরীয়তপুরবাসীর এ নিরাপদ যাত্রা শুরু হলো। তার জন্য শরীয়তপুরবাসীর পক্ষ থেকে অফুরন্ত দোয়া রইল।’

শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর পালং গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তারা মোল্লা (৫২) বলেন, ‘গত শুক্রবার পর্যন্ত আমাদের ঢাকা যাওয়া ছিল ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টদায়ক ভ্রমণ। কিন্তু তা এখন কেবলই স্মৃতি।’

যাত্রীদের স্বস্তির ভ্রমণ নিশ্চিত করতে শরীয়তপুর সুপার সার্ভিস প্রাইভেট কোম্পানি, শরীয়তপুর পদ্মা ট্রাভেলস, শরীয়তপুর পরিবহন ও গ্লোরি এক্সপ্রেস নামে প্রস্তুত হচ্ছে বিলাসবহুল বাস।

ঢাকা থেকে সাড়ে চার ঘণ্টায় বরিশাল : পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর গতকাল রবিবার সকাল ৮টায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে রওনা দিয়ে বেলা সাড়ে ১২টায় বরিশালে পৌঁছে গেছে বাস। কোনো ভোগান্তি ছাড়াই সরাসরি বরিশালে পৌঁছতে পেরে খুশি বাসযাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। ফেরিতে যে পদ্মা পাড়ি দিতে প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগে যেত সেই পদ্মা পার হয়েছেন মাত্র ৭ মিনিটে।

গতকাল সকালে বরিশাল নগরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদে গিয়ে কথা হয় যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে। তারা জানান, এমন অনুভূতির কথা মুখে প্রকাশ করার মতো নয়। একসময়ে বাসে করে ঢাকা থেকে বরিশালে আসতে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগে যেত।

ইলিশ পরিবহনের যাত্রী ব্যবসায়ী রবিউল হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে যখন গাড়িটি আমাদের নিয়ে পার হচ্ছিল তখন আলাদা এক অনুভূতি কাজ করেছে। মন চাচ্ছিল গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলিÑ এটা আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু।’

রবিউলদের বরিশালে পৌঁছে দেওয়া বাসচালক এনামুল হোসেন বলেন, ‘সকাল ৮টায় যাত্রাবাড়ী থেকে রওনা দিয়া বেলা সাড়ে ১২টায় বরিশাল। নিরাপদেই যাত্রীদের নিয়ে পৌঁছেছি। ফেরি থাকলে দুই ঘণ্টার মতো বেশি সময় লাগত। বর্ষা মৌসুমে আরও বেশি।’

বরিশাল-ঢাকা রুটের সাকুরা কোম্পানির বাসের চালক কাজী আনোয়ার বলেন, ‘ফেরিঘাটে কত সময় বইসা থাহোন লাগছে, আবার ফেরি পার হইতেও তো দেড়-দুই ঘণ্টা লাগত। কিন্তু এহন কোনো কষ্ট নাই, সেতুর টোল দিয়া একটানে পদ্মা পাড়ি দিয়া বরিশাল। হেই সকাল সাড়ে ৮টায় সায়েদাবাদ দিয়া রওনা দিয়া পৌনে ১টায় বরিশাল আইয়া পৌঁছলাম।’

এদিকে বিআরটিসি কাউন্টারে ঢাকাগামী যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় দেখা গেছে। বরিশাল বিআরটিসি ডিপো ইনচার্জ ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমরা এবার বরিশাল-ঢাকার জন্য ১৪টি এসি বাস চালু করেছি। এর মধ্যে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা রুটে দুটি, ভা-ারিয়া একটি ও বরিশাল-ঢাকা রুটে ১১টি এসি বাস সার্ভিস চালু করেছি। বরিশাল থেকে ঢাকার গুলিস্তান পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ৫০০ টাকা।

এক দিনেই বদলে গেল শিমুলিয়া  : স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় পাল্টে গেছে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়াঘাটের চিরচেনা চিত্র। নেই যানবাহন পারাপারের ব্যস্ততা, নেই ঘাটের পরিচিত কোলাহল। সেতু উদ্বোধনের আগের দিন থেকে বন্ধ রয়েছে ফেরি চলাচল। অল্প কয়েকটি স্পিডবোট ও লঞ্চ চলছে কিন্তু যাত্রীদের স্বাভাবিক ভিড়ও ছিল না।

গতকাল রবিবার সকালে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ও শিমুলিয়া-মাঝিকান্দি নৌরুটের শিমুলিয়াঘাটে গিয়ে দেখা গেছে ব্যস্ততম ঘাটের নতুন এই রূপ। 

সেতু চালু হওয়ায় বিআইডব্লিউটিসির ফেরি চলাচল বন্ধের পাশাপাশি ব্যক্তিমালিকানাধীন স্পিডবোট ও লঞ্চের চাহিদা নেমে এসেছে তলানিতে। গতকাল এ নৌরুটে সব মিলিয়ে ১২টি স্পিডবোট ও ৮টি লঞ্চ চলাচল করেছে। ঘাট এলাকায় স্পিডবোটগুলো সারি করে বেঁধে রাখা, লঞ্চগুলো ছিল ঘাটেই নোঙর করা।

মদিনা নামে লঞ্চের মালিক মামুন মোল্লা বলেন, সেতু চালু হওয়ায় আমরা লঞ্চ মালিকরা এখন ক্ষতির মুখে পড়েছি। সরকার যদি আমাদের অন্য কোনো নৌরুটে চলাচলের জন্য অনুমোদন দেয় তাহলে আমরা বেঁচে যাব। তবে এখনো কোনো ধরনের আশ্বাস পাচ্ছি না। এদিকে আমরা প্রায় কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছি।’

মাঝিকান্দি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমার বাড়ি ঘাটের কাছেই। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে গেলে আমাকে অনেক পথ ঘুরে বাড়িতে আসতে হবে। তাই আমি লঞ্চে চড়ে বাড়িতে যাচ্ছি।’ সাবিহা বেগম বলেন, ‘স্পিডবোটে যাচ্ছি তাড়াহুড়ায় একটু সুবিধার কারণে। আমার মতোই স্বল্পসংখ্যক যাত্রী এখন শিমুলিয়াঘাটে এসেছেন। কিন্তু দক্ষিণবঙ্গের লাখো যাত্রী পদ্মা সেতু হয়েই বাড়ি যাবেন। কাজেই শিমুলিয়াঘাটের ব্যস্ততার সেই চিরচেনা চিত্র আর দেখা যাবে না।’

নিউজটি তৈরি করতে সহযোগিতা করেছেন মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর ও বরিশাল প্রতিনিধি