আত্মীয় আর ছাত্রলীগে চাকরি

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) আত্মীয়করণ ও দলীয়করণের অন্যতম দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচ্চপদে থাকা বেশিরভাগ শিক্ষকই প্রভাব খাটিয়ে তাদের সন্তান, জামাই, ভাগ্নে-ভাতিজা, শ্যালক-শ্যালিকাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া যারা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের উচ্চপদে রয়েছেন তারা নিজেরা বা তাদের বান্ধবীদের চাকরি নিশ্চিত করেছেন।

রাজধানীতে অবস্থিত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত দিনে হওয়া নিয়োগ পর্যালোচনা ও চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার অনুষদের অধীনে ৩৫টি বিভাগ রয়েছে। ইনস্টিটিউট রয়েছে একটি। বর্তমানে হল আছে পাঁচটি। দুটি নির্মাণাধীন।

নাম প্রকাশ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মীয়তার সূত্রে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীই তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেন না। যার প্রভাব পরে শিক্ষার্থীদের ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও তারা পেয়ে যান আত্মীয়তার জোরে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে দেড় শতাধিক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর ৮০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই প্রভাষক পদ। একই তারিখে একাধিক সেকশন অফিসার ও সমমানের প্রথম শ্রেণির পদ ও দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি মিলিয়ে ৮৫ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। যদিও সেকশন অফিসার পদের সংখ্যা বিজ্ঞাপিত পদের চেয়ে বাড়বে বলে জানা গেছে। এসব নিয়োগে এখনো প্রবেশপত্র ইস্যু হয়নি। ছাত্রলীগ, প্রভাবশালী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের তদবিরের কারণে ব্যাপক চাপ তৈরি হওয়ায় প্রবেশপত্র ইস্যু করতে দেরি হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ছাত্রলীগের নেতা ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থরা একাধিক প্রার্থী নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। কমপক্ষে ২০ জন ছাত্রলীগ নেতার চাকরি অনেকটা নিশ্চিত বলেও আলোচনা রয়েছে।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে সবসময়ই কিছু না কিছু চাপ আসে। তবে আমরা এসব চাপের ঊর্ধ্বে থেকে নিয়োগের চেষ্টা করছি, যাতে কোনো বিতর্ক না হয়। আমরা চাচ্ছি, শুধু মৌখিক পরীক্ষা নয়, এবারের নিয়োগে লিখিত পরীক্ষাও নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দ্রুত নিয়োগের জন্য বলেছেন। তবে আমি বলেছি, আগে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হবে। এরপর আমরা শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে যাব।’

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের দুজন উপাচার্যের নিয়োগ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমান উপাচার্য ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়ার ছেলে আব্দুল কাফি খামার বিভাগে কর্মরত আছেন। শহীদুর রশীদ আগের মেয়াদে উপ-উপাচার্য ছিলেন। ওই সময় তার ছেলের চাকরি হয়। এর আগের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের মেয়ে, জামাই, ভাগ্নে ও শ্যালক শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। যদিও তার জামাই অধ্যাপক ড. হাসানুজ্জামানের যোগ্য ও ভালো গবেষক হিসেবে খ্যাতি রয়েছে। এ ছাড়া সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শাদাত উল্লার শ্যালক বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও শ্যালিকা ডেপুটি রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে রয়েছেন। সাবেক কোষাধ্যক্ষ ড. আনোয়ারুল হক বেগের মেয়ে তাহরিমা হক বেগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও শেরেবাংলায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিলেন, কিন্তু উত্তীর্ণ না হওয়ায় ভর্তি হতে পারেননি। ড. বেগের ভাতিজা নাজমুল আহসান বেগ কর্মকর্তা হিসেবে আছেন। এছাড়া কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের ভাতিজি ও জামাই শিক্ষক পদে কর্মরত। ড. মিজান ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক থাকার সময় এ দুজনের চাকরি হয়।

বর্তমান কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. নজরুল ও তার স্ত্রী সহযোগী অধ্যাপক ড. শরমিন চৌধুরী একই বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। সাবেক প্রক্টর ও বর্তমান ছাত্র পরামর্শ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. ফরহাদ হোসেনের ভাতিজা এমদাদ কর্মকর্তা পদে কর্মরত। অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেনের স্ত্রী সায়মা সুলতানা পলি ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত আছেন। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আজিজুর রহমানের ছেলে শাওন কর্মকর্তা হিসেবে আছেন। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শিক্ষক সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়ার স্ত্রী ডা. ফারজানা আক্তার মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রক্টর হারুন অর রশিদ ও তার স্ত্রী ড. শাহনাজ পারভিন উভয়ই জেনেটিক্স অ্যান্ড প্লান্ট ব্রিডিং বিভাগের শিক্ষক।

জাভেদ আজাদ ও তার স্ত্রী মারজানা ইয়াসমিন যথাক্রমে অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ও অ্যাগ্রোনমি বিভাগের শিক্ষিক। তারা উভয়ে ছাত্রলীগ করার সুবাদে নিয়োগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে মারজানা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক আর জাভেদ ছিলেন কমিটির সদস্য।

প্রভাবশালী শিক্ষকের আনুকূল্যের বাইরে নিয়োগে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছাত্রলীগের নেতাদের। বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কথা চালু আছে যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম এই সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারাই শুধু নন, হল কমিটির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা বা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ নিশ্চিত হয়ে যায়। বিগত নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করলে এর সত্যতা মিলে।

২০১৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে দেওয়া নিয়োগে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের সাবেক সভাপতি আজরিন নাহার তুলি ও সাধারণ সম্পাদক সোনিয়া নূসরিন সুমি উভয়েই কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। নবাব সিরাজ উদ দৌলা হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গৌতম দাস, কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবির আহমেদ মিথেন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পান। শেরেবাংলা হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর আলী নিয়োগ পান মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটির মেয়াদ এক বছর। অথচ সাড়ে চার বছর ধরে এই কমিটির নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড চলছে। আগামীকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন হওয়ার কথা আছে। সম্মেলন সামনে রেখে ছাত্রলীগের কোনো কোনো নেতা চাকরি হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে আছেন। এ কারণে তারা নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে উপাচার্যকে চাপ দিয়ে আসছেন।

মেয়াদোত্তীর্ণ এই কমিটির সভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান মিঠুর বান্ধবী সোনিয়া নূসরিন সুমি বাজেট কর্মকর্তা পদে চাকরি করছেন। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানের বান্ধবী মাহবুবা সিদ্দিকা (জিতু) কৃষি রসায়ন বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। অভিযোগ রয়েছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বান্ধবী হিসেবে যারা চাকরি করছেন, তারা আসলে তাদের স্ত্রী। গোপনে তারা বিয়ে করেছেন। পদ টিকিয়ে রাখতে তারা বিষয়টি প্রকাশ্যে আনছেন না।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নাজমুল হকের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস বিনতে হাবিব অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দাসের স্ত্রী তনুশ্রী ম-ল অ্যাগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের শিক্ষিক হিসেবে কর্মরত আছেন।

নাজমুল-দেবাশীষ কমিটির আগের কমিটির আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম খান মিলনের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষিক।

সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান দুজনেই প্রভাষক পদে নিয়োগ পেতে তদবির করছেন। মিঠু বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদেও আবেদন করেছেন। সেই সঙ্গে প্রত্যেক হল কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক বা কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এছাড়া বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ কমিটির কয়েকজন সহসভাপতি, হল শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকও নিয়োগ পাওয়ার তালিকায় আছেন। এমনকি সভাপতির বান্ধবীর ভাইও কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বলে জোর আলোচনা রয়েছে। আগের ধারাবাহিকতায় তাদের চাকরি অনেকটা নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ছেলেও এ দফায় নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বলে আলোচনা রয়েছে।

নিয়োগের জন্য তদবির বিষয়ে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি এস এম মাসুদুর রহমান মিঠু ও সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।