ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ছে

দেশের উজানে এবং অভ্যন্তরের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টির কারণে অল্প কিছু এলাকার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তবে বেশিরভাগ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের ৫ জেলার ৫ নদীর ৬ পয়েন্টের পানি বিপদসীমার ওপরে আছে। ভারতের এবং সিলেট-সুনামগঞ্জে বৃষ্টি হওয়ায় হাওর এলাকায় গতকাল পানি বেড়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বিভাগের বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি হতে পারে। প্লাবিত থাকা অঞ্চলগুলো থেকে পানি নামতেও বিলম্ব হবে। এতে বানভাসিদের ভোগান্তি আরও বাড়বে। বাড়বে পানিবাহিত রোগের বিস্তার। 

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়া পানিবাহিত রোগের বিস্তারও বাড়ছে। এসব এলাকায় বিভিন্ন দুর্ঘটনা এবং রোগে আক্রান্ত হয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম আরও পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। এ ছাড়া গতকাল দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিরা আরও দুজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছেন। অধিদপ্তরের হিসাবে গত ১৭ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত দুই দফার বন্যায় ৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে দেশ রূপান্তরের হিসাবে এ সংখ্যা ৯২ জন। এই সময় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৭৩১ জন। সব শেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫২ জন। আর এ সময় কেবল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৫০৭ জন। বন্যার সময় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৫ হাজার ২৪৪ জন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, যে পরিমাণ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছে, এর চেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি না হওয়ায় সেটির হিসাব জানা যাচ্ছে না। তবে অধিদপ্তরের এক সপ্তাহের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বন্যাকবলিত এলাকায় এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাব বাড়ছে। ২১ জুন অবধি এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৭৯। গতকাল সেই সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া ২১ জুন যেখানে এক দিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩১৫, সেখানে গতকাল এই সংখ্যা ছিল ৫০৭। তার আগের দিন ছিল ৬২১ জন। 

স্বাস্থ্য বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য বলছে, এই রোগটিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে প্রয়োজনে নিজেদের স্যালাইন কেনারও অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন জন্মেজয় দত্ত জানান, বন্যার কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, শুধু তাদের হিসাব থাকে, কিন্তু আক্রান্ত আরও বেশি হতে পারে। হয়তো ঘরেই তারা চিকিৎসা নিচ্ছে। তারা সব বিষয় মাথায় রেখে চিকিৎসা দল পরিচালনা করছেন।  জন্মেজয় দত্ত বলেন, অনেক জায়গায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। সে জন্য চিকিৎসক দল দুর্গম এলাকায়ও যাচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা বেশি। শিশুদের নিয়ে সচেতন থাকতে হবে। ডায়রিয়া দেখা দিলে খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান, জেলার ১১টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত এক সপ্তাহে ২১৯ জন ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু।

নেত্রকোনার কলমাকান্দায়ও ডায়রিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে শিশু বেশি। উপজেলায় ১৯ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৫৬ জন চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে শিশু ছিল সর্বোচ্চ ২৭, পুরুষ ১৬ ও নারী ১৩ জন। সারা দেশে ডায়রিয়ায় যে একজনের মৃত্যু হয়েছে, তিনি এই উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন।

কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আল মামুন বলেন, পানি কমতে শুরু করার পর আগের তুলনায় হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে একটি করে মেডিকেল টিম কাজ করছে। পানিবন্দি মানুষদের পানিশোধন ট্যাবলেট, খাবার স্যালাইন, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির আবার অবনতি হলে, রোগটির প্রকোপ থামানো যাবে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তর ভারী বর্ষণের পূর্বাস দিলেও নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মৌসুমি বায়ু বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গা, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের দু-এক স্থানে অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

তবে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তিস্তা ছাড়া দেশের সব প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এবং ভারতের হিমালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গের (জলপাইগুড়ি, সিকিম) বিভিন্ন স্থানে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে ওই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী যেমন তিস্তা, আপার আত্রাই, ধরলা, দুধকুমার, আপার করতোয়া, টাঙ্গন, পুনর্ভবা ও কুলিখ নদীর পানি সময়বিশেষে দ্রুত বাড়তে পারে। এ ছাড়া ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তার পানি বেড়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে অথবা কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রর তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টের পানি ৭২ থেকে কমে ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। কুশিয়ারার অমলশীদ পয়েন্টের পানি ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। শেওলা পয়েন্টের পানি ৫৪ থেকে কমে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এদিকে বাউলাই নদীর খালিয়াজুড়ি পয়েন্টের পানি বিপদসীমার নিচে নেমেছে। পুরাতন সুরমার দেরাই পয়েন্টের পানি ১৭ থেকে ১০, সোমেশ^রীর কলমাকান্দা পয়েন্টের পানি ৩২ থেকে ২২ এবং তিতাসের ব্রাহ্মণবাড়িয়া পয়েন্টের পানি ২০ থেকে কমে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল।

এদিকে ভারতেও বৃষ্টি বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে অরুণাচলের পাসিঘাটে ২১১, জলপাইগুড়িতে ২০৮, চেরাপুঞ্জিতে ২০০ এবং গ্যাংটকে ১২৭ মিলিমিটার।