রোনালদোর দেশের ক্রিকেট দলে বাংলাদেশি নিপু

আইসিসি সহযোগী দেশগুলোর দলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারের অভাব নেই। আছে ভারতীয়-শ্রীলঙ্কানরাও। এশিয়ার ক্রিকেট দলগুলোর মাঝে কেবল বাংলাদেশই বাকি ছিল। কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ক্রিকেটারকে কখনই আইসিসির কোনো আসরে অন্য দেশের হয়ে খেলতে দেখা যায়নি। সিরাজউল্লাহ খাদেম নিপু হলেন প্রথম। পর্তুগাল জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইউরোপ আঞ্চলিক বাছাইপর্বে খেলছেন। নিজ দেশের লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়াতে না পারলেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দেশের লাল-সবুজ পরার গৌরব হলো তার।

সিরাজউল্লাহ হুট করেই পর্তুগাল জাতীয় দলে সুযোগ পাননি। এর পেছনে আছে লম্বা গল্প। তার শুরুটা ২০০১ সালে বাংলাদেশের বিকেএসপি থেকে। বয়সভিত্তিক দলের বৈতরণী পেরিয়ে ২০০৬ যুব বিশ্বকাপে সাকিব-মুশফিকদের সঙ্গে খেলেছেন। ওই আসরে দলের অপরিহার্য অলরাউন্ডার ছিলেন এ বাঁ-হাতি, খেলেছেন সব ম্যাচও। বাংলাদেশে ২০০৯-১০ পর্যন্ত টানা ৫ মৌসুম প্রিমিয়ার লিগ ও জাতীয় লিগে সিলেট বিভাগের দলেও খেলেছেন। তবে ভালো খেলেও সুযোগ পাননি খুব একটা। সিলেট বিভাগীয় দলে ২০১০ জাতীয় লিগের ক্যাম্পে ডাক না পাওয়ার আক্ষেপ নিপুর এখনো আছে, ‘আমার জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাবার কাজের সূত্রে হবিগঞ্জ থাকতাম। তো আমি সিলেটের না বলে বিভাগীয় দলে তেমন সুযোগ পাইনি। ২০০৯ প্রিমিয়িার লিগে ৩৭২ রান ও ১৭ উইকেট নিয়েও বিভাগীয় দলের ৪০ জনের ক্যাম্পে সুযোগ পাইনি। এতে খুব কষ্ট পাই। আমার আশা ছিল অন্তত জাতীয় দলে না হোক, এর কাছাকাছি কোথাও তো সুযোগ পাব।’

এই কষ্ট থেকেই দেশান্তরিত হননি নিপু। সেই কারণটা ভিন্ন। বিভাগীয় ক্যাম্পে সুযোগ না পেয়ে খেলছিলেন বিভিন্ন স্থানীয় লিগে। সেখানেই কোনো একটি অনুশীলনে চোখে বলের আঘাত পান। এক বছর দেখতেই পারেননি বাম চোখে। বিসিবির কাছে আবেদন করেও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি। আবার নিজে খরচ কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। এরপর একরকম ক্ষোভ নিয়েই পাড়ি জমান পর্তুগাল। সেখানে এসে চোখের চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হন। এক বছর পর খোঁজ নেন দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের। তবে খোজখবর পর্তুগালে যাওয়ার আগেই নিয়েছিলেন তিনি, ‘পর্তুগালে আসার আগে আমি বিভিন্ন দেশকে নিয়ে একটু স্টাডি করি। কোন দেশে গেলে আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা ভালোভাবে এগিয়ে নিতে পারব, এসব আরকি। ওই সময় (২০১৪) দেখলাম পিছিয়ে থাকা সহযোগী দেশগুলোর মধ্যে স্পেন ক্রিকেটে এগিয়ে। শুধু পর্তুগালেই দেখলাম এখনো অতটা আপডেট নেই, তো ভাবলাম এখানে যদি এগিয়ে যাই তাহলে সুযোগ আসতে পারে।’

এরপরের গল্পটা নিপুর জন্য উত্তরোত্তর উন্নতির। দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্রিকেটে পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রমাণ দেখান। এরপর পর্তুগাল ক্রিকেট ফেডারেশন তাকে ওয়েইরাস ক্রিকেট ক্লাবে তিন বছর খেলার পরামর্শ দেয়। তিন বছর পর জাতীয় দলের জন্য বিবেচিত হওয়ার সুযোগ আসবে। সেই সুযাগ আসে গত বছর। করোনার মাঝেই প্রথমবারের মতো পর্তুগাল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপান নিপু, ‘২০২১ এ পর্তুগাল জাতীয় দলে সুযোগ পাই। আমার পর্তুগালের জার্সিতে প্রথম খেলা ছিল একটা ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজ। পর্তুগাল-জিব্রাল্টার-মাল্টাকে নিয়ে হওয়া ওই টুর্নামেন্টে ৪ ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হই।’ এরপর গত ১৮ জুন আসে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের চূড়ান্ত দলে ডাক পাওয়ার খবর, ‘আমি ইংল্যান্ডে মাইনর কাউন্টি লিগ খেলছিলাম মিডলসেক্স কাউন্টির অধীনে অ্যালেক্সান্ডার ক্লাবের হয়ে। এখানে খেলার সময়ই সুখবরটা পাই।’

নিপু ডাকটা বাংলাদেশ জাতীয় দলের জন্যও পেতে পারতেন। এতদিন পর সেই আক্ষেপ আর কাজ করে না নিপুর। এখন পর্তুগাল ক্রিকেট নিয়েই ভাবেন। হতে চান দেশটির ক্রিকেটে শুরুর এনে দেওয়ার সারথী, ‘আক্ষেপ আসলে কি...আমার কাছে মনে হয়, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমি ভালো আছি। আমি দেশের হয়ে খেলার তো সুযোগই পেলাম না। ভালো খেললেও ডাক পাইনি। এখন পর্তুগালে বেশ ভালো আছি, যেখানেই যাই ক্রিকেটার হিসেবে সম্মান পাই। এটা আমার ভালো লাগে। বাংলাদেশ কোনো দিন যদি বিশ্বকাপও জেতে বা যত উপরেই যাক, আমিনুল-দুর্জয়-আকরাম ভাইদের তো কেউ ভুলতে পারবে না। কারণ তারা দেশের ক্রিকেটটাকে একটা কাঠামো বা শুরু দিয়েছেন। ১০ বছর পর পর্তুগালের ক্রিকেটে আমি ওই রকম জায়গায় থাকতে চাই।’

বাংলাদেশে থাকতে ব্যাটিং অলরাউন্ডার ছিলেন। এখন বোলিং অলরাউন্ডার। মিডেলসেক্স অনার্স বোর্ডে নাম তুলেছেন একটি ম্যাচে ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে। নিপুর ইচ্ছে আরেকবার সুযোগ পেলে বাংলাদেশে খেলতে চান বিপিএলে। গতবার ফ্রান্সে খেলা এক বাংলাদেশির নাম বিপিএল ড্রাফটে দেখে স্বপ্ন আরও উজ্জ্বল হয়েছে তার। সুযোগ পেলে সামনের বার বিপিএল ড্রাফটে নাম পাঠাতে চান। তবে এর চেয়েও বড় স্বপ্ন আছে নিপুর। তা হলো কোনো এক আইসিসি আসরে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলা, ‘আমার স্বপ্ন, ক্রিকেট ক্যারিয়ারের কোনো একটা পর্যায়ে অবসরের আগে যেন বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে পারি। সামনে আমরা যে বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং লিগ খেলতে যাচ্ছি সেখানে ৬টা ম্যাচ জিতলে ২০২৪ বিশ্বকাপের টিকিট পাব। হতেও তো পারে, ওই বিশ্বকাপে আমি বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলছি।’