১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য

২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। পোশাকশিল্পে ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায় সংগঠনটি। এ সময়ের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, পরিবেশদূষণ, জ¦ালানি ও পানির ব্যবহার কমিয়ে উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। বিজিএমইএর নতুন রূপকল্প-২০৩০-এ এমন লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে বিজিএমইএ নতুন রূপকল্প-২০৩০ ও লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। 

পোশাকশিল্পের অব্যাহত যাত্রাকে আরও বেগবান ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সক্ষমতা, বর্তমান প্রেক্ষাপট, আগামী দিনের বিশ^বাণিজ্য পরিস্থিতি ও সরকারের টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করে টেকসই পোশাকশিল্পের একটি রূপকল্প প্রণয়ন করেছে বিজিএমইএ। গতকাল বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান রূপকল্প ২০৩০ ঘোষণা দেন এবং সংগঠনের নতুন লোগো উন্মোচন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বিজিএমইএর রূপকল্পে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি, তৈরি পোশাক খাতে সুশাসন, টেকসই তথ্য প্রতিবেদন প্রস্তুত, লিঙ্গ বৈষ্যম্য দূর করা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মানসম্পন্ন কাজ, সুস্বাস্থ্য ও দক্ষ কর্মী তৈরি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে অংশীজনদের শতভাগ যুক্ত করার পাশাপাশি বিপজ্জনক রাসায়নিক নিষ্কাশন শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন লোগোতে নয়টি অগ্রাধিকারসম্পন্ন বিষয়কে প্রকাশ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে ফারুক হাসান বলেন, প্রযুক্তির ব্যাপক পরিবর্তনের সঙ্গে পোশাকশিল্প এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে, যে শিল্পের প্রচলিত নিয়মগুলো খাটছে না, প্রায়ই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য পণ্যের ডিজাইন পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া, লিড টাইম হ্রাস করা, সর্বশেষ প্রযুক্তি গ্রহণ, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস এবং কারখানাগুলোকে আরও টেকসই করার কোনো বিকল্প নেই। আর এই প্রচেষ্টাগুলো শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে জ্ঞানার্জনের জন্য আমরা উত্তরায় বিজিএমইএর প্রধান কার্যালয়ে নতুন সেন্টার ফর ইনোভেশন, এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথ প্রতিষ্ঠা করেছি। এই কেন্দ্রের লক্ষ্য হচ্ছে পোশাকশিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং করা।

ফারুক হাসান বলেন, যেহেতু বিজিএমইএ আমাদের পোশাকশিল্পের মুখপাত্র, তাই এই শিল্পের এগিয়ে যাওয়া এবং ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য বিজিএমইএর নিজস্ব ব্র্যান্ডিংও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর তাই আমরা বিজিএমইএর অতীত ঐতিহ্যকে অটুট রেখে আগামীর টেকসই শিল্প নির্মাণের প্রত্যয় নিয়ে বিজিএমইএর করপোরেট আইডেনটিটি, অর্থাৎ লোগোতে পরিবর্তন এনেছি। এটি একটি ডাইনামিক লোগো, যাতে ৯টি অগ্রাধিকার সম্পন্ন বিষয়কে ডটের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলোর প্রতিটিরই স্বতন্ত্র অর্থ আছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশে^ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ২০২১-২২ অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। ৪০ বছরের অগ্রযাত্রায় বিজিএমইএর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি। সব মিলিয়ে ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার রপ্তানি করেও সব সময়ের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। তবে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়তা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

বিজিএমইএ টেকসই রূপকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ ভাগ সবুজ কারখানা, ৬০ ভাগ উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করা, ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা, ৩০ ভাগ জ¦ালানি সাশ্রয় করা, ২০ ভাগ নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ব্যবহার করা, পানির ব্যবহার ৫০ ভাগ কমিয়ে আনা, গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন ৩০ ভাগ কমিয়ে আনা, ৫০ ভাগ টেকসই মিশ্রণ উপকরণ ব্যবহার করা এবং ৩০ ভাগ বনায়ন ও বনভূমি উজাড় করা রোধ করবে। 

১০ হাজার কোটি ডলার রপ্তানি কীভাবে সম্ভব জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি ম্যানমেইড ফাইবার, কারিগরি টেক্সটাইল, উচ্চমূল্যের পণ্য রপ্তানিতে নজর দিতে হবে।

তৈরি পাশাকশিল্প এখন প্রযুক্তিগত টেক্সটাইল তৈরিতে প্রস্তুত কি না জানতে চাইলে ফারুক হাসান বলেন, তারা এখন উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করতে প্রস্তুত। ‘আগে কাঁচামাল নিয়ে সমস্যা ছিল। এখন দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং অনেকে আমদানিও করছে।’

তিনি বলেন, ‘বিপুল চাহিদার কারণে দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের কারখানাগুলো প্রসারিত হচ্ছে এবং নতুন করে বিনিয়োগও হচ্ছে অনেক। ২৫ লাখ ডলারের বড় বড় বিনিয়োগ হয়েছে স্পিনিং মিলসে। যার বেশিরভাগই ম্যানমেইড ফাইবার উৎপাদন করবে। তারা এটি নিয়ে কাজ করছেন এবং শিগগিরই প্রকাশ করবেন। ২০২১ সালের মধ্যে ৫ হাজার কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য বিভিন্ন কারণে অর্জন হয়নি। তবে আমরা আশাবাদী ২০২৩ সালে এ খাত থেকে আমাদের আয় ৫ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।’

বাংলাদেশ সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে ৪ হাজার ২৬২ কোটি ডলার আয় করেছে; যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। এই অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলার।