৫৮৭ কোটি টাকার বাঁধ অকারণ!

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছয়টি জেলার মোট ২৯টি উপজেলায় আগাম বন্যা ঠেকাতে ২০১১ সালে ‘হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ২০১৯ সালে প্রকল্পটির কাজও শেষ হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন বছরের মধ্যেই গত মাসের ভয়াবহ বন্যায় প্রকল্পটির অধীনের তৈরি করা বাঁধসহ সংশ্লিষ্ট সবকিছু কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পটির আওতায় নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধ থেকে শুরু করে অনেক কিছুই এখন আর কাজে আসছে না।

প্রকল্পটি ২০১১ সালের এপ্রিলে ৬৮৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে একনেকে অনুমোদন পায়, যা বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ওই বছরের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। পরবর্তীকালে ব্যয় না বাড়িয়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। কিন্তু ২০১৬ সালে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ৭০৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। অবশ্য ২০১৭ সালে প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় কমিয়ে ৫৮৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা করা হয়।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্যে বলা হয়েছে, আগাম বন্যার কবল থেকে হাওর এলাকার বোরো ফসল রক্ষা, মূল নদীগুলোর পরিবহন ক্ষমতা বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ খালগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নাব্যতা উন্নয়ন।

আইএমইডি প্রকল্পটি নিয়ে তাদের বিশ্লেষণে বলেছে, সেচকাজে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাজ শেষ হওয়ার পর তিন বছর শেষ হয়েছে। এই তিন বছরে বন্যায় পলি জমে অভ্যন্তরীণ খালগুলোর গভীরতা কমাসহ নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে হাওর হয়ে যাচ্ছে পানিশূন্য। পানির অভাবে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আইএমইডির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, হাওর এলাকার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে সেখানে পানি প্রবেশের সুযোগ করে দিতে হয়। আবার মৌসুম শেষে পানি নেমে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়। এজন্য এখানে ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা অস্থায়ী কাঠামো এবং বছর বছর এগুলো সংস্কার করতেই হবে।

প্রকল্প এলাকায় মোট ১ হাজার ২৮৪ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এলাকাভেদে এটির উচ্চতা ৬ থেকে ১০ মিটার হওয়ার কথা, কিন্তু করা হয়েছে গড়ে ২ থেকে ৪ মিটার উচ্চতায়। বাঁধের উচ্চতা ও প্রশস্ততা অনেক কম, যা ছোটখাটো বন্যায় সহজেই তলিয়ে যেতে পারে। এসব বাঁধের ক্ষেত্রে রিভার সাইড ও কান্ট্রি সাইডে কোনো ঢাল নেই বললেই চলে। প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শেষ হলেও বাঁধগুলোর অবস্থা আশানুরূপ পাওয়া যায়নি। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের হাওরগুলোর অনেক স্থানেই রয়েছে পাউবোর ‘ডুবন্ত বাঁধ’। কিন্তু দুর্বল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় আগাম বন্যা পিছু ছাড়েনি ওই এলাকার।

কজওয়ের বর্তমান অবস্থা: কজওয়ে হলো কালভার্টের মতো দেখতে একটি কাঠামো। এটি বাঁধের মাঝে নির্মাণ করা হয়। কজওয়ে ও কালভার্টের মধ্যে পার্থক্য হলো কালভার্টের ওপর সøাব থাকে, এটির ওপর থাকে না। আলোচ্য প্রকল্পের আওতায় মোট ১৩টি কজওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি কজওয়েকে প্রকল্প প্রস্তাবনার নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী পাওয়া গেছে। তবে খালিয়াজুরির কজওয়েটিকে বাঁধের সাথে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া গেছে। আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিমে অন্তত ৫ ফুট বিচ্যুতি রয়েছে। ঢালের ক্ষেত্রে কান্ট্রি সাইডে ১:২ এবং রিভার সাইডে ১:৩ ঢাল থাকার বন্দোবস্ত থাকলেও বাস্তবে সমতল ভূমি পাওয়া গেছে। নির্মাণপরবর্তী সময়ে এগুলো আর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এমনকি এগুলো পরিচালনা ও পাহারার জন্যও নেই যথেষ্ট লোকবল। ফলে বন্যার আগ মুহূর্তে কজওয়েগুলো যথাসময়ে বন্ধ করা নিয়ে সংশয় দেখা যায়। এ ছাড়া পাহারা না দিলে আগাম বন্যার কারণে হাওরের বাইরের জনগণ সেগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়ায় দুই পাশই প্লাবিত হয়। আর বর্ষার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংরক্ষণের কোনো পদ্ধতি না থাকায় ভবিষ্যতে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে।

প্রকল্পের আওতায় ১১টি নতুন ও ১১১টি রেগুলেটর পুনর্বাসন করা হয়েছে। সেগুলো পর্যবেক্ষণে প্রত্যেটির রেগুলেটরের গেট জ্যাম (বদ্ধ) অবস্থায় পাওয়া গেছে। সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জানা যায়, নির্মাণের পর এগুলোকে আর মেরামত করা হয়নি। আইএমইডি তাদের মতামতে বলেছে, অতিসত্বর এগুলো মেরামত না করা হলে পরবর্তী আগাম বন্যায় এগুলোর কোনো কার্যকারিতা না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দায়িত্বে থাকা সব প্রকল্প পরিচালক বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। তবে কজওয়ে ও রেগুলেটর সম্পর্কে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এস এম শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১০টি কজওয়ে নির্মাণই হয়নি। অর্থ বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার কারণে ১০টি কজওয়ে তৈরিই করা হয়নি। মাত্র ৩টি কজওয়ে নির্মিত হয়েছে। আর নতুন রেগুলেটরগুলো জ্যাম হয়নি। পুরনোগুলো জ্যাম হতেই পারে, যেহেতু সেগুলো সংস্কার করা হয়েছে। আইএমইডি অনেক কিছু না দেখেই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। তারা আমাদের ফাইনাল রিপোর্ট দিলে সেগুলো পর্যালোচনা করব।’

প্রকল্পের আওতায় ১৪টি ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণের কথা ছিল। নির্মাণ হয়েছে ১২টি। গত মার্চ মাসে এগুলো পরিদর্শনে দেখা যায়, আউটলেটগুলো আশপাশের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ২০১৫ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে পলি জমে এবং প্রত্যেক আগাম বন্যায় পানির স্রোতের কারণে পানি প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪৬ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালের বন্যার কারণে প্রকল্পের খননকৃত স্থানে কোনো নতুন খননের কাজ না হওয়ায় খালের গভীরতা কমে গেছে। খালের গভীরতা আশপাশের জমির সমতল ভূমির সমান দেখা গেছে। কোনো কোনো খালে বোরো ধানের চাষ হচ্ছে।

প্রকল্প প্রস্তাবে ২৫৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সুরমা নদীর ১১৬ কিলোমিটার খননের কথা ছিল। বাস্তবে ১৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজটি সম্পন্ন হয়ে যায়। প্রস্তাবনায় খননের গভীরতা ১৫ দশমিক ৮৫ ঘনমিটার হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়েছে ১১ দশমিক ৫০ ঘনমিটার। ২০১৮ সালে ড্রেজিং করা হয়েছিল, কিন্তু ২০১৯ সালের পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন করে খনন না হওয়ায় এবং প্রতিটি আগাম বন্যার পর পলির কারণে নদীর প্রশস্ততা এবং গভীরতা দুই-ই কমেছে।

খালগুলো ভরাট হওয়া প্রসঙ্গে প্রকৌশলী এস এম শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এবারও আগাম বন্যা ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। বন্যায় পলি আসে, তবে এত পলি আসে না। খালগুলো ভরাট হয়েছে, তবে জমির সঙ্গে একেবারে মিশে যায়নি। এগুলো খনন করার জন্য আবার নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। তখন আবার খনন করা হবে। যেহেতু এ প্রকল্প শেষ হয়ে গেছে, তাই এ প্রকল্প থেকে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের কোনো সুযোগ নেই। তাই পরের প্রকল্প পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে খরচ কমিয়ে ব্যয় কমানোতে সব কাজ করা সম্ভব হয়নি।’

এসব বিবেচনায় আইএমইডি প্রকল্পটির ব্যাপারে কিছু সুপারিশ করেছে। যেম প্রকল্পের আওতায় নকশা করা এবং সে অনুযায়ী নির্মিত প্রতিটি কজওয়ে ও রেগুলেটরের আকার হাওরের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। হাওরে পানি প্রবেশে এগুলোর ভূমিকা খুবই সামান্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পানি এগুলোর উপর দিয়ে বয়ে যায়। এজন্য নকশা করার সময় বাঁধগুলো উঁচু করার পাশাপাশি কজওয়ে ও রেগুলেটরের ওপেনিং বাড়ানো উচিত।

আইএমইডি তাদের সুপারিশে আরও বলছে, হাওরের সব পানি মেঘনা নদীর ভৈরব বাজার দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। এখানে বর্তমানে তিনটি সেতু ও এগুলোর স্থায়িত্বের জন্য নদীর তলদেশে প্রতিরক্ষা সামগ্রী থাকায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই হাওরের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়া প্রসঙ্গে আইএমইডির সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি হলো ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন। ২০১১ সালে প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক ছিলেন মোট ১৩ প্রকৌশলী। আইএমইডি এ প্রসঙ্গে বলেছে, বারবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনে পুরো কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি, মেয়াদ ও অর্থ বাড়িয়ে বারবার প্রকল্প সংশোধন করতে হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব প্রসঙ্গে শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে অর্থ ছাড় পেতে খুব দেরি হয়েছে, ফলে প্রকল্পের কাজও দেরিতে সম্পন্ন হয়েছে।’