অর্জন-বিসর্জনের উৎসব ঈদুল আজহা

বিশ্ব মুসলিমের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যময় ও মহাআনন্দের উৎসব হিসেবে প্রতি বছর সাড়ম্বরে পালিত হয় ঈদুল আজহা। কিন্তু শুধু খুশিতে মেতে ওঠা আর উল্লসিত হওয়াই ঈদের প্রকৃত সার্থকতা নয়। বছর শেষে ঈদ আসে শুধু ভালো ভালো খাবার খাওয়া, দামি দামি কাপড় পরিধান করা আর বিত্তশালী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে বল্গাহীন আনন্দ-উল্লাস আর যা খুশি তাই করে বেড়ানোর নাম ঈদ নয়। ঈদ আসে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো সবার মধ্যে আনন্দ-ভালোবাসা বিলানোর জন্য। নিজের খাবার থেকে ক্ষুধার্তকে ভাগ দেওয়ার জন্য। পথের ভুখা-নাঙ্গা ফকির-এতিম মিসকিনকে ঘরে ডেকে এনে ভাই বলে সম্বোধন করে আদর আপ্যায়ন করানোর জন্য। ঈদ উৎসব শুধু বিত্তবানদের জন্য নয়, তা সর্বান্তকরণে অনুধাবন করে ঈদের আনন্দ সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেওয়ার জন্যই ঈদ।

ঈদ বছরে দুবার আসে। শাওয়াল মাসে আসে ঈদুল ফিতর, আর জিলহজ মাসে আসে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। মুসলিম উম্মাহ পরম ত্যাগের নিদর্শনস্বরূপ জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মহাসমারোহে পশু জবাইয়ের মাধ্যমে কোরবানির যে আনন্দ-উৎসব পালন করে থাকেন তাই ঈদুল আজহা। বস্তুত হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে প্রাণপ্রিয় একমাত্র পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির মতো যে ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করে গেছেন, সে সুন্নত পালনার্থে মুসলিম জাতি আজও কোরবানি করে থাকে।

জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মুসলমানরা ঈদগাহে জমায়েত হয়ে দুই রাকাত ঈদুল আজহার ওয়াজিব নামাজ আদায় করে থাকেন। নামাজ শেষে ইমাম দুটি খুতবা দেন। খুতবা মনোযোগের সঙ্গে শোনা ওয়াজিব।

ঈদুল আজহার দিন মুসলিম মিল্লাতের কিছু কাজ করা সুন্নত। তা হলো ১. খুব প্রত্যুষে ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া, ২. উত্তমরূপে মিসওয়াক করা; ৩. সকাল সকাল উত্তমরূপে গোসল সম্পন্ন করা; ৪. সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করা ও চোখে সুরমা লাগানো; ৫. সাধ্যমতো নতুন, পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা; ৬. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রত্যুষে ঈদগাহে গমন করা; ৭. সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম খাবারের বন্দোবস্ত করা ও আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, এতিম-মিসকিন, গরিব-দুঃখীকে পানাহার করানো; ৮. ঈদগাহে এক পথ দিয়ে গমন করা ও নামাজ শেষে অন্য পথে ফিরে আসা; ৯. যথাসম্ভব পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া; ১০. ঈদের নামাজ মসজিদে আদায় না করে ঈদগাহে আদায় করা উত্তম; ১১. ঈদগাহে যাওয়ার পথে তাকবিরে তাশরিক উচ্চস্বরে পাঠ করতে করতে যাওয়া; ১২. দুপুর পর্যন্ত অন্য কোনো খাবার গ্রহণ না করে কোরবানির গোশত দিয়ে আহার করা মুস্তাহাব; ১৩. ঈদের নামাজ সকাল সকাল আদায় করে যথাসম্ভব প্রথম প্রহরে কোরবানি করা; ১৪. ঈদুল আজহার আগে ৯ জিলহজ থেকে ঈদের পর ১৩ জিলহজ পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজ আদায়ের পর উচ্চ স্বরে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা; ১৫. ঈদুল আজহার খুতবায় কোরবানির বিভিন্ন মাসআলা সম্পর্কে আলোচনা করা।

ঈদুল আজহা মুসলিম জাতির কোরবানি উৎসর্গ-বিসর্জনের দিন, অথচ এ দিনই আবার প্রকৃত ঈদের আনন্দ-উৎসবের দিন। ত্যাগেই সুখ, ভোগে নয়; বিসর্জনেই প্রতিষ্ঠা, উৎসর্গেই সাফল্য, নিবেদনেই আনন্দ। সারা জাহানের প্রতিটি মুসলমান যদি জীবনের পদে পদে এমনই করে কোরবানি করে; এমনি করে আল্লাহর রাহে আপন সত্তাকে বিলিয়ে দেয় তাহলে ত্যাগের মধ্যে আনন্দ, মৃত্যুর মধ্যে জীবন খুঁজে নেওয়া মোটেও দুঃসাধ্য হবে না বলে আমাদের বিশ^াস এবং এখানেই ঈদ উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।