মৌলবাদীদের কাজের বেটি তত্ত্ব এবং গণতন্ত্র

প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী ও সংসদ সদস্য মমতাজের জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের ক্লিপ ভাইরাল হওয়ায় তাকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ ও আক্রমণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ কিছু ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। আমার এক কলিগের সৌজন্যে পাওয়া এরকম একটি ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা গেল, ‘কাজের বেটি হওয়ার যোগ্য না, সে যখন সংসদের এমপি হয়ে যায়, যখন সংসদের বড় একজন কর্মী হয়ে যায়, তখন এই জাতির কপালে দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছু নাই।’

যিনি এই কথা বলেছেন, তিনি জানেন না, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ দেশের ‘কাজের বেটি’দেরও সংসদ সদস্য হতে কোনো বাধা নেই। তারাও বাংলাদেশের নাগরিক এবং সমান অধিকার ভোগ করায় তাদের কেউ বাধা দিতে পারে না। তারা কাজ করে হালাল রুজির ওপর জীবন ধারণ করে। কর ফাঁকি দিয়ে অন্যের কাছ থেকে ওয়াজের নামে লাখ লাখ টাকা আদায় করে বিলাসী জীবনযাপন করে না। তারাও আল্লাহর বান্দা।

সুতরাং এই তথাকথিত ধর্মীয় ওয়াজকারী কতটুকু ধর্মের মর্মবাণী বোঝেন তা তার কথায়ই স্পষ্ট। তার এই মন্তব্যে শুধু যে গার্হস্থ্য কাজের সহযোগী হিসেবে বাসাবাড়িতে কর্মরত লাখ লাখ নারীকে অপমান করা হয়েছে তাই নয়, বরং অপমান করা হয়েছে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী আপামর নারী সমাজকেই। যোগ্যতা নিয়ে এরকম আহাম্মকের মতো কথা আমরা কোনো পুরুষকে নিয়ে বলতে শুনি না, যদিও আমরা চাই না কাউকেই এমনভাবে ছোট করার চেষ্টা করা হোক।

নারীর যোগ্যতা নিয়ে এ ধরনের আপত্তিকর ধারণা এই বক্তার একার নয়, আমাদের দেশের অনেক নারী-পুরুষই নারীদের নিয়ে এরকম করেই ভাবেন। পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন যেসব ব্যক্তি এরকম করে ভাবেন ও বলেন, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ারই যোগ্যতা রাখেন না। কারণ দেশের সংবিধান সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। তাছাড়া, তারা এও জানেন না যে কথিত এই ‘কাজের বেটি’রাই এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের জেনে রাখা দরকার যে, গৃহকর্মীরাও এ দেশের সমান নাগরিক, তারাও ভোটার, তারাও যে কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন।

যেসব নারী সংসদ সদস্য হয়ে আসেন, আমরা যাদের বক্তব্য শুনি, তাদের বক্তব্যে যে চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ঘটে, তা আমাদের অনেক পুরুষ সংসদ সদস্যের বক্তব্যের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী, যতই তাদের ‘কাজের বেটি’ বলে হাসিঠাট্টা করা হোক না কেন।

একই বক্তাকে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে মমতাজের পেশাদার সংগীত শিল্পী হিসেবে জীবনযাপনকেও অশ্লীলভাবে আক্রমণ করতে শোনা গেল। তিনি বলেছেন, ‘যে সমস্ত শিল্পীরা আগে রাস্তার কিনারে কিনারে গান গাইয়া টাকা কামাইয়া ভাত পাইত না’, ইত্যাদি। আমি বুঝতে পারছি না, রাস্তায় গান গেয়ে খাওয়ায় অসুবিধা কোথায়? গান গাওয়াকে তো আমরা একটা কাজ বলেই জানি। তারা যে কাজ না করে, ধর্মের নামে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে অসহিষ্ণুতা উসকে দিয়ে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করছে আমাদের তো বরং সেটাকেই আপত্তিকর মনে হয়।

ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে তারা নারী ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠীর অধিকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিনিয়ত ঘৃণ্য অপপ্রচার (হেইট স্পিচ) চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান লঙ্ঘন করে যে অপরাধ করছে, তার জন্য তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

তারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে দিনের পর দিন বাঙালি জাতিসত্তা, বাঙালি সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানবিরোধী যে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে, তা বন্ধ করবার জন্যও উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক। মানুষের বাক্স্বাধীনতা দরকার, কিন্তু বাক্স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে কোনো গোষ্ঠী যখন অন্য নাগরিকদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, তখন জনস্বার্থে তাদের হেইট স্পিচ বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তা না হলে অন্য নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ করে দিয়ে জাতির জন্য ‘দুর্ভোগ’ই ডেকে আনা হবে।    

সবাই জানে, এই মৌলবাদী গোষ্ঠী ধর্মীয় বক্তা হিসেবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উপার্জন করলেও নিয়মানুযায়ী সরকারকে কোনো ট্যাক্স বা কর দেয় না। দিতেও চায় না। যে কারণে করখেলাপি হিসেবে দুদক তালিকা করলে তারা গোস্বা হন। যেভাবেই আয় করা হোক না কেন, কর না দিলে তা কালো টাকা। বৎসরান্তে সব নাগরিকেরই আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়। দেশের আইন অনুযায়ী তারাও এর আওতায় পড়েন। কাজেই তাদের বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা নিতে পারবে না এরকম আবদার গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই গোষ্ঠীকে আয়কর থেকে অব্যাহতি দিলে কষ্টকর পরিশ্রমলব্ধ উপার্জন থেকে যেসব নাগরিক নিয়মিত কর দেন, তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। মনে রাখতে হবে, এই ধর্মব্যবসায়ীরা ধর্মকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করে দেশের আইন ও সংবিধানবিরোধী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, তারা আইনের চোখে অপরাধী। তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিয়ে গরাদের আড়ালে রাখাই সংগত।   

ধর্মীয় বক্তা হিসেবে ফরজ কাজ রেখে তাদের অনেককে শ্রোতারঞ্জনমূলক নানা বিষয় নিয়ে মেতে থাকতে শোনা যায়। নারী ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠী নিয়ে অশ্লীল ও আপত্তিকর ওয়াজ তো আছেই। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ইন-পারসন ওয়াজ মাহফিলের ক্ষেত্রে নাকি রাত যত গভীর হয়, নারী নিয়ে ওয়াজ তত গাঢ় হতে থাকে! রাতভর শ্রোতা ধরে রাখবার জন্য এটা তাদের একটা ব্যবসায়িক কৌশল, অথচ তা পরিবেশিত হয় ধর্মের মোড়কে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যাবশ্যক না হলেও নারীদের হিজাবে মুড়িয়ে চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি করে রাখবার তাদের যে নিষ্ঠা, সে নিষ্ঠা পুরুষের দৃষ্টির পর্দা করা বা নামাজ পড়া নিয়ে শোনা যায় না। সবাই জানে, অনেক শ্রমজীবী মানুষই জীবিকার কারণে নিয়মিত ফরজ নামাজ আদায় করতে পারে না। তাদের ব্যাপারে এই বক্তাদের কী অভিমত তা জানা যায় না। গাড়ির ড্রাইভার, রিকশাচালক, কৃষিক্ষেত্রে ও কারখানায় কাজ করে খাওয়া শ্রমিক এবং কথিত ‘কাজের বেটি’দের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের কী বন্দোবস্ত! তারা কি মুসলমান নয়?

লেখাটি এখানে শেষ করতে চাই এই ব্র্যাকেট দিয়ে যে, এই ওয়ায়েজিনরা মোটেই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। যদিও তাদের কাউকে কাউকে গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়েও কথা বলতে শোনা যায়। দেশের বেশিরভাগ মানুষের মতো তারাও ‘নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র’ ধারণার ফেরিওয়ালা হলেও গণতন্ত্রের আওতা আসলে অনেক ব্যাপক।

নারী ও সংখ্যাল্প জনগোষ্ঠী মিলিয়ে রাষ্ট্রের বৃহদাংশ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে দিনের পর দিন উদ্দেশ্যমূলক কুৎসা গেয়ে যাওয়া কোনো গণতান্ত্রিক আচরণ নয়। একইসঙ্গে তা অপরাধমূলকও। কাজেই তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। মিডিয়ায় যারা তাদের প্রশ্রয় দেন তাদের প্রতিও নিন্দা জানানো উচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর উচিত তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।

লেখক মুক্তিযোদ্ধা ও নারীনেত্রী। নির্বাহী পরিচালক, নারী প্রগতি সংঘ