দুই যুগের পরিবারতন্ত্রের অবসান

নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটে সৃষ্টি হওয়া জনঅসন্তুষ্টিতে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এখন নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটে। রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে লঙ্কান বীর হয়েছিলেন রাজাপাকসেরা। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জাতিগোষ্ঠীর কাছে মাহিন্দা রাজাপাকসে ছিলেন বীর নায়ক। কারণ তিনি প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ২০০৯ সালে তামিল বিদ্রোহীদের কঠোরভাবে দমনের মাধ্যমে তিন দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি টেনেছিলেন। যুদ্ধ জয়ের শোভাযাত্রা-জনসভায় তাকে সিংহলি বৌদ্ধ রাজাদের সঙ্গে তুলনা করা হতো, বলা হতো যুদ্ধের নায়ক। 

এক দশকের বেশি সময় ধরে শ্রীলঙ্কার রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজাপাকসে পরিবার। মাহিন্দা ও গোতাবায়া রাজাপাকসের বাবা ডন আলউইন রাজাপাকসে ছিলেন দুই বারের সংসদ সদস্য। এরপর শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে প্রবল প্রতাপশালী মাহিন্দা রাজাপাকসে। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দুই পদেই তিনি ছিলেন।

প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা গোতাবায়া রাজনীতির বাইরে ছিলেন। তাকে রাজনীতিতে আনেন মাহিন্দা। ২১ বছর বয়সে গোতাবায়া শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দুই দশক সেখানে চাকরি করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে নিভৃত জীবনযাপন করছিলেন।

২০০৫ সালে বড় ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট হলে দেশের রাজনীতিতে শুরু হয়ে গোতাবায়া অধ্যায়। সে সময় তাকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেন মাহিন্দা। স্বাধীনতাকামী লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলমের (এলটিটিই) দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের অবসানে নির্মম রূপ দেখান গোতাবায়া। ২৬ বছর ধরে চলা সংঘাতের পর ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কান সেনাদের সর্বাত্মক হামলায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এলটিটিই। নিহত হন তামিলদের ‘বীর’ ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। 

এরপর থেকে সিংহলি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা গোতাবায়াকে যুদ্ধের নায়ক হিসেবে দেখেন। অনেকে তাকে জাতীয় বীর বলেও আখ্যা দিয়েছিল।

২০১৫ সালে দুই রাজাপাকসে ভাই ক্ষমতা থেকে সাময়িক সরে গেলেও ২০১৯ সালের ইস্টার সানডেতে জঙ্গিদের বোমা হামলায় ২৫০ জনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার রাজনীতির মাঠে ফেরেন চরমপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর হিসেবে পরিচিত রাজাপাকসেরা। 

তবে এবার একটু ভিন্নভাবে। কারণ দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট পদে না থাকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে মাহিন্দার সামনে প্রার্থিতার সুযোগ ছিল না। রাজাপাকসের পরিবার ও শ্রীলঙ্কার পডুজানা পার্টির (এসএলপিপি) পক্ষে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হন গোতাবায়া। ২০১৯ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন গোতাবায়া। 

২০২০ সালের আগস্টে দেশটির সংসদে এসএলপিপি’র সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেড়ে দুই-তৃতীয়াংশে পৌঁছায়। প্রেসিডেন্ট পদে দুই মেয়াদে থাকা ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার আইন বাতিল করেন গোতাবায়া। পরে তার বড় ভাই মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী পদে ফিরিয়ে আনেন এবং আত্মীয়দের মন্ত্রিপরিষদে জায়গা দেন। এতে শ্রীলঙ্কায় পাকাপোক্ত হয় রাজাপাকসেদের প্রভাব।

কিন্তু এরপরই শুরু হয় পতন। পরিবারতন্ত্র তো ছিলই, সঙ্গে যোগ হলো করোনা মহামারির কারণে দুই বছরের অচলাবস্থা।

পর্যটন ও রেমিট্যান্সের জোরে টিকে থাকা শ্রীলঙ্কা পড়ল গভীর সংকটে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল গোতাবায়ার কর কমানোর ভুল সিদ্ধান্ত। তবে সব ছাপিয়ে শ্রীলঙ্কার বর্তমান বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয় রাজাপাকসে সরকারের স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক সংকট। ৮১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশ শ্রীলঙ্কার রিজার্ভ নেমে আসে মাত্র আড়াই কোটি ডলারে! গ্যাস-জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকে শ্রীলঙ্কা। সব মিলিয়ে আজ খলনায়কে পরিণত হয়েছেন এক সময়ের নায়ক রাজাপাকসেরা।