পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর রাজনীতির হাওয়া কিছুটা হলেও ঘুরে গেছে বলে মনে করছেন দেশের রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দেশের সর্ববৃহৎ ও ব্যয়বহুল এ স্থাপনা নির্মাণে আওয়ামী লীগ সরকার যে ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে তাতে পদ্মা সেতু করার পর সরকার ও ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। নিজেদের সময়ে সেতু উদ্বোধন করে সরকার কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির রাজনীতি কিছুটা হলেও হোঁচট খেয়েছে। যদিও রাজনীতিতে উত্থাপন-পতন রয়েছে।
গত ২৫ জুন বর্ণাঢ্য আয়োজনে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। দেশি-বিদেশি কয়েকশ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। এ আয়োজন ও সেতু উদ্বোধনের পর মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাসও দেখা গেছে।
দেশের অর্থনীতিবিদদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমও পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকদের মধ্যে বিএনপি নেতারাও ছিলেন। যদিও পরে কানাডার আদালত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর বিএনপি দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি করে বিদেশে টাকা পাচার করে কানাডায় বেগমপাড়া বানিয়েছে। লুটপাট করেছে বলে পদ্মা সেতুতে কোথায় কত টাকা খরচ করেছে তার স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরছে না।
কিন্তু পদ্মা সেতু উদ্বোধনের ওই সময় থেকে কার্যত মাঠপর্যায়ে বিএনপির কোনো কর্মসূচি নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে শুরু করা সংলাপও স্থগিত। যদিও দলটির একাধিক নেতা বলছেন, ঈদুল আজহার পর তারা সংলাপ শেষ করবেন। সরকারবিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে আন্দোলনে নামবেন। পাশাপাশি দল পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যাবেন।
বিএনপি বলছে, বন্যার কারণে তাদের চলমান কর্মসূচি স্থগিত করতে হয়েছে। তারা মনে করছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পদ্মা সেতু নিয়ে যে রাজনীতি করছে তা বাড়াবাড়ি।
দলটির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার পদ্মা সেতুকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। যদিও পদ্মা সেতু তৈরিতে আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব জাহির করার কিছু নেই। কারণ জনগণের টাকায় নির্মিত পদ্মা সেতুর কৃতিত্ব পুরোপুরি জনগণের। তারা পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, এত উন্নয়নের পরও কি সরকার নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সাহস দেখাতে পারবে?
বিএনপি নেতারা বলছেন, জনগণের দল হিসেবে বিএনপি উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়। বরং পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরকার যে লুটপাট করেছে তার বিরোধিতা করেছেন তারা। কারণ তাদের সরকারের সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরেছিলেন সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। সেই ব্যয় বাড়িয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ হাজার কোটি টাকা করেছে।
পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর বিএনপির রাজনীতি হোঁচট খেল কিনা জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে এখন অনেক ঘটনা ঘটেছে। সামনে আরও অনেক ঘটনা ঘটবে। জনগণ দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চায়। সরকার তা নিশ্চিত করতে পারলে জনগণই সব সিদ্ধান্তের জবাব ব্যালটের মাধ্যমে দেবে। সেই সুযোগ জনগণকে দিতে হবে।’
পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের পর থেকে বিএনপি এ বিষয় নিয়ে কথা বলছে না। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা পদ্মা সেতু ব্যবহার করলেও দলটির দায়িত্বশীল নেতারা এখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু ব্যবহার করছেন না। এ বিষয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সরকার আমন্ত্রণ জানায়নি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসনকে টুস করে পদ্মা সেতু থেকে ফেলে দিতে চেয়েছেন। বিএনপি নেতারা এখনো পদ্মা সেতু ব্যবহার করেননি তার মানে এই নয় যে তারা করবেন না। যখন প্রয়োজন হবে নিশ্চয়ই তারা ব্যবহার করবেন।’
সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পদ্মা সেতু নিয়ে তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে। এটি নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের আগে বিএনপি নেতারা নেতিবাচক যে কথাবার্তা বলেছেন তার কারণে বিবেকের দংশনে তারা হয়তো পদ্মা সেতু পার হচ্ছেন না। অথবা হয়তো তাদের এখনো প্রয়োজন হয়নি পদ্মা সেতু পাড়ি দেওয়ার। যখন সময় হবে তখন হয়তো সেতু পার হবেন। আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে বাংলাদেশ গরিব রাষ্ট্র থেকে যে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। তাই দেশের স্বার্থে শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে বিরোধিতা না করে বরং দেশের উন্নয়নে দলমত নির্বিশেষে একযোগে কাজ করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে যাওয়ার পর আমরা নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করেছি। দেশের জনগণ আমাদের সঙ্গে ছিল বলে তা করতে পেরেছি। দেশের জনগণ এর সুফল ভোগ করবে। ভবিষ্যতে নির্বাচনে নিশ্চয়ই জনগণ আমাদের পক্ষে রায় দেবে। অন্যদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহম্মদ ইউনূসকে নিয়ে বিএনপি যে বিরোধিতা করেছে তার জবাব দেশের জনগণ একদিন দেবে।’
জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘একটা কেন হাজারটা পদ্মা সেতু তৈরি করেও সরকার তাদের সব অপকর্ম আড়াল করতে পারবে না। খুন, গুম, নির্যাতন, হামলা, মামলা, দুর্নীতি, লুটপাটের বিচার দেশের জনগণ একদিন করবে। তারা যদি এতই উন্নয়ন করে থাকেন তো দেশে একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে তাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুক।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে আওয়ামী লীগ যে রাজনীতি করছে তা মোকাবিলা করার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। কারণ দেশে যেকোনো ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন কোনো একক সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এগুলো সরকারের ধারাবাহিক কাজ। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন পদ্মা সেতুর কাজ আমরা এগিয়ে নিয়েছিলাম। প্রস্তাব তৈরি করেছিলাম। পদ্মা সেতুর সমীক্ষা করেছিলাম। অর্থায়ন কীভাবে হবে তা চূড়ান্ত করেছিলাম। একনেকে পদ্মা সেতু প্রকল্প পাসও করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের জন্য আমরা জাপান সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিলাম। তারা রাজি হয়েছিল। পাশাপাশি বিশ^ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়ন করার কথা ছিল। পরে সরকারের দুর্নীতির কারণে বিশ^ব্যাংক সরে যায়। সরকার দুই বছর পিছিয়ে যায়।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা ব্রিজ, পাতাল সড়ক, কালভার্ট কিংবা মেট্রোরেল দিয়ে জনগণ একটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে মূল্যায়ন করে না। তারা দেখে তাদের বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার, মানবাধিকার, দুর্নীতি, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম, খুন ও নির্যাতন, বিদেশে টাকা পাচারসহ সব বিষয়ই দেশের জনগণ বিচার করবে।’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ দাবি করে দেশের স্বাধীনতা তারা এনে দিয়েছে, স্বাধীনের পর যখনই তারা ক্ষমতায় এসেছে তখনই জনগণ কিছু পেয়েছে, পদ্মা সেতুসহ অনেক উন্নয়ন সরকার করেছে। এত কিছুই যদি তারা করে থাকে তবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন দিক যে নির্বাচনে জনগণ নিজের ভোট নিজে দিতে পারবে। দেখা যাক জনগণ কী করে?’ তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে উন্নয়নের কথা বলতেন আইয়ুব, ইয়াহিয়া। স্বৈরাচার এরশাদ তার ৯ বছরের শাসনামলে দেশের সড়ক অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন করেছেন। তারপরও কিন্তু দেশের জনগণ তাদের শাসন মেনে নেয়নি বরং তাদের ক্ষমতা থেকে হটিয়েছে।’