এ সপ্তাহে বাড়ছে অর্ধশত ওষুধের দাম

সরকার নির্ধারিত ৫৩ ধরনের ওষুধের বাড়তি দাম এ সপ্তাহ থেকেই কার্যকর হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদনের চিঠি পেলে দাম বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। অধিদপ্তর মনে করছে, দুয়েক দিনের মধ্যেই এ সংক্রান্ত চিঠি পাবে তারা এবং এ সপ্তাহ থেকেই বাড়তি দাম কার্যকর করা যাবে।

এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলোর উৎপাদন ব্যয় ও বাজার যাচাইবাছাই করে ২০টি জেনেরিকের ৫৩ ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এগুলো সবই দেশীয় ওষুধ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দেবে। চিঠি পেলে দাম কার্যকর হবে। আশা করছি, এ সপ্তাহের মধ্যেই কার্যকর করা যাবে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত ৩০ জুন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ওষুধের মূল্যনির্ধারণ কমিটির ৫৮তম সভায় এসব ওষুধের পুনর্নির্ধারিত দাম অনুমোদন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে ওই সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার, বাংলাদেশে মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও ফার্মাসিউটিক্যাল সোসাইটির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জানানো হয়, ২০১৫ সালের ২২ এপ্রিল ওষুধের মূল্য নির্ধারণসংক্রান্ত সর্বশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে দু’একটি ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছিল। এরপর আর দাম বাড়ানো হয়নি। এ বছর  ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামাল, প্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয়, ডলারের বিনিময় মূল্য এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে। ফলে ওষুধ উৎপাদনেও ব্যয় বেড়েছে। আবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য তালিকাভুক্ত ১১৭টি জেনেরিকের বিভিন্ন ওষুধের বর্তমান উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় বাজারে সেগুলোর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাই বিভিন্ন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদিত মূল্যসহ মূল্যায়নের জন্য গত ৮ জুন টেকনিক্যাল সাব-কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মানুযায়ী আবেদিত ওষুধের দাম নির্ধারণ করে মূল্য নিয়ন্ত্রণ কমিটিতে উপস্থানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওইদিন কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘প্রাইস ফিক্সেশন পলিসি’ (দাম নির্ধারণ নীতি) অনুসরণ করে ৫৩টি ওষুধের খুচরা মূল্য অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে ৩০ জুনের সভায় সরকার তাতে অনুমোদন দেয়।

সর্বোচ্চ ১৩৪% পর্যন্ত বেড়েছে: ওষুধের বাড়তি মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ ১৩৪ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে। কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে ১০০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ আগে যে দামে ওষুধ কেনা যেত, এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ টাকা গুনতে হবে। এর মধ্যে প্যারাসিটামলের ৫০০ এমজির প্রতিটি ট্যাবলেট ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ টাকা ২০ পয়সা। মিথাইলডোপা গ্রুপের ১ টাকা ৫০ পয়সার ২৫০ এমজি ট্যাবলেট ৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ ১৩৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। লিডোকেইন গ্রুপের ১% ডব্লিউভি, ২০ এমজি/২এমএল ইনজেকশনের আগের দাম ছিল ৩ টাকা ৬ পয়সা, ৯৯ শতাংশ বেড়ে ওষুধটির দাম হয়েছে ৭ টাকা। বেনজাথিন বেনজিলপেনিসিলিন ১২ লাখ ইউনিট/ভায়ল ইনজেকশনের আগের দাম ১৫ টাকা ৬০ পয়সা, প্রায় ৯৯ শতাংশ বেড়ে দাম হয়েছে ৩০ টাকা।

দাম বাড়ানোর কারণ: এসব ওষুধের দাম বাড়ানোর আগে কোম্পানিগুলোর উৎপাদন খরচসহ সামগ্রিক ব্যয় পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দাম বাড়ানোর আগে বাজার একশ ভাগ যাচাই করা হয়েছে। জনগণের কষ্ট যাতে কম হয়, সে জন্য উৎপাদন ব্যয় অনুপাতে যে দাম আসে, তার চেয়ে কম দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কাঁচামাল, কারখানায় উৎপাদন ব্যয়, বিমান ভাড়া ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ফলে এসব ওষুধের উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হলে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। 

এই কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯৪ সালে দাম বাড়ানো হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে দু’একটার দাম বাড়ানো হয়েছিল। এরপর আর বাড়ানো হয়নি। এ বছর সব জিনিসের দাম বেড়েছে। কোম্পানিগুলোর লোকসান হচ্ছে। কোম্পানির মালিকরা আমাদের বলেছে, তারা আর চালাতে পারছে না। দাম না বাড়ালে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তারা আগেই প্রস্তাবনা দিয়েছিল দাম বাড়ানোর। আমরা ঠেকিয়ে রেখেছিলাম যতদিন পেরেছি। কিন্তু এখন আর পারছি না। কারণ ওরা যদি উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তা হলে দেশে এসব ওষুধের সংকট দেখা দেবে। তখন এসব ওষুধ চোরাইপথে বাইরে থেকে আসবে। ওষুধের বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এটা চিন্তা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করি। তারপর সরকার যেটুকু না বাড়ালেই নয়, সে অনুপাতে কিছুটা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আমরা উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ  করেছি। তাতে দেখা গেছে, ব্যয় অনুপাতে যতটা দাম বাড়ানোর কথা, তার চেয়ে অনেক কম বাড়ানো হয়েছে।

কোন ওষুধের দাম কত বাড়ছে: ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী, ৭০ পয়সার প্যারাসিটামল ৫০০ এমজি ট্যাবলেট ১ টাকা ২০ পয়সা ও প্যারাসিটামল ৫০০ এমজি ট্যাবলেট (র‌্যাপিড) ১ টাকা ৩০ পয়সা, ১ টাকা ৩১ পয়সার প্যারাসিটামল ৬৫০ এমজি ট্যাবলেট (এক্সআর) ২ টাকা, ১ টাকা ৪ পয়সার প্যারাসিটামল ১০০০ এমজি ট্যাবলেট ২ টাকা ২৫ পয়সা, ১২ টাকা ৮৮ পয়সার প্যারাসিটামল ৮০ এমজি ড্রাপস ১৫ এমএল বোতল ২০ টাকা, ১৮ টাকার প্যারাসিটামল ৮০ এমজি ড্রাপস ৩০ এমএল বোতল ৩০ টাকা, ১৮ টাকার প্যারাসিটামল ১২০ এমজি/৫ এমএল সাসপেনশন (৬০ এমএল) বোতল ৩৫ টাকা, ৩০ টাকা ৮ পয়সার প্যারাসিটামল ১২০ এমজি/৫ এমএল সাসপেনশন ১০০ এমএল বোতল ৫০ টাকা, ১৮ টাকার প্যারাসিটামল ১২০ এমজি/৫ এমএল সিরাপ (৬০ এমএল) বোতল ৩৫ টাকা, ২৭ টাকা ৭২ পয়সার প্যারাসিটামল ১২০ এমজি/৫ এমএল সিরাপ (১০০ এমএল) বোতল ৫০ টাকা করা হয়েছে।

মেট্রোনিডাজল গ্রুপের ৬০ পয়সার ২০০ এমজি ট্যাবলেট কোটেড এক টাকা, ৯২ পয়সার ২৫০ এমজি ট্যাবলেট কোটেড ১ টাকা ২৫ পয়সা, ১ টাকা ৩৭ পয়সার ৪০০ এমজি ট্যাবলেট কোটেড ১ টাকা ৭০ পয়সা, ১ টাকা ৬৬ পয়সার ৫০০ এমজি ট্যাবলেট কোটেড ২ টাকা, ২৬ টাকার ২০০ এমজি/৫এমএল সাসপেনশন ৬০ এমএল বোতল ৩৫ টাকা, ৩৪ টাকা ৯২ পয়সার ২০০ এমজি/৫এমএল সাসপেনশন ১০০ এমএল বোতল ৪৫ টাকা ও ৭৪ টাকা ৩৫ পয়সার ৫০০ এমজি/১০০ এমএল ইনফিউশন ১০০ এমএল বোতল ৮৫ টাকা করা হয়েছে।

এমোক্সিসিলিন বিপি গ্রুপের ২৬ টাকা ৩৪ পয়সার ১২৫ এমজি/১.২৫ এমএল সাসপেনশন ১৫ মিলি বোতল ৩৫ টাকা, ৪১ টাকা ৪০ পয়সার ১২৫ এমজি/৫ এমএল সাসপেনশন ১০০ মিলি বোতল ৭০ টাকা, ৬৭ টাকা ৯৪ পয়সার ২৫০ এমজি/৫ এমএল সাসপেনশন-ডিএস ১৫ মিলি বোতল ১০০ টাকা, ৩ টাকা ১৫ পয়সার ২৫০ এমজি ক্যাপসুল ৪ টাকা, ৫ টাকা ৯০ পয়সার ৫০০ এমজি ক্যাপসুল ৭ টাকা ৫ পয়সা ও ২৪ টাকা ১০ পয়সার ৫০০ এমজি ইনজেকশন ৫৫ টাকা করা হয়েছে।

জাইলোমেট্রোজালিন এইচসিআই গ্রুপের ৯ টাকা ৬০ পয়সার ০.০৫% নাসাল ড্রপ ১৫ এমএল ১৮ টাকা ও ১০ টাকা ৪ পয়সার ০.১% নাসাল ড্রপ ১৫ এমএল ২০ টাকা করা হয়েছে।

প্রোকলেপেরাজিন গ্রুপের ৫এমজি ট্যাবলেট ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৫ পয়সা ও ১২.৫ এমজি ইনজেকশন ৪ টাকা ৩৬ পয়সা থেকে ৯ টাকা হয়েছে।

৩ টাকা ২২ পয়সার ডায়াজেপাম ১০এমজি/২এমএল ইনজেকশন ৭ টাকা হয়েছে।

মিথাইলডোপা গ্রুপের ১ টাকা ৫০ পয়সার ২৫০ এমজি ট্যাবলেট ৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ ১৩৪ শতাংশ দাম বেড়েছে। এ ছাড়া এই গ্রুপের ৫ টাকা ১৩ পয়সার ৫০০ এমজি ট্যাবলেট বেড়ে ৬ টাকা ৯ পয়সা হয়েছে।

ফ্রুসেমাইড গ্রুপের ৫ টাকা ৯৯ পয়সার ২০ এমজি/২এমএল ইনজেকশন বেড়ে ৯ টাকা ও ৫৬ পয়সার ৪০ এমজি ট্যাবলেট এক টাকা হয়েছে।

ফেনোবারাবিটাল গ্রুপের ৬৮ পয়সার ৩০ এমজি ট্যাবলেট বেড়ে এক টাকা, ১ টাকার ৬০ এমজি ট্যাবলেট ১ টাকা ৫০ পয়সা, ২১ টাকা ৭৮ পয়সার ৫০ এমএল এলিক্সির ২০ এমজি/৫ এমএল বোতল ৪৩ টাকা ও ৫০ টাকার ১০০ এমএল এলিক্সির ২০ এমজি/৫ এমএল বোতল ৭০ টাকা হয়েছে।

৪ টাকা ৩৫ পয়সার ওআরএস স্যালাইন ৫০০ এমএল ৬ টাকা ও ৪ টাকা ৪০ পয়সার ওআরএস ফ্রুটি ২৫০ এমএল বেড়ে ৬ টাকা হয়েছে।

লিডোকেইন গ্রুপের ১% ডব্লিউভি, ২০ এমজি/২ এমএল ইনজেকশনের আগের দাম ছিল ৩ টাকা ৬ পয়সা, ৯৯ শতাংশ বেড়ে ওষুধটির দাম হয়েছে ৭ টাকা। এই গ্রুপের ১% ডব্লিউভি, ৫০ এমএল ইনজেকশনের আগের দাম ছিল ২০ টাকা, বেড়ে হয়েছে ৩৫ টাকা, ২% ডব্লিউভি, ৫০ এমএল ইনজেকশনের আগের দাম ছিল ২৫ টাকা, বেড়ে হয়েছে ৪০ টাকা।

ফলিক এডিস ০.০৫ এমজি/১০০ এমএল ওরাল সলিউশনের (১০০ এমএল বোতল) দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ টাকা।

ক্লোরফেনিরামিন ২এমজি/৫এমএল সিরাপের (৬০ এমএল বোতল) আগের দাম ছিল ১৩ টাকা, বেড়ে হয়েছে ২০ টাকা।

বেনজাথিন বেনজিলপেনিসিলিন ১২ লাখ ইউনিট/ভায়ল ইনজেকশনের আগের দাম ১৫ টাকা ৬০ পয়সা, প্রায় ৯৯ শতাংশ বেড়ে দাম হয়েছে ৩০ টাকা।

অ্যাসপিরিন গ্রুপের ৭৫ এমজি ট্যাবলেটের আগের দাম ছিল ৫৫ পয়সা, বেড়ে হয়েছে ৮০ পয়সা ও ৩০০ এমজি ট্যাবলেটের আগের দাম ছিল দেড় টাকা, বেড়ে হয়েছে ২ টাকা।

ফেনোক্সিমিথাইল পেনিসিলিন গ্রুপের ২৫০ এমজি ট্যাবলেটের আগের দাম ছিল ২ টাকা, বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৮০ পয়সা, ৫০০ এমজি ট্যাবলেটের আগের দাম ছিল ৩ টাকা ৮৬ পয়সা, বেড়ে হয়েছে ৫ টাকা ৫০ পয়সা, ২৫০ এমজি/৫এমএল সিরাপের (৫০ এমএল বোতল) আগের দাম ছিল ২১ টাকা ৫০ পয়সা, বেড়ে হয়েছে ৩৫ টাকা।

প্রোমেথাজিন গ্রুপের ৫এমজি/৫এমএল এলিক্সির (১০০ এমএল বোতল) আগের দাম ছিল ২১ টাকা ৩৫ পয়সা, বেড়ে হয়েছে ৩৫ পয়সা, ২৫এমজি/এমএল ইনজেকশনের আগের দাম ছিল ৩ টাকা, বেড়ে হয়েছে ৭ টাকা।

নরগেস্টেরেল ০.৩০ এমজি+ইথাইনিলিস্ট্রাডল ০.০৩এমজি ট্যাবলেটের দাম আগে ছিল এক টাকা ৫০ পয়সা, বেড়ে হয়েছে ২ টাকা।

ফেরোস ফেমেরেট ৭৫ এমজি ট্যাবলেলেটর আগের দাম ছিল ৩৮ পয়সা, বেড়ে হয়েছে ৫০ পয়সা।