করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কৃচ্ছ্র সাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু উল্টো পথে চলছে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’। তারা মহাখালীতে ৫ হাজার বর্গফুটের অফিস ছেড়ে গত ডিসেম্বরে উঠেছে রাজধানীর ১ মিন্টো রোডের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল অফিস কমপ্লেক্সে। তৃতীয় তলার ১০ হাজার স্কয়ার ফিটের ওই অফিসের মাসিক ভাড়াই ১০ লাখ টাকা। আরও রয়েছে সার্ভিস চার্জসহ নানা ধরনের বিল।
এ অফিসে এখন কাজ করছেন মাত্র ১৭ জন কর্মকর্তা। অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের প্রধান হচ্ছেন চেয়ারম্যান। চারজন পূর্ণকালীন সদস্য রয়েছেন। ১ জন সচিব, ৩ জন পরিচালক, ৪ জন উপপরিচালক ও ৪ জন সহকারী পরিচালকসহ মোট ১৭ জন কর্মরত আছেন। এছাড়া ৪৭ জনের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০ জন জুনিয়র কর্মকর্তার পদ। অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত অনেককে ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থায়ী করা হবে।
গতকাল রবিবার অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের অফিসে গিয়ে জানা যায়, ১০ হাজার বর্গফুটের অফিসটি তিনটি ব্লকে বিভক্ত। প্রত্যেকটি ব্লকের পাশেই আলাদা সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। ‘এ’ ব্লকে বসেন চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। ‘বি’ ব্লকে বসেন কাউন্সিল সচিব, পরিচালক ও অন্য কর্মকর্তারা। ‘সি’ ব্লকে সভাকক্ষ, প্রশিক্ষণ কক্ষ, লাইব্রেরি এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার। তবে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে গিয়ে বিশাল আকারের ‘সি’ ব্লকটি বন্ধ পাওয়া যায়। আর ‘বি’ ব্লকের বিশাল জায়গায় দুপাশে বসেছেন কর্মকর্তারা; বেশিরভাগ জায়গাই ফাঁকা।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ এ ভবনটি পরিচালনা করে সরকারের একটি কোম্পানি বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল)। এখানে বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জ অফিস, পর্যটনসংক্রান্ত অফিস, একাধিক ব্যাংকসহ নানা ধরনের অফিস রয়েছে। তৃতীয় তলায় যেখানে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের অফিস, সেখানে আগে একটি বহুজাতিক সংস্থার অফিস ছিল। তারা করোনার মধ্যে তাদের অফিস ছেড়ে দেয়।
সূত্র জানায়, অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল বিএসএল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১০ হাজার বর্গফুটের এ অফিসটি ১০৫ টাকা বর্গফুট হিসেবে ভাড়া নিয়েছে। সে হিসাবে এর মাসিক ভাড়া প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এখানে যে ১৭ জন কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের মাথাপিছু হিসাব করলে প্রায় ৫৯ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। অথচ এখানে জুনিয়র অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা এর চেয়ে কম বেতন পান।
আগে ৫১-৫২ মহাখালীতে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের অফিস ছিল। সেখানে প্রায় ৫ হাজার বর্গফুটের অফিসের প্রতি বর্গফুটের ভাড়া ছিল ৮৫ টাকা। সে হিসাবে এখানে কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। এ অফিসের ব্যাপারে যেন কোনো বিতর্ক না হয় সেজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেই তা ভাড়া নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হবে। এ কারণে আগারগাঁওয়ের আশপাশে তাদের অফিস থাকা যুক্তিযুক্ত ছিল। ওই এলাকায় ২-৩ লাখ টাকার মধ্যে বড় অফিসও নেওয়া সম্ভব। উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রকল্প হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যানহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (হেকেপ), এর একটি কম্পোনেন্ট ছিল কোয়ালিটি অ্যাসুয়ারেন্স সেল (কিউএসি)। ওই কম্পোনেন্টের ওপর ভিত্তি করেই অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের জন্ম। হেকেপ প্রজেক্টের অফিস ছিল কারওয়ানবাজারে। ২ হাজার ৫৪ কোটি টাকার ওই প্রকল্পের অফিস ভাড়া ২০১৮ সালে ছিল মাত্র আড়াই লাখ টাকা।
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের চেয়ে এখনকার অফিস বড়। আমাদের পরিসর বেড়েছে, নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। আমাদের বড় জায়গারও দরকার। অফিস ভাড়া বাড়লেও তা সরকার বহন করছে। বিদেশে এ ধরনের কাউন্সিল সাধারণত নিজের আয়ে চলে। আমাদের কার্যক্রম শুরু হলে অর্থের সংকট হবে না। গত অর্থবছরে আমরা যে বাজেট পেয়েছিলাম করোনার কারণে তার পুরোটা খরচ করতে পারিনি। সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা বিদেশের প্রশিক্ষণেও অংশ নিচ্ছি না।’
কীভাবে কাজ করবে অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল : ২০১৭ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (বিএসি) আইন পাস হয়। বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে ২০২১ সালে। কাজ শুরুর সাড়ে পাঁচ বছরেও তারা বিশ^বিদ্যালয়ের কোর্সগুলোর অ্যাক্রেডিটেশন শুরু করতে পারেনি। প্রস্তুতি নিতেই তাদের এতদিন লেগেছে। আগামী বুধবার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অ্যাক্রেডিটেশন কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। আজ সোমবার এ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়েছে।
অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল সূত্র জানায়, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিটি কোর্সের জন্য পৃথকভাবে অ্যাক্রেডিটেশন সনদ নিতে হবে। আর প্রতি কোর্সের জন্য ফি দিতে হবে ২ লাখ টাকা। সাধারণত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ৩০টি কোর্স থাকে তাহলে তাদের ফি দিতে হবে ৬০ লাখ টাকা। এরপর তিন সদস্যবিশিষ্ট বিএসির বিশেষজ্ঞ কমিটি পাঠদান ও শিখন পদ্ধতি মূল্যায়ন ব্যবস্থা; অ্যাসাইনমেন্ট, প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র পর্যালোচনা পদ্ধতি; গবেষণা পদ্ধতি; পাঠদানের পরিবেশ প্রভৃতি পর্যবেক্ষণ করে একটি নম্বর প্রদান করবে। ১০০-এর মধ্যে ৭০ নম্বর পেলে ওই কোর্সের অ্যাক্রেডিটেশন সনদ দেবে কাউন্সিল। আর ৬০ শতাংশ থেকে ৬৯ শতাংশ নম্বর পেলে দেওয়া হবে কনফিডেন্স সার্টিফিকেট। তবে ৬০ শতাংশের কম নম্বর পেলে কোনো সার্টিফিকেট দেওয়া হবে না।
অ্যাক্রেডিটেশন সার্টিফিকেটের মেয়াদ ইস্যুর তারিখ থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত। নির্দিষ্ট সময় পর ফের এ সনদ নিতে হবে। তবে কনফিডেন্স সার্টিফিকেটের মেয়াদ ইস্যুর তারিখ থেকে সর্বোচ্চ এক বছর। এর মধ্যে ওই কোর্সের মানের উন্নয়ন ঘটিয়ে আবার ১ লাখ টাকা ফি দিয়ে অ্যাক্রেডিটেশন সনদের জন্য আবেদন করতে হবে।
মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের মান নিয়েই প্রশ্ন : ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় বড় বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের মান যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন সেই অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের কর্মকর্তাদের মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এখানে শিক্ষা ক্যাডারের যেসব কর্মকর্তার পদায়ন হয়েছে তাদের সবাই দক্ষ নন। বেশিরভাগ কর্মকর্তাই ঢাকায় থাকার জন্য তদবির করে এখানে পদায়ন নিয়েছেন। মাউশি অধিদপ্তরে একজন কর্মকর্তা অনিয়মের অভিযোগে কয়েক বছর আগে দেশের দূরবর্তী কলেজে বদলি হলেও তিনি এখন এ কাউন্সিলেরই পরিচালক। আরেকজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা নানা তদবির করে অন্য কোথাও খালি না পেয়ে এখানে পদায়ন নিয়েছেন। তারা ইদানীং বিভিন্ন জায়গায় গর্ব করে বলছেন, আমাদের অফিস ইন্টারকন্টিনেন্টালে। মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা ভবনের কাছাকাছি এ অফিস হওয়ায় অনেকেই তাদের নিজেদের অফিস ফেলে অন্য জায়গায় বেশি সময় দেন। সম্প্রতি শিক্ষা ক্যাডারের একজন নারী কর্মকর্তা এখানে সংযুক্তি নিয়েছেন। প্রশাসন ক্যাডারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আত্মীয় হওয়ায় তিনি এখানে আসতে পেরেছেন।
অধ্যাপক ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে যারা কর্মকর্তা হিসেবে আছেন তারা মূলত রুটিন ওয়ার্ক করবেন। অ্যাক্রেডিটেশন পর্যায়ের মূল কাজ করবে বিশেষজ্ঞ কমিটি। তারা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করেছি।’