বিএসি কি বিনিয়োগ না অপব্যয়

দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়ে থাকে বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের অধীনে। কিন্তু সেখানেও দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণসহ নানা দুর্নীতি-অনিয়ম রোধের প্রশ্নে এই কমিশন ইতিমধ্যেই ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দারে পরিণত হয়েছে। কেননা, এসব ক্ষেত্রে তদন্ত ও সুপারিশ করা ছাড়া কোনো রকম শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ারই নেই কমিশনের। এই বাস্তবতার মধ্যেই আবার উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন ২০১৭-এর অধীনে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল বা ‘বিএসি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু কাজ শুরুর সাড়ে পাঁচ বছরেও বিএসি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সগুলোর অ্যাক্রেডিটেশন শুরু করতে পারেনি। অথচ বিশাল ব্যয়বহুল অফিস আর কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের হিড়িক চলছে সেখানে। প্রশ্ন উঠছে যে, সরকার যখন মহামারী ও অর্থনীতির মন্দাভাব মোকাবিলায় কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে, সেখানে বিএসি’র মতো একটি মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন অপব্যয়ের পথে হাঁটছে?

সোমবার দেশ রূপান্তরের ‘১৭ কর্মকর্তার জন্য ১০ লাখ টাকার অফিস’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল মহাখালীর ৫ হাজার বর্গফুটের অফিস ছেড়ে গত ডিসেম্বরে উঠেছে রাজধানীর ১ মিন্টো রোডের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল অফিস কমপ্লেক্সে। তৃতীয় তলার ১০ হাজার স্কয়ার ফুটের ওই অফিসের মাসিক ভাড়াই ১০ লাখ টাকা। আরও রয়েছে সার্ভিস চার্জসহ নানা ধরনের বিল, যা মহাখালীর আগের অফিসের বেশ কয়েক গুণ। অথচ এই অফিসে এখন কাজ করছেন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও চারজন পূর্ণকালীন সদস্যসহ মাত্র ১৭ কর্মকর্তা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করতে হবে। এ কারণে আগারগাঁওয়ের আশপাশে তাদের অফিস থাকা যুক্তিযুক্ত ছিল। ওই এলাকায় ২-৩ লাখ টাকার মধ্যে বড় অফিসও নেওয়া সম্ভব। এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান যারা নিয়ন্ত্রণ করবেন সেই  কাউন্সিলের কর্মকর্তাদের মান নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এখানে সচিব, উপসচিব, সহকারী সচিবসহ শিক্ষা ক্যাডারের যেসব কর্মকর্তার পদায়ন করা হয়েছে তারা যেমন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বিষয়ে অভিজ্ঞ নন, তেমনি শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের সঙ্গেও তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এ ছাড়া এই কর্মকর্তাদের অনেকেই অদক্ষ এবং তদবির করে এখানে পদায়নের ব্যবস্থা করেছেন বলেও অভিযোগ আছে।

বিশ্ববিদ্যালয় তথা উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য যেমন অস্পষ্ট তেমনি এর পরিচালনার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই যেসব পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে সেটা উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কেননা, একদিকে এই কাউন্সিল পরিচালনায় শিক্ষাবিদ-গবেষকদের বদলে যেমন আমলাদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে অন্যদিকে এই কাউন্সিলকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাকার্যক্রম বা নানা কোর্স পরিচালনার সক্ষমতার সনদ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে। যা বিশ্ববিদ্যালয় তথা উচ্চশিক্ষার মৌল ধারণারই পরিপন্থী। এ ছাড়া প্রতিটি কোর্স পরিচালনার জন্য ২ লাখ টাকা নিবন্ধন ফি দিয়ে বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিটি বিভাগকে। একটা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ১০০ কোর্স পরিচালনা করে, তাহলে এই কাউন্সিলকে দিতে হবে ২ কোটি টাকা। এই সক্ষমতার সনদের মেয়াদ আবার মাত্র পাঁচ বছর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সনদের মেয়াদ মাত্র এক বছর। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের সক্ষমতার ওপর যদি আস্থা রাখা না যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌল কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন করা দরকার। প্রশ্ন ওঠা দরকার কোন মানের প্রার্থীদের বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে? কোন পদ্ধতিতে শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান এবং গবেষণার মান কেন উন্নত করা যাচ্ছে না সেসব নিয়ে। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে আমরা কেন একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছি, অন্যদিকে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আমলাতন্ত্রের জোয়াল চাপিয়ে দিচ্ছি।   

এটা মনে রাখা দরকার, উচ্চশিক্ষা পৃথিবীর সব দেশেই একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। উচ্চশিক্ষার মানোয়ন্ননে কোথায় কতটা ব্যয় করা হবে তার একটি চর্চাও বৈশ্বিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় বিনিয়োগের প্রধান ক্ষেত্রটি নিঃসন্দেহে গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বিপরীত দিকেই হাঁটছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে একের পর এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার মধ্য দিয়ে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অর্ধশত হয়ে গেলেও উচ্চশিক্ষায় ব্যয়ের সিংহভাগই হয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালন খাতে। কিন্তু উচ্চমানের শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণা খাতের জন্য বরাদ্দ নামমাত্রই। অনিবার্য ফল হিসেবে উচ্চশিক্ষার কাক্সিক্ষত মান অধরাই রয়ে গেছে। অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলে নানারকম বিনিয়োগের চেষ্টাও থেমে নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিনিয়োগ কি যথাযথ ক্ষেত্রে করা হচ্ছে? একই সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠছে যে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্ননের জন্য সরাসরি বিশ^বিদ্যালয়ে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে নতুন মান নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম কতটা কাজে আসবে?