দুনিয়ার জীবনে কতজনের সঙ্গে কতভাবে পরিচয় হয়। পরিচয় কখনো ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। ঘনিষ্ঠতার দাবিতেই মানুষ একে-অন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায়। সহজ কথায় যাকে বলা হয়, সৌজন্য সাক্ষাৎ। হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে এমন সাক্ষাতের ফজিলতের কথা। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এক লোক তার এক ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিল। সে ভাই থাকত আরেক এলাকায়। আল্লাহ তখন তার যাত্রাপথে একজন ফেরেশতা দাঁড় করিয়ে রাখলেন। লোকটি যখন ফেরেশতার কাছে এল, ফেরেশতা তাকে বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে জানাল, আমি এ এলাকায় আমার এক ভাইয়ের কাছে যাচ্ছি। ফেরেশতা প্রশ্ন করল, তার কাছে তোমার কোনো পাওনা আছে, যা তুমি আনতে যাচ্ছ? সে বলল, না, তেমন কিছু নয়, তবে আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। ফেরেশতা তখন বলল, শোনো, আমি তোমার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ বার্তা নিয়ে এসেছি তুমি যেমন তার সন্তুষ্টির জন্য তোমার ভাইকে ভালোবাস, তিনিও তেমনি তোমাকে ভালোবাসেন। সহিহ্ মুসলিম : ২৫৬৭
পুরস্কারটি কত বিশাল, ভাবা যায়! মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসা! আর পুরস্কার হিসেবে যে আল্লাহর ভালোবাসা পাবে, সে যে ভালো থাকবে, জান্নাতে যাবে তা সহজেই অনুমেয়।
তবে সম্পর্ক রক্ষাকারী এ সৌজন্য সাক্ষাতে প্রয়োজন সচেতনতা। অসতর্ক সাক্ষাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। মেহমান হয়ে দাঁড়াতে পারে নানাবিধ মসিবতের কারণ। আদব-শিষ্টাচার ও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তাই অনস্বীকার্য।
ইসলামের বিধান হলো, যেকোনো সময় যে কারও সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য না যাওয়া। যেকোনো সময় গিয়ে কারও বাড়ির বাইরে থেকে তাকে না ডাকা। যার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা, বাড়িতে তিনি বিশ্রামে থাকতে পারেন, বাড়িতে কোনো রোগী থাকতে পারে এবং তিনি ওই রোগীর সেবায় নিয়োজিত থাকতে পারেন, একান্তই নিজস্ব কোনো কাজে মশগুল থাকতে পারেন, স্ত্রী-ছেলেমেয়েদের নিয়ে সময় কাটাতে পারেন। এখানে হস্তক্ষেপ করা কিংবা বিঘ্ন ঘটানোর অধিকার নেই কারও। তাই সাক্ষাৎ করতে হবে সাক্ষাতের সময়ে। নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে না পারলে অপেক্ষায় থাকতে হবে তিনি কখন স্বাভাবিক রুটিন অনুসারে বেরিয়ে আসেন; তখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা।
সৌজন্য সাক্ষাতের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর ফল পাওয়া যাবে দুনিয়া-আখেরাতে। কিন্তু একপক্ষের অসতর্কতায় অপরপক্ষ যদি কষ্ট অনুভব করেন, তখন তাতে কাক্সিক্ষত ফল অর্জিত হবে না। যে মেহমানের আগমনে মেজবানের কষ্ট হয়, এমন মেহমানের সাক্ষাৎ থেকে মনে মনে মুক্তি কামনা করাও মেজবানের জন্য বিচিত্র নয়। তাই সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য এসে কাউকে অহেতুক কষ্টে ফেলা যাবে না।
অসময়ে কারও সাক্ষাতে যাওয়া তার কষ্টের কারণও হতে পারে। কাজের মানুষ যারা, তারা তো তাদের সময়গুলো কোনো না কোনো কাজেই কাটায়। তাই যে কোনো সময় তার কাছে গিয়ে উঠলে তার ওই সময়ের নির্ধারিত কাজে ব্যাঘাত ঘটবে, সন্দেহ নেই। হতে পারে সময়টা তার বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত। সাক্ষাতের সৌজন্য রক্ষা করতে গিয়ে বিশ্রামের সময়টা তিনি কাটিয়ে দিলেন কথা বলে। কিন্তু বিশ্রাম না করার রেশ হয়তো তার থেকে যাবে অনেকক্ষণ। এমনও হতে পারে ঘরের সবাই বিশ্রামে। সময়টাও বিশ্রামেরই। এমন মুহূর্তে কেউ এসে কলিংবেল টিপল। এতে যে একবার ঘুম ভাঙল, পরে আর ঘুম এল না। এর রেশ কাটতেও লেগে যেতে পারে অনেক সময়। তাই সাক্ষাতের সময় নির্ধারণে সতর্কতা জরুরি।
সাক্ষাৎ করতে এসে অহেতুক দীর্ঘসময় নেওয়া যাবে না, যা সাক্ষাৎদাতার জন্য বিরক্তি কিংবা কষ্টের কারণ হয়। কষ্ট তো কাউকেই দেওয়া যায় না। আর এখানে সাক্ষাৎটা সৌজন্যের। সৌজন্যের সাক্ষাৎ যদি কষ্ট নিয়ে আসে, তবে তা আর কতটুকু ফলদায়ক হবে? যদি দীর্ঘ কথা বলার প্রয়োজন হয়, তবে আগেই অনুমতি নেওয়া উচিত। সময় নিয়ে আসা উচিত। সর্বোপরি পরিবেশ-পরিস্থিতি সামনে রেখেই আলোচনা শুরু করতে হবে। সাক্ষাৎদাতা, মেহমানের আদব ও ভদ্রতা রক্ষা করতে গিয়ে তিনি তো সয়ে যাচ্ছেন, আর সাক্ষাৎপ্রার্থী একের পর এক নানা কথা বলেই যাচ্ছে এটা চরম অশিষ্টাচার। এ বিষয়েও সতর্কতা জরুরি।
বর্তমান সময়ে মানুষের নানা কাজকর্ম যেমন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে, এর পাশাপাশি কাজের পরিমাণও বেড়ে গেছে অনেক গুণ। চারদিকে কেবলই ব্যস্ততার আক্ষেপ। প্রত্যেকেই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাই সৌজন্য সাক্ষাতে এসে দীর্ঘ সময় না নেওয়া।
প্রযুক্তির উন্নতিতে পারস্পরিক যোগাযোগ এখন আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। যেতে চাইলে সহজেই কোথাও যাওয়া যায়। আবার আধুনিক যোগাযোগমাধ্যম ফোনের মধ্য দিয়েও মেটানো যায় সৌজন্য সাক্ষাতের চাহিদার অনেকটাই। তবে সাক্ষাতের যাবতীয় আদব ও শিষ্টাচার লক্ষ রাখতে হবে ফোনের ক্ষেত্রেও। সৌজন্য রক্ষা করতে গিয়ে কাউকে বিরক্ত করা যাবে না, কারও কষ্টের কারণ হওয়া যাবে না, কারও সময় নষ্ট করা যাবে না, বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না। ফোনে দীর্ঘ সময় না নেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে, মুসলমানের সাক্ষাৎ কেবলই সাক্ষাৎ নয়। এরমধ্য দিয়ে যেমন আন্তরিকতা ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়, তেমনি সমৃদ্ধি আসে দুনিয়া-আখেরাত সর্বক্ষেত্রে। পারস্পরিক দেখা সাক্ষাতে কিংবা ফোনে কথাবার্তায় যখন নিজেদের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে, এতে একদিকে একে-অন্যের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার সুযোগ হয়, এর পাশাপাশি মুমিনের পারস্পরিক কথাবার্তায় বিভিন্নরকম দোয়াও উচ্চারিত হয়। আর মুমিনমাত্রই এ দোয়াকে গনিমত মনে করে। একজনের ভালো কোনো সংবাদ শুনে আরেকজন তার জন্য বরকতের দোয়া করে, কষ্টের কথা শুনলে বিপদমুক্তির দোয়া করে এবং সান্ত্বনা দিয়ে ধৈর্যধারণের শক্তি জোগায়। এভাবেই সৌজন্য সাক্ষাতের মতো ছোট বিষয়ও হয়ে ওঠে অতীব গুরুত্বপূর্ণ, নানাবিধ কল্যাণে ভরপুর। তবে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের এ কল্যাণ লাভ করতে হলে এর আদব ও শিষ্টাচারগুলো লক্ষ রাখতে হবে, দিতে হবে সচেতনতার পরিচয়।