বিলুপ্তির পথে চাঁদপুরের খাঁচায় মাছ চাষ প্রকল্প

ক্রমেই বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে চাঁদপুরের নদীতে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ প্রকল্প। একদিকে মাছের খাদ্যের অধিক মূল্য, অপর দিকে পানি দূষণের ফলে মারা যাচ্ছে চাষকৃত মাছ। এতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে চাষিরা। ইতিমধ্যে পুঁজি হারিয়ে অনেক চাষি বন্ধ করে দিয়েছে চাষাবাদ।

মাছ চাষিরা মনে করছেন, সংকট মোকাবিলায় অতি দ্রুত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অচিরেই বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে সম্ভাবনাময় এই শিল্পের।

চাঁদপুর সদর উপজেলার রঘুনাথপুর এলাকার বাসিন্দা আলমগীর গাজী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি জীবন শেষে ২০০৫ সালে ৭টি খাঁচা দিয়ে নিজ এলাকায় ডাকাতিয়া নদীতে শুরু করেন মাছ চাষ। এতে সাফল্য পেয়ে ২০১০ সালের মধ্যে তার মাছের খাঁচার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই শতাধিক। কিন্তু গেল কয়েক বছর ধরে লাভের মুখ দেখছেন না তিনি।

আলমগীর গাজী বলেন, প্রথম দিকে মাছ চাষে ভালো লাভবান হয়েছিলাম। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে নদীর পানি দূষণের ফলে চাষকৃত মাছ মারা যাচ্ছে। তাছাড়া মাছের খাদ্যের দামও বেড়েছে কয়েক গুন বেশি। এতে মাছ চাষ করে লাভের বদলে লোকসান হচ্ছে অনেক। লোকসান দিয়ে অনেক চাষিই বন্ধ করে দিয়েছে মাছ চাষ করা।

তিনি বলেন, ২০০ খাঁচা থেকে বর্তমানে আমার মাছ চাষের খাঁচা আছে মাত্র ৬৫টি। এভাবে লোকসান হতে থাকলে সেগুলোও তুলে ফেলে বন্ধ করে দিতে হবে চাষাবাদ।

শুধু আলমগীর গাজীই নয়, একই চিত্র জেলার শত শত মাছ চাষির। খাঁচায় মাছ চাষে লোকসান দিয়ে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে হয়েছেন দেউলিয়া। আর বর্তমানে যারা চাষাবাদ করছেন, তাদের অবস্থা খারাপ। অথচ চাঁদপুরে নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি বাংলাদেশের মডেল।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে ডাকাতিয়া নদীতে ১২টি খাঁচায় পরীক্ষামূলক ভাবে শুরু হয় এই চাষাবাদ পদ্ধতি। এতে ব্যাপক সাফল্য পেয়ে ২০০৫ সাল থেকে বিস্তার ঘটে মাছ চাষের এই পদ্ধতির। এর পরেই চাঁদপুরকে মডেল ধরে নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয় খাঁচায় মাছ চাষ কার্যক্রম।

মৎস্য চাষিরা জানান, ড্রামের ওপর লোহার পাইপ ও জাল দিয়ে তৈরি বিশেষ খাঁচায় চাষ হয় মাছের। স্বল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় দ্রুত প্রসার ঘটে এই শিল্পের। ডাকাতিয়া নদীর দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার এবং মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুই পাড়ে চার শতাধিক চাষি প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ করতেন। কিন্তু মাছ চাষে এখন আর লাভ না হওয়ায় বর্তমানে খাঁচার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজারে।

রঘুনাথপুর এলাকার আরেক মাছ চাষি মেহেদী হাসান বলেন, খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি পানি দূষণের ফলে মাছ মারা যাওয়া ক্ষতির মূল কারণ। দীর্ঘ দিন লোকসান হওয়ায় ইতিমধ্যে অনেক চাষি বন্ধ করে দিয়েছে চাষাবাদ।

তিনি বলেন, ১০ ফিট বাই ২০ ফিট প্রতিটি খাঁচায় ৫শ’ পিস মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের পোনা ছাড়া হয়। প্রতি পিস মাছের পোনার দাম পড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা করে। এসব মাছ ৭ থেকে ৮ মাসের মধ্যে ৬শ’ থেকে ৭শ’ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই সময়ে প্রতিটি খাঁচায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার খাদ্য খাওয়ানো হয়। কিন্তু বিক্রি করার উপযুক্ত সময় পর্যন্ত এসে মাছ মরে যাওয়ায় আমরা ২শ’ থেকে আড়াইশ’ পিস মাছ পাই। আগে যেখানে ১ কেজি তেলাপিয়া উৎপাদন করতে আমাদের খরচ পড়ত প্রায় দেড় শ’ টাকা, এখন খরচ পড়ছে প্রায় ১৮০টাকা। আমরা বিক্রিও করছি কেজি প্রতি ১৭০ থেকে ১৮০টাকায়। এতে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই অনেক চাষিই তাদের খাঁচা তুলে নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগে যেখানে ৪ শতাধিক চাষি ৮ হাজার খাঁচায় মাছ চাষ করত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৬০ জনে। খাঁচাও আছে মাত্র দুই হাজারের মতো। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই তাও বন্ধ হয়ে যাবে। এখনই কোন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে চাষাবাদ পদ্ধতি। এতে দেশে আমিষ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেকেই বেকার হয়ে পড়বে।

খাঁচায় কাজ করা শ্রমিক বাতেন মিয়া বলেন, আমরা অর্ধশতাধিক শ্রমিক মাছের খাঁচায় কাজ করে সংসার চালাতাম। কিন্তু বর্তমানে খাঁচায় মাছ চাষে চাষিরা লাভবান না হওয়ায় অনেকেই বন্ধ করে দিয়েছেন চাষাবাদ। এতে অনেক শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। এখন আমরাও বেকার হওয়ার শঙ্কায় রয়েছি।

জানা যায়, ২০১০ সালের ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাঁদপুর এলে তিনি হেলিকপ্টার থেকে ডাকাতিয়া নদীর ওপর খাঁচায় মাছ চাষ প্রকল্প দেখেন। এভাবে মাছ চাষের সম্ভাবনা ও লাভজনক দিকগুলো সম্পর্কে তাৎক্ষণিক অবহিত হন তিনি। এর পরপরই দেশের সব নদী অঞ্চলে খাঁচায় মাছ চাষের বিস্তার ঘটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন।

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, বর্তমানে মাছের খাদ্যের দাম কিছুটা বেশি। এই কারণে দেখা যাচ্ছে আগের মতো লাভবান হতে পারছেন না চাষিরা। তবে অন্যান্য জায়গার নদী দূষণের মতো চাঁদপুরে পানি এত দূষিত নয়। চাষাবাদ কালে বিভিন্ন কারণে কিছু মাছ মারা গেলেও তা খুব বেশি নয়। বর্তমানে লাভ কিছুটা কম হওয়ায় সাময়িকভাবে কিছু চাষি খাঁচা তুলে রাখছেন দাবি করেন তিনি।

মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, খাঁচায় মাছ চাষ কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে মাছ চাষিদের কাছে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য বিক্রি করা প্রয়োজন। তাছাড়া মাছ চাষিদের কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য আমরা ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রতি অনুরোধ জানাই।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, বর্তমানে চাঁদপুরে ২হাজার ভাসমান খাঁচায় বছরে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫০০ মেট্রিক টন তেলাপিয়া মাছ। যা চাঁদপুরের স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয়।