রাশিয়া ইউক্রেনের বিশাল এলাকা দখল করে নিতে পারে। সম্প্রতি এমনই তথ্য দিয়েছেন মার্কিন ন্যাশনাল সিকিওরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র। মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন মর্কিন ন্যাশনাল সিকিওরিটি কাউন্সিলের মুখপাত্র জন কিরবি। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের অধিকারে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শক্তিশালী এলাকাগুলো এবার সরাসরি দখল করে নিতে চাইছে রাশিয়া। যা বেআইনি’।
২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া একাজ শুরু করেছে। ক্রিমিয়া ঠিক এভাবেই দখল করেছিল তারা। এবার পূর্ব ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঠিক সেই একই কায়দায় তারা দখলের চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন মুখপাত্র। এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনকে অস্ত্রের একটি নতুন প্যাকেজ দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমেরিকায় ইউক্রেনের ফার্স্ট লেডি
মঙ্গলবারই আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন ইউক্রেনের ফার্স্ট লেডি ওলেনা জেলেনস্কা। হোয়াইট হাউসে তাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন জো বাইডেন ও তার স্ত্রী। বুধবার মার্কিন কংগ্রেসে বক্তৃতা দিয়েছেন জেলেনস্কা। সেখানে তিনি মার্কিন কংগ্রেসের কাছে আরো অস্ত্র দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, অন্য দেশকে আক্রমণ করার জন্য ইউক্রেন অস্ত্র চাইছে না, নিজেদের রক্ষা করার জন্য চাইছে।
ইতিমধ্যেই আমেরিকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সাহায্য করেছে ইউক্রেনকে। তার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন জেলেনস্কা। একইসঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। বক্তৃতা করার সময় খানিক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন জেলেনস্কির স্ত্রী। বলেছেন, ‘আমার এবং আমার স্বামীর একটাই অনুরোধ। ইউক্রেনে যেন আর একটিও বিমান হামলা না হয়, একটি বোমাবর্ষিত না হয়। এটা কি খুব বড় চাওয়া?’
শস্যসংকটে জার্মানির পরিকল্পনা
জার্মানির রেল সংস্থা ডয়চে বান সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ইউক্রেন থেকে শস্য বোঝাই করে তা জার্মানির রস্টক, হামবুর্গ এবং ব্রেক বন্দরে নিয়ে আসা হবে। সেখান থেকে তা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠানো হবে। কৃষ্ণসাগরের রাস্তা বাইপাস করে এই নতুন পথ তৈরি করা হবে বলে ঠিক করা হয়েছে। বস্তুত, কৃষ্ণসাগরের রাস্তা এখনো কার্যত অবরুদ্ধ। রাশিয়া সেখানে অবরোধ করে রেখেছে। ওই রাস্তা দিয়েই আফ্রিকা-সহ গোটা বিশ্বে শস্য যায়।
ইইউ-র নতুন নিষেধাজ্ঞা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নতুন নিষেধাজ্ঞা জারির পরিকল্পনা করেছে। বৃহস্পতিবার থেকেই তা কার্যকর হওয়ার কথা। রাশিয়া থেকে সোনা আমদানি করা যাবে না বলে নির্দেশ জারি করেছে তারা। এছাড়াও রাশিয়ার প্রথম সারির ব্যাংকের সমস্ত অ্যাসেট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার একাধিক ব্যক্তিকেও ব্লক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চেক রিপাবলিক নতুন এই নিষেধাজ্ঞা ইইউ-র তরফে ঘোষণা করেছে।
রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংকের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরাল ইইউ
খাদ্যপণ্য ও সারের বাড়তে থাকা দামে লাগাম টানতে রাশিয়ার কয়েকটি ব্যাংকের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে ইউরোপ মহাদেশভুক্ত দেশগুলোর জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বুধবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে বৈঠকে বসেছিলেন ইইউয়ের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দূতরা। সেই বৈঠকে রাশিয়ার ৭টি ব্যাংকের ফ্রিজ করা অর্থ ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন তারা।
এই ৭ ব্যাংক হলো ভিটিবি, সোভকোম ব্যাংক, নোভিকোম ব্যাংক, অটক্রিটি ব্যাংক, প্রমসভায়াস ব্যাংক এবং ব্যাংক রোশিয়া। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইউক্রেনে রুশ বাহিনী বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপের দেশগুলোতে এই ৭ ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধও ও সম্পদ ফ্রিজ করে ইইউ। তবে রাশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক সেবার ব্যাংকের সম্পদ ছাড়ের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এমন এক সময়ে এই পদক্ষেপ নিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যখন বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন হু হু করে বাড়ছে খাদ্যপণ্য ও সারের দাম। এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য প্রধানত দায়ী রাশিয়ার ওপর ইইউয়ের জারি করা একরাশ নিষেধাজ্ঞা। কারণ, এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বজুড়ে পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সম্প্রতি আফ্রিকার নেতারা এই সংকটের জন্য ইউরোপের ব্যাপক সমালোচনা করেছেন।
রাশিয়ার লক্ষ্য সুদূরপ্রসারী
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ সম্প্রতি রাশিয়ার একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী অধ্যুষিত দোনেৎস্ক এবং লুহানস্কই কেবল নয়, রাশিয়া ইউক্রেনের আরো অনেক অঞ্চল দখলে নিতে চায়। খেরসন এবং ঝাপরিজ্ঝিয়া অঞ্চলও তারা দখল করতে চায়। বস্তুত, লাভরভ বলেছেন, পশ্চিমারা ইউক্রেনের হাতে যত বেশি দূরপাল্লার মিসাইল তুলে দেবে, রাশিয়াও তত বেশি কিয়েভের দিকে অগ্রসর হবে।
ল্যাভরভ আরও অভিযোগ করেন, রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রধান মিত্র যুক্তরাজ্য। ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার চিরশত্রু এ দুদেশ চাইছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন অবিলম্বে রাশিয়া-ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যুদ্ধে রূপ নেয়।
নিজের এ অভিযোগের পক্ষে যুক্তি দিয়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইউক্রেনে রুশ বাহিনী সামরিক অভিযানের এক সপ্তাহের পরই দুই দেশের সরকারি প্রতিনিধিদের মধ্যে শান্তি সংলাপ শুরু হয়। কিন্তু সে সংলাপ অনুসরণ করে এখন পর্যন্ত ইউক্রেন কোনো গঠনমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পরামর্শ ও অস্ত্র সহযোগিতাকে দায়ী করেছেন ল্যাভরভ।
‘নিয়মিত পরামর্শ ও অস্ত্র সহায়তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা এই যুদ্ধ বন্ধে গঠনমূলক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখছে ইউক্রেনকে। তারা যে ইউক্রেনকে কেবল অত্যাধু্নিক অস্ত্র সরবরাহ করছে তাই নয়, বরং খুবই ঝুঁকিপূর্ণভাবে সেসব অস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্যও করছে’।
সম্পূর্ণ নিজেদের ফায়দার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এই যুদ্ধে ইউক্রেনকে সহায়তা দিচ্ছে উল্লেখ করে সাক্ষাৎকারে ল্যাভরভ বলেন, ‘সবাই জানে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে নিজেই বিপদে পড়েছে ইউরোপ। সেই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে তারা এখন আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চায়। আর দায়িত্বহীনভাবে তাতে ইন্ধন যোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য’।
‘কিন্তু সত্য হলো, খুবই বিপজ্জনক এক খেলায় নেমেছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। আমার মনে হয় না, এই খেলার ঝুঁকি সম্পর্কে ন্যুনতম কোনো ধারণা তাদের রয়েছে। তবে ইউরোপের সাধারণ জনগণের অধিকাংশই এ ব্যাপারে সচেতন এবং তারা এ ব্যাপারটি বোঝে’।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক জোট ন্যাটোকে ঘিরে দ্বন্দ্বের জেরে সীমান্তে আড়াই মাস সেনা মোতায়েন রাখার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই ঘোষণার দুদিন আগে ইউক্রেনের রুশ বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত দুই অঞ্চল দনেতস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ১৫২তম দিনে গড়িয়েছে ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান। এই চার মাস সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ লুহানস্ক, ইউক্রেনের দুই বন্দর শহর খেরসন ও মারিউপোল, দনেতস্ক প্রদেশের শহর লিয়াম, মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ জাপোরিজ্জিয়ার আংশিক এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে রুশ বাহিনীর হাতে।