আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। শ্রাবণে অঝোরে চলে বৃষ্টির ধারা। গ্রামের প্রচন্ড তাপে হাঁসফাঁসের সময়ে শ্রাবণের বৃষ্টিতে স্বস্তি ফিরে আসে। প্রকৃতি রং পাল্টে শান্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টির অঝোর ধারায় খাল-বিল ডুবে একাকার হয়ে যায়। মানুষ মনের আনন্দে খাল-বিলে মাছ ধরে। সে এক দারুণ অনুভূতি! কিন্তু চিরাচরিত সে ধারার পরিবর্তন হয়েছে। আষাঢ় শেষে শ্রাবণের এক সপ্তাহ পেরুলো। এখনো শ্রাবণের বৃষ্টির দেখা মিলছে না। দেশজুড়ে প্রচন্ড দাবদাহে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টির জন্য হাত তুলে মহান আল্লার দরবারে মোনাজাত করছে। এর পরেও বৃষ্টির দেখা মিলছে না।
মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে প্রকৃতির রূপ পাল্টে গেছে। বাংলাদেশসহ গোটা বিশ^ই মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের ব্যবহারে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এখন খরা, অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা, উজানের পানির ঢলে আগাম বন্যা, আইলা, সিডর, মহাসেনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। যা মোকাবিলা করে এ দেশের চাষিদের চাষাবাদ করতে হয়। যেমন শ্রাবণে চাষিরা আমন ধানের চারা রোপণ করে। এখন বৃষ্টির দেখা নেই। ফলে চাষিরা আমনের চারা রোপণ করতে পারছে না। উল্টো চাষের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
গ্রিনহাউজ গ্যাসের প্রভাবে ২০২০ সাল নাগাদ বিশে^ উষ্ণতা প্রবণ এলাকার পরিমাণ বেড়ে দ্বিগুণ হবে বলে আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে তীব্র দাবদাহ এবং উষ্ণতার কারণে উপকূলীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে মর্মেও পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল। হচ্ছেও তাই। অতিসম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের সাগরের জোয়ারে চট্টগ্রামের ব্যবসা কেন্দ্র খাতুনগঞ্জ হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। শুধু খাতুনগঞ্জই নয়, চট্টগ্রামের অনেক উঁচু জায়গাও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তলদেশের উচ্চতা প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এখন বৃষ্টির দেখা না মিললেও তীব্র দাবদাহ চলা অবস্থায় উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এমনকি আশঙ্কা করা হচ্ছে, সমুদ্রের তলদেশের উচ্চতা এভাবে বৃদ্ধি পেলে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চল সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ দিন দিন যেভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা রোধ করা না গেলে পরিবেশের ভারসাম্য যেমন রক্ষা করা সম্ভব হবে না, তেমনি অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগও আমাদের মোকাবিলা করতে হবে।
বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। এ বছর রংপুর, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামে টানা ৫/৬ মাস কম-বেশি যখন বৃষ্টিপাত হচ্ছিল, তখন রাজশাহী, নাটোর এলাকায় সামান্যতম বৃষ্টিপাত হয়নি। এসব এলাকার অবস্থা এখন আরও ভয়াবহ। আবাদের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। পানির অভাবে আমনের চারা রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পানির চাহিদা পূরণে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে। আর সে কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে তো অনেক আগে থেকেই ৫/৭ শত ফিট গভীর ছাড়া পানিই পাওয়া যেত না। এখন নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, রংপুর অঞ্চলেও পানির স্তর এত নিচে নেমে গেছে যে, ১০/১৫ ফুট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে গভীর করে নিচে সেচযন্ত্র বসিয়ে পানি উত্তোলন করে চাষিদের চাষাবাদ করতে হচ্ছে। ফলে এসব অঞ্চলের কোথাও কোথাও এখন পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেড়ে গেছে। যে পানি পান করে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
উজানের পানি একতরফাভাবে ভারত আটকে দেওয়ায় এক সময়ের প্রমত্তা নদী পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার মতো নদী এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। তিস্তার উজানে ভারত অংশে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় তিস্তার বাংলাদেশ অংশে প্রায় ১১৭ কিলোমিটার নদী এখন নামেই কেবল নদী। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র নদ মানুষ হেঁটেই নির্বিঘেœ পাড়ি দিচ্ছে। অর্থাৎ পানি সংকটের কারণে যেমন উত্তারাঞ্চল মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তেমনি সময়ে-অসময়ে উজানের পানির ঢলে বাংলাদেশে আকস্মিক বন্যার মতো পরিস্থিতিও আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শুধু উত্তরাঞ্চলই নয়, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেটের হাওর অঞ্চলের অবস্থাও খুবই করুণ। প্রায় প্রতি বছরই উজানের পানির ঢলে হাওরের আধাপাকা ধান তলিয়ে যায়। এ বছরও হাওরে হঠাৎ বন্যার কবলে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আর সিলেটে তো স্মরণকালের বন্যার কবলে মানুষের দুর্দশার শেষ ছিল না।
কিন্তু বিপুল জনসংখ্যা আর কার্যত স্থির ভৌগোলিক সীমারেখায় মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালালেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে অনেক পরিকল্পনাই ভেস্তে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে চাল, গমের আমদানি নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবছরও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে ফসলহানি হওয়ায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় সরকারকে চাল আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। কিন্তু তাদের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশের মানুষের খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন খাদ্য উৎপাদন আজ হুমকির মুখে। এমন প্রতিবন্ধকতামূলক কর্মকান্ড আমরা কোনোভাবেই আশা করি না। বিশেষ করে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য বাংলাদেশ সরকারের তরফে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হলেও দীর্ঘ কয়েক দশকেও আশ্বাস ছাড়া তেমন কিছুই মেলেনি।
এই অবস্থায় ভারত খাদ্য উৎপাদনে সমৃদ্ধ হচ্ছে, আর আমরা পানির অভাবে নিকট ভবিষ্যতে জীবনরক্ষার জন্য খাদ্য উৎপাদন করতে না পারার মতো পর্যায়ে চলে যাচ্ছি। এ অবস্থা থকে বাঁচতে হলে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তা নাহলে জীববৈচিত্র্য, চাষাবাদ কোনোটিই আমরা রক্ষা করতে পারব না। এমনিতেই গোটা বিশে^ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে খাদ্য সংকট আগামী দিনে আরও তীব্র হবে মর্মে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা আগাম আভাস দিয়েছে। সব দিক বিবেচনায় নিলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও পানির বর্তমান এ সংকটকে পরিকল্পিত উপায়ে মোকাবিলা করতে হবে।
এজন্য জরুরি ভিত্তিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে বড় বড় নদীর পানি পরিশোধন করে পানের উপযোগী করতে হবে। শুধু দৃশ্যমান বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই হবে না। সঙ্গে সঙ্গে পানি খাতে বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে নানা প্রকল্প গ্রহণ করে বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণ করতে হবে। খরা মোকাবিলায় সংকীর্ণ খালগুলো খনন করে বন্যার পানি সংরক্ষণ করে ‘দুধারে’ সেচ দিয়ে চাষাবাদ করতে হবে। অর্থাৎ এখন সময়ের দাবি হচ্ছে, বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণ করে পানের উপযোগী ও চাষাবাদের জন্য পানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করা।
গোটা দুনিয়ায় যেভাবে কার্বন ডাই-অক্সাইড বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা ভবিষ্যতে আরও নাজুকের দিকেই যাবে। এ জন্য সারা দেশেই বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের সর্বত্র বেশি করে গাছ রোপণ করতে হবে। সবুজ প্রকৃতি গড়ে তুলে অক্সিজেন নিগর্মনের পথ প্রশস্ত করতে হবে। তাহলেই শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইডের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। এজন্য দেশের পরিবেশবিদদের পরামর্শ নিয়ে প্রতি বছরই নির্দিষ্ট পরিমাণ গাছ রোপণ ও বনায়ন প্রকল্প বাস্তবাযন করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই।
অতি সস্প্রতি আমি চিকিৎসাজনিত কারণে ভারতের অঙ্গরাজ্য তামিলনাড়–র চেন্নাইয়ে হাসপাতালে ঘুরে এলাম। অনেক কিছুই দেখলাম, যা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মতো অনেক কিছুই আছে। চেন্নাই বিমানবন্দর থেকে নেমে ট্যাক্সিতে যাওয়ার পরে দেখলাম কয়েকটি উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের ওপরে অফিস, আদালত করে পাহাড়কে আস্ত রাখা হয়েছে। দেখতেও যেমন সুন্দর, তেমনি পরিবেশবান্ধবও বটে। তারপরও চেন্নাইয়ের আবহাওয়া এত উষ্ণ যে, সেখানে আমোদের জন্য চলাফেরা করা খবুই কঠিন। চেন্নাইয়ের পাশেই সমুদ্র সৈকত, সেখানকার আবহাওয়াও বেশি উষ্ণ। অথচ আমাদের দেশের কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে কী পরিমাণ নির্মল হাওয়া ও ভ্রমণ উপযোগী পরিবেশ বিদ্যমান। এ পরিবেশকে বাস উপযোগী রাখতে হলে আমাদের পাহাড় কাটা, গাছাপালা কাটা যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি প্রয়োজনে একটি গাছ কাটলে ন্যূনতম পাঁচটি গাছ রোপণ করতে হবে। তা নাহলে আবহাওয়া আরও উষ্ণ হয়ে যাবে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের অবস্থা বেশি ভয়াবহ হবে। ক’দিন আগে সৈয়দপুরে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এ অঞ্চলে মাটির নিচে খনিজ সম্পদ যেমন কয়লা ও পাথর উত্তোলন করায় আবহাওয়া দিন দিন উষ্ণ হয়ে উঠছে। যে কারণে উত্তরাঞ্চলসহ গোটা দেশেই সবুজ বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করে তা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই পরিবেশের ভারসাম্য যেমন রক্ষা করা যাবে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করে তীব্র দাবদাহের কবল থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা করা যাবে। তা নাহলে আমনের, বোরোর, সবজির চাষাবাদ ব্যাহত হবে। ফলে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে উঠবে।
লেখক পরিবেশ ও কৃষিবিষয়ক লেখক
ahairanju@gmail.com