৫২তম সীমান্ত সভা শেষ

রোহিঙ্গা নিয়ে উদ্বেগ বিজিবি-বিএসএফের

মিয়ানমারের রাখাইনে হত্যা-নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও তাদের মাধ্যমে ইয়াবা চোরাচালান নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া ৫২তম সীমান্ত সম্মেলনে দুই বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আলোচনায় এ বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

এছাড়া মাদক কারবার, ইয়াবা ও ফেনসিডিল তৈরির কারখানা এবং সীমান্ত হত্যাকান্ড নিয়ে আলোচনা হয়েছে সম্মেলনে। এসব সমস্যা শূন্যের কোঠায় আনতে দুই দেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো একযোগে কাজ করার ব্যাপারে একমত হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তাছাড়া ভারতে যেসব সন্ত্রাসী ও জঙ্গি আশ্রয় নিয়েছে তাদের ফেরত দিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়। অর্থ পাচারের ঘটনায় আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদারকে ফেরত আনার বিষয়ে আলোচনা হয়।

পাঁচ দিনের এ সম্মেলন শুরু হয় গত ১৭ জুলাই। এতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে সম্মেলন শেষ হওয়ার পর গতকাল বিজিবির সদর দপ্তরে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

ঢাকার পিলখানায় বিজিবি সদর দপ্তরের সম্মেলন কক্ষে দুই বাহিনীর এ সম্মেলন হয়। সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যৌথ নদী কমিশন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সার্ভেয়ার জেনারেল অব বাংলাদেশ এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক পঙ্কজ কুমার সিংয়ের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল সম্মেলনে অংশ নেয়। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে বিএসএফ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছাড়াও ওই দেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বৈঠকে বলেন, মিয়ানমারের নাগরিকরা বাংলাদেশের জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ তেমনি ভারতের জন্যও একই অবস্থা। ওই দেশ থেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে অনেক রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে ভারতে। তাছাড়া ইয়াবার চালানও যাচ্ছে। মিয়ানমারের ইয়াবা তৈরির কারখানাগুলো এখনো সচল আছে। তাদের অনুরোধ করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।

বৈঠকে বাংলাদেশের এক প্রতিনিধি বলেছেন, ভারতে বেশ কিছু ফেনসিডিল কারখানা এখনো সচল আছে। সেগুলো বন্ধ না করার ফলে ফেনসিডিলের চালান আসছে বাংলাদেশে। তাছাড়া ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের অনেক দাগি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি আশ্রয় নিয়েছে। তাদের আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। তাছাড়া অর্থ পাচারের অন্যতম আসামি পি কে হালদারকে দেশে পাঠাতেও অনুরোধ করা হয়। জবাবে ভারতের প্রতিনিধি বলেছেন, পি কে হালদারের বিষয়টি নির্ভর করছে আদালতের ওপর। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিষয়টি তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা বিজিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ছিল মাদক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং সোনা পাচার, নারী ও শিশু পাচারসহ বিভিন্ন সীমান্ত অপরাধ, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-; সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণ, বিভিন্ন সশস্ত্র উগ্রবাদী-সন্ত্রাসী সংগঠন গোষ্ঠীর কর্মকা- সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়, সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি।

পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ভারতীয় প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের আত্মমর্যাদার প্রতীক পদ্মা সেতু ও কক্সবাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করে। বিএসএফ মহাপরিচালকের স্ত্রী এবং বিএসএফ ওয়াইভস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভানেত্রী নূপুর সিং তাদের সংগঠনের প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশে এসেছেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সীমান্তের হত্যাকা- শূন্য কোঠায় আনতে দুই বাহিনী একমত হয়েছে। ভারতের ফেনসিডিল তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করার বিষয়ে আশ^স্ত করা হয়েছে। তাছাড়া ইয়াবা তৈরির কারখানাগুলো বন্ধ করতে ভারত ও বাংলাদেশ মিলে মিয়ানমারকে আবারও চিঠি দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই বাহিনী। অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে ভারত আরও কঠোর হবে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে।

সাংবাদিকদের দুই মহাপরিচালক : সম্মেলন শেষে বিজিবি ও বিএসএফ মহাপরিচালক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। গতকাল দুপুরে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে দালালদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এ পর্যন্ত ভারত থেকে দালালদের মাধ্যমে ৫১টি রোহিঙ্গা পরিবারের ২১২ জন সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর বাইরে হয়তো দুর্গম পথে আরও কিছু প্রবেশ করতে পারে।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএসএফ মহাপরিচালক পঙ্কজ কুমার সিং দাবি করেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ গুলিতে নিহত বাংলাদেশিরা সবাই অপরাধী। তার দাবি, নিহতদের সবাই মাদক কারবারি, চোরাকারবারি। আর প্রত্যেকটা গুলির ঘটনাই রাতে ঘটেছে। সীমান্তে যারা নিহত হচ্ছে তারা সবাই কি অপরাধী? এ বিষয়ে বিএসএফ ডিজির বক্তব্যের সঙ্গে বিজিবি কি একমত? এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বিজিবির ডিজি বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে দুই দেশ একমত হয়েছে।’

সীমান্তে হত্যার শিকারদের কিসের ভিত্তিতে অপরাধী বলছেন? তাদের শরীরের ওপরের অংশে গুলি লাগার পরও কেন এটা টার্গেটেড কিলিং নয় সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএফপ্রধান পঙ্কজ কুমার সিং বলেন, ‘জুডিশিয়াল সিস্টেমে বা কোনো অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তো আমরা কাউকে অপরাধী বলতে পারি না। আমরা বর্ডার বাহিনীর সঙ্গে কথা বলি, কলকাতা পুলিশ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমাদের গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করি। দুই দেশের সীমান্তেই অপরাধ চোরাকারবারে জড়িত দুই দেশের মাফিয়ারা।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের উভয় দেশের সীমান্তবর্তী দুই এলাকাতেই ভালো-মন্দ, খারাপ-ভালো মানুষ আছে। তাদের কারণে সীমান্তে অপরাধ সংঘটিত হয়, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ঘটছে। গরু পাচার, শিশু ও নারী পাচারের ক্ষেত্রে অপরাধী সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে।’ বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, ‘প্রথমে আমরা নন লেথাল উইপেন ব্যবহার করি। যাতে প্রতিরোধ মারণঘাতী না হয়।’

বিজিবির সঙ্গে সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যৌথভাবে সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ দমন, সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় আনতে কাজ করছি।’ প্রতিবার সীমান্ত সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা বন্ধে আলোচনা হয় কিন্তু সীমান্ত হত্যা বন্ধ হচ্ছে না। গত জুন মাসেও সীমান্তে হত্যার শিকার হয়েছে পাঁচজন এমন প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, ‘এ প্রশ্ন প্রতি বছরই শুনতে হয়। বিজিবি ও বিএসএফ খুবই পেশাদার বাহিনী। তবে আমাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই ভিন্ন। পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়েও আলাদা। আমরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করে থাকি কীভাবে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা যায়। মিনিস্ট্রি, বিজিবি ডিজি থেকে বিজিবির সব পর্যায়ে আমরা কথা বলেছি।’

বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘সীমান্তে একটা হত্যা মানে শুধু একটা মানুষের মৃত্যু নয়, এতে নিহতের পুরো পরিবার ভোগে। এলাকার মানুষের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সীমান্ত বাহিনীর মধ্যে যে পেশাদার সম্পর্ক, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এসব আমরা বিএসএফকে বুঝিয়েছি। তারাও বুঝেছে।’