ঢাকার নর্দা এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম লন্ড্রি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সম্প্রতি বিশ্বপরিস্থিতির কারণে দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে খাবি খাচ্ছেন তিনি। সারা দিন যা আয় হয় তা দিয়ে নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থা। এখন চলছে লোডশেডিং। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কাজ বন্ধ থাকে। এ মৌসুমে পরিবার-পরিজনের জন্য মাত্র দুই কেজি আম কিনতে পেরেছেন। একথা জানাতে গিয়ে তার চোখ ছলছল করছিল। সম্প্রতি দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমেছে। কম দামে তেল পাচ্ছেন না তিনি। এটা তার কাছে প্রহসন মাত্র। চাল-গমেরও দাম কমবে শুনে বিরক্ত তিনি।
‘এদেশে কোনো কিছুর দাম বাড়তে সময় লাগে না। কমার কথা কেবল শুনিই, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারি না। জীবন তো যায় যায় অবস্থা!’ কথাগুলো একনাগাড়ে বললেন তিনি।
জ্বালানি, ভোজ্য তেল, খাদ্যশস্যের দাম বাড়ার কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে দেশের বাজারে এর প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। বাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমানোর ঘোষণা এসেছে। যদিও হ্রাসকৃত মূল্যে তেলের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না এখনো।
গত এক মাসে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। পাম অয়েলের দাম কমেছে ২২ শতাংশ। গমের দাম কমেছে ২০ শতাংশ। কটনের দাম কমেছে ২৭ শতাংশ। চালের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
গত শুক্রবার রাশিয়া-ইউক্রেন কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য পরিবহনে রাজি হয়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী গমের সরবরাহ বাড়া এবং দাম কমার আশা দেখা যাচ্ছে। কারণ রাশিয়া ও ইউক্রেন গম উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে। তবে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের দাম কমার প্রভাব দেশের বাজারে কত দিনে পড়বে তা নিয়ে সন্দিহান মানুষ।
বাজারে দাম বাড়া-কমার বিষয়টি পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। এখানে কোনো তদারকি কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর।
শিগগির কিছু খাদ্যপণ্যের দাম কমার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের হাতে যতক্ষণ আগের চালানের পণ্য থাকবে ততক্ষণ তারা বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে কমাবে না। এটাই চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে পরের চালানে পণ্য আনলে আর আগের দাম নেওয়া সম্ভব হবে না।’
পাঁচ মাস আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের বাজারে সয়াবিন তেল, পাম তেলের দাম বেড়েছে ২ দফা। প্রতিবারই দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার পর বাজার থেকে তেল উধাও। এবার তেলের দাম কমানোর ঘোষণার পর নতুন তেলের দেখা নেই।
রাশিয়া প্রধান গম সরবরাহকারী দেশ। ইউক্রেন ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেল উৎপাদক দেশ। দুটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। এবার দেশ দুটির মধ্যে খাদ্যশস্য সরবরাহ চুক্তি হওয়ায় এ সংকট কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এর পরপরই ইউক্রেনের বন্দর শহর ওডেসাতে হামলা করে রাশিয়া। এতে চুক্তির সুফল নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে তেল-গমের দাম বাড়ায় গত কয়েক মাসে অনেক ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তেলে ভাজা খাবার, বেকারি পণ্য, রেস্টুরেন্টের খাবারের দাম বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে সংসার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের ব্যবসায়ী অন্য ধরনের পণ্যের দামও বাড়িয়েছেন। শ্রমজীবী মানুষ বাড়তি ব্যয় মেটানোর জন্য বাড়তি পারিশ্রমিক দাবি করছে। সবকিছু মিলিয়ে ৩-৪ মাস ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
গত জুন মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে ওঠে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুনে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ হয়েছে। মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিই সাধারণ মানুষকে বেশি ভোগাচ্ছে।
বাজারে পণ্যের অভাব নেই। দুই মাস পর আবার পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। ফলে এ নিত্যপণ্যটির দাম কিছুটা কমছে। ১০ মাসেরও বেশি সময় পর দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের চাল দেশে ঢুকতে শুরু করেছে। এত কিছুর পরও দেশের বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম কমবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দূর হচ্ছে না। বিশ্ববাজারে সংকট দেখা দেওয়ার পর দেশের বাজারে চিকন চালের দাম উঠেছে ৭২-৮৪ টাকায়। মোটা চালের দর ৫২ থেকে ৬০ টাকা কেজি। এবার চাল আমদানি শুরু হওয়ায় তার দাম কমতে কতদিন লাগবে সে প্রশ্ন ঘুরছে সাধারণ মানুষের মাথায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা শুরু হয়েছে। গত ২২ দিনে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১৭ ডলারের বেশি কমেছে। এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৪ দশমিক ৭০ ডলারে। এর দাম আরও কমবে। কিন্তু দেশের বাজারে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।
দেশের অর্থনীতিতে লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে। এর প্রভাব কি খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে! আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমায় দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থনীতির জন্য এটি সুখবর।
গত বছরের আগস্ট থেকেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়া শুরু হয়। ২৩ আগস্ট ২০২১ সালে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৬২ দশমিক ১৪ ডলার। ৭৫ থেকে ৮০ ডলার প্রতি ব্যারেল তেলের আমদানি ব্যয় (জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয়) হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লাভও হয় না, লোকসানও হয় না। কিন্তু ৮০ ডলারের ওপর উঠলেই বিপিসির লোকসান শুরু হয়।
গত ৮ মার্চে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১২৩ দশমিক ৭০-এ গিয়ে ঠেকে; এরপর কমতে থাকে। গতকাল শনিবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম গিয়ে দাঁড়ায় ৯৪ দশমিক ৭০ ডলারে।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম ঠিক করা হয় সিঙ্গাপুরে প্লেটস নামে ম্যাগাজিনে উত্থাপিত দামের সঙ্গে মিল রেখে। যেদিন জাহাজে জ্বালানি তেল ভরা হবে তার আগের দিনে প্লেটসে প্রকাশিত দাম, তেল জাহাজীকরণের দিন প্রকাশিত দাম ও তার পরের দিনের দাম এ তিনদিনের দামের গড় হলো জ্বালানি তেলের দাম। এর বাইরে জাহাজের ভাড়া, ইন্স্যুরেন্স প্রভৃতি রয়েছে।
চলতি মাসে বিপিসি ১৬টি এলসি খুলেছে জ্বালানি তেল আমদানি করতে। এ মাসে প্রায় চার লাখ টন জ্বালানি তেল আসবে। সামনের মাসে আসবে তিন লাখ ৭৫ হাজার টন। যখন জ্বালানি তেলের দাম কমে যাবে তখন এ তেল জাহাজীকরণ করা হবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার সুফল পাবে বাংলাদেশ।
আমদানি ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি ব্যয় রেকর্ড পরিমাণ বাড়লেও এর কারণ ছিল পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। এর বড় কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পণ্যের দর বাড়ার পাশাপাশি ডলারের দরও বেড়েছে। ফলে একই পরিমাণের পণ্য আমদানি করতে বেশি ব্যয় হচ্ছে। গত দুই মাসে দেশে ডলারের দর বেড়েছে ৭ টাকার বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। আমদানির আর্থিক পরিমাণ ৭ হাজার ৫৪০ কোটি ডলার। রপ্তানি আয় না বাড়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮১ কোটি ডলার।