বরিস জনসন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়ন পাওয়া তারই সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অতীতের মধ্যপন্থি লিজ রক্ষণশীল দলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। পছন্দের শীর্ষে থাকা ঋষি চূড়ান্ত ভোটে লিজের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে পারেন। লিখেছেন নাসরিন শওকত
নির্বাচন প্রক্রিয়া
৭ জুলাই জনসন কনজারভেটিভ পার্টির দলীয় প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, কনজারভেটিভরা নতুন নেতা নির্বাচন না করা পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে যাবেন। তার দুই সাম্প্রতিক পূর্বসূরি ডেভিড ক্যামেরন ও থেরেসা মে উভয় নেতাই পদত্যাগ করার সময় একই পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নতুন নেতা নির্বাচনের প্রতিযোগিতার সময়সূচি জনসনের হাতে নেই। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৯২২ কমিটি নামের পেছনের সারির একদল কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতার একটি বোর্ড এই সময়সূচি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই বোর্ডই মনোনয়ন প্রতিযোগিতার দুই ধাপের প্রক্রিয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করেছে।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে ১৯২২ কমিটিতে থাকা কনজারভেটিভ আইনপ্রণেতারা ভোট দিয়ে ১১ প্রার্থীর মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে দুই প্রার্থীকে মনোনীত করেন। দ্বিতীয় ধাপে দলের কর্মী ও সদস্যরা চূড়ান্ত ভোটে মনোনীত এই দুই প্রার্থীর মধ্য থেকে একজনকে দলের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করবেন। এই সদস্যদের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার।
২০ জুলাইয়ের ভোটে ঋষি পান ১৩৭ ভোট ও লিজ ট্রাস পান ১১৩ ভোট। পার্লামেন্টের অনুমোদন পাওয়ায় পর দুই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী টুইটারে ভোটের ফলাফল জানিয়ে টুইট করেন। সেখানে ঋষি বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞ যে আজ আমার সহকর্মীরা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। বিশ্বাসের এই বার্তা দেশজুড়ে পৌঁছে দিতে আমি দিন-রাত একযোগে কাজ করে যাব।’ অন্যদিকে লিজ বলেন, ‘আমার ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমি প্রথম দিন থেকেই মাঠে নামতে প্রস্তুত রয়েছি।’
এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে ঋষি সুনাক ও লিজ ট্রাস তাদের গ্রীষ্মকালের পুরোটা সময় কনজারভেটিভ দলের প্রান্তিক সদস্যদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে প্রচারণা চালাবেন। সে সময় দলীয় সদস্যরা এই দুই প্রার্থীকে নিজেদের পছন্দ মতো প্রশ্ন করার সুযোগ পাবেন। এই প্রক্রিয়া অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে ডাকযোগে ও অনলাইনের মাধ্যমে ভোট শুরু। ৫ সেপ্টেম্বর বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে। এর পরই রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাতে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বরিস জনসন। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী রানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তাকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন রানী। অক্টোবরে নতুন প্রধানমন্ত্রী কনজারভেটিভ পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন।
পদত্যাগে বাধ্য হন জনসন
আলেকজান্ডার বরিস ডি ফেফেল জনসন একজন রক্ষণশীল ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৬৪ সালে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে জন্ম নেন। ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ও কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বরিস।
বরিস জনসন ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান নির্বাচিত হন। এর পরদিন ২৪ জুলাই তিনি যুক্তরাজ্যের প্র্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বরিস মধ্যবর্তী নির্বাচনের (স্ন্যাপ ইলেকশন) আহ্বান জানালে ২০১৯-এর ১২ ডিসেম্বর এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সে সময় জনসন তার কনজারভেটিভ পার্টিকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিজয় এনে দেন। তবে করোনা মহামারীর আইন ভঙ্গ ও ধারাবাহিক কেলেঙ্কারির জেরে চলতি মাসের প্রথম দিকে কনজারভেটিভ পার্টির নেতার পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয় তাকে। তার দলের আরও কয়েক ডজন মন্ত্রীও পদত্যাগ করেন।
২০২১ সালের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনসনের অবস্থান দুর্বল হতে শুরু করে। করোনা মহামারীতে লকডাউন চলাকালে মহামারীর নিয়ম ভঙ্গ করে একাধিক দলীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিতর্কের মুখে পড়েন জনসন। এই বিতর্কই পরবর্তী সময়ে পার্টিগেট কেলেঙ্কারি হিসেবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এই জেরে জনসন অর্থ জরিমানার মুখে পড়েন। চলতি বছরের জুনে দলীয় প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে এবং প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করে তারই দল। কিন্তু সে সময় তিনি আইনপ্রণেতাদের সমর্থনে কোনো মতে বেঁচে যান।
কিন্তু বিতর্ক যেন কিছুতেই তার পিছু ছাড়ছিল না। জনসনের উপপ্রধান হুইপ ক্রিস পিনচারের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পরের মাসেই (চলতি জুলাইয়ে) তার সরকারের নতুন এক কেলেঙ্কারি প্রকাশ পায়। হুইপ ক্রিস পিচারের বিরুদ্ধে নারী এমপিদের হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে। জনসন তার অসদাচরণের বিষয়ে জানার পরও তাকে পদে বহাল রাখায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। এর জেরেই পরে পদত্যাগে বাধ্য হন।
৫ জুলাই সন্ধ্যায় ঋষি সুনাক জনসন সরকারের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী (স্বাস্থ্যমন্ত্রী) সাজিদ জাভিদের সঙ্গে পদত্যাগ করেন। এরপর দুদিন জনসন সরকারে পদত্যাগের বন্যা বয়ে যায়। ৭ জুলাই তার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কমপক্ষে ৫০ এমপি ও অন্য কর্মকর্তারা একে একে পদত্যাগ করেন। বরিস জনসন তার সরকারের নজিরবিহীন এই সংকটের মুখে ওই দিনই (৭ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
ঋষি সুনাক
কনজারভেটিভ পার্টির নেতা অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের উত্তরসূরি নির্বাচনের লড়াইয়ে প্রধান দুই প্রার্থীর একজন ঋষি সুনাক। এ প্রক্রিয়ায় আইন প্রণেতাদের পাঁচ দফার ভোটে বরাবর প্রথম সারিতে ছিলেন ঋষি। তিনি জনসন সরকারের অর্থমন্ত্রীর (চ্যান্সেলর অব এক্সিকিউওর হিসেবে ২০২০ থেকে ৫ জুলাই, ২০২২ পর্যন্ত) দায়িত্ব পালন করেন। যদি তিনি যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, তবে শে^তাঙ্গ আধিপত্যের ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাসে ঋষিই হবেন অশে^তাঙ্গ প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
৪২ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত রক্ষণশীল রাজনীতিক ঋষি সুনাক। ১৯৮০ সালে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বন্দর নগরী সাউথহ্যাম্পটনে এক পাঞ্জাবি হিন্দু পরিবারে জন্ম নেন তিনি। ঋষি সুনাক ২০২০ সালের করোনা মহামারীর চ্যালেঞ্জের সময়ে (২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত) অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় তিনি মহামারীকে সামলে নিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যা তার রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে যোগ হয়েছে। ঋষির সে সময়ে নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম ছিল ফার্লো স্কিম ও রেস্তোরাঁয় বিশেষ ছাড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা। লকডাউনের সময় ফার্লো স্কিমের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ কর্মীর চাকরি বাঁচান।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় রয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। অনেক প্রবীণ কনজারভেটিভ নেতাই আশঙ্কা করছেন, প্রার্থী হিসেবে ঋষির জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের এই জটিল প্রক্রিয়া পার করা কঠিন হবে। এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনেক চাপের মুখে দিশেহারা হয়ে পড়বেন বলেও মত তাদের। এই আশঙ্কা ও উদ্বেগ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে কনজারভেটিভ এমপিদের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে ঋষিই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তবে দলের এমন বিশৃঙ্খল সময়ে কনজারভেটিভ রাজনীতিবিদের জন্য ঋষিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই প্রার্থী হিসেবে বারবার লিজের তুলনায় ঋষি দলীয় সদস্যদের কাছে দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে থাকছেন।
তারপরও যদি ঋষিই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন, সেক্ষেত্রে তাকে সব রাজনৈতিক শত্রুদের সমালোচনা সহ্য করতে হবে। তার প্রধান প্রতিপক্ষ ও বিরোধী দল লেবার পার্টির রাজনীতিকরা তাকে সবার আগে জনসনের পার্টিগেট কেলেঙ্কারির কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। একই সঙ্গে তারা এমন প্রশ্নও তুলবেন, এই কেলেঙ্কারিতে সত্য লুকিয়ে তিনি এত দীর্ঘ সময় কেন জনসনের প্রতিই অনুগত থেকেছেন। জনসনের সততার প্রশ্ন নিয়ে যখন ব্রিটিশ রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় চলছে, ঠিক সে সময়েই ঋষি অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর পর থেকেই বরিসের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পদ ধরে রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। তাই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হিসেবে ঋষি যখনই সারির প্রথমে দাঁড়াবেন তখনই সব পক্ষের সমালোচকরাই তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরবে।
বরিস জনসনের মতো ঋষির বিরুদ্ধেও করোনার নিয়ম লঙ্ঘন করে পার্টি করার অভিযোগ উঠেছিল। তবে চূড়ান্ত লড়াইয়ে কর বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য তাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। এছাড়াও পার্টিগেট কেলেঙ্কারি তার ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমানে ঋষি তার স্ত্রী অক্ষতা মূর্তির কর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বেশ চাপের মুখে পড়েছেন। ধনকুবের অক্ষতা বর্তমানে ভারতে বসবাস করছেন।
লিজ ট্রাস
যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে সাবেক অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাকের প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাস। ৪৬ বছর বয়সী লিজ বর্তমানে জনসন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জনসন সরকারের নজিরবিহীন পদত্যাগে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের পরও দায়িত্বে বহাল থেকেছেন। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জনসন দায়িত্ব গ্রহণের পর লিজ তার বাণিজ্যমন্ত্রীর (সেক্রেটারি অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড) দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০২১ সালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। সেপ্টেম্বরের আগ পর্যন্ত তাকে এই পদে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
১৯৭৫ সাল অক্সফোর্ডে জন্ম নেন লিজ ট্রাস। আইনপ্রণেতাদের ভোটের চূড়ান্ত দফায় বেশ কিছু পরাজিত প্রার্থীর সমর্থনে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছিলেন তিনি। মধ্যপন্থি রাজনীতিক পেনি মরডাউন্ট ১০৫ ভোটে তার কাছে হেরে যান। লিজ ছাত্র থাকা অবস্থায় আন্দোলন কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের সময় তিনি মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক ছিলেন।
ইউরোপের ২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ২০১৬ সালে ইইউ ছাড়ার লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় ইউরোপ ছাড়ার পক্ষেই রায় দেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্রিটিশ। কিন্তু লিজ ইইউয়ের সঙ্গে থেকে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাণিজ্য বিষয় নিয়ে ইইউয়ের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আলোচনা চালিয়ে ব্রেক্সিট পরবর্তী একজন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি দ্রুত কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার এই প্রতিশ্রুতিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ঋষি ‘ফ্যান্টাসি ইকোনমিক্স’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋষির মতো অতটা সহজভাবে প্রচারণা শুরু করতে পারেননি লিজ। অন্য পরাজিত প্রার্থীদের ভোট তাকে চূড়ান্ত ধাপে ওপরে নিয়ে এসেছে মাত্র।
তবে প্রথম থেকেই লিজ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ ও কেলেঙ্কারিতে জনসনের পক্ষ অবলম্বন করেন। হুইপ পিনচারের কেলেঙ্কারির পরও লিজ তার পদত্যাগ না করার যুক্তি হিসেবে রাশিয়ার ইউক্রেনে আগ্রাসনে যুক্তরাজ্যকে নেতৃত্ব দেওয়ার অজুহাতকে তুলে ধরেছেন। বরিসের উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি সদস্যের সমর্থন লিজের পক্ষেই রয়েছে। এবারের নির্বাচনে লিজের প্রধান তহবিলদাতাদের মধ্যে জনসনের সবচেয়ে কাছের সহযোগীদের বেশ কয়েকজন রয়েছেন যা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের কৌশলের ক্ষেত্রে তাকে বিপদে ফেলে দিতে পারে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এ কারণেই বরিসের নীতিগত অবস্থান থেকেও তাকে দূরে সরানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বানিজ্যমন্ত্রী থাকাকালে লিজ প্রতিটি বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের সময় জনসনের মতকে সমর্থন করে গেছেন। তিনি ব্রেক্সিট চুক্তির উত্তর আয়ারল্যান্ড প্রটোকলের বিতর্কিত অংশ পুনরায় লেখার সময়ও জনসনের অন্ধ সমর্থক ছিলেন। লিজ তার দুই মন্ত্রিত্বকালের প্রায় পুরোটা সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্রে শক্ত অবস্থানে ছিলেন এবং তার দলের (কনজারভেটিভ পার্টির) এমপি ও প্রান্তিক কর্মীদের কাছেও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
চ্যালেঞ্জ
এখন যুক্তরাজ্যে স্মরণকালের অন্যতম রাজনৈতিক সংকটকাল চলছে। দীর্ঘদিন ধরেই ঋষিকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রথম সারির একজন প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হ্িচ্ছল। তবে জনমত জরিপে ঋষি সুনাক দলীয় সমর্থনের ক্ষেত্রে তার প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাস থেকে পিছিয়ে আছেন। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, শীর্ষ ব্রিটিশ জরিপ সংস্থা ইউগভ একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। জরিপে প্রাথমিক ধাপে ১১ প্রার্থীর সবার ওপর ছিলেন ঋষি সুনাক। সে সময় ঋষি ও লিজের মধ্যে ২০ পয়েন্টের ব্যবধান ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত লড়াইয়ে লিজের পেছনে পড়ে যান ঋষি। ইউগভের দুদিনের (২০ থেকে ২১ জুলাই) ওই জরিপে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির ৭৩০ জন আইনপ্রণেতার মতামত নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৬২ শতাংশ আইনপ্রণেতা লিজ ট্রাসের প্রতি তাদের সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে ঋষি সুনাককে সমর্থন করেছেন ৩৮ শতাংশ আইনপ্রণেতা। অর্থাৎ জরিপে ঋষির তুলনায় ২৪ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন লিজ। ব্রিটিশ অর্থনীতি রক্ষায় কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লিজ ট্রাস । অন্যদিকে কর বাড়ানো ঋষি প্রতিরক্ষা ব্যয় ও জ্বালানির দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন।
৫ সেপ্টেম্বরে ঋষি বা লিজের মধ্যে যে প্রার্থীই বিজয়ী হন না কেন তার সরকারের মেয়াদকাল হবে দ্ইু বছর। নতুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর জন্য অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বেড়ে চলা জীবনযাপনের ব্যয়ে লাগাম টানা। তবে এর সঙ্গে নতুন শাসক দলের জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধার একটি বিষয় বাড়তি হিসেবে থাকবে। সেটি হলো পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ বেছে নেওয়ার ক্ষমতা।
লিজ ট্রাস ও ঋষি সুনাক এই দুই প্রার্থীর মধ্যে কে হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, তার দিকে তাকিয়ে আছে বিশ্ব।