অর্থনীতিতে অবিচারের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে

বৈশ্বিক বিভিন্ন কারণে দেশের অর্থনীতি সংকটে রয়েছে। তবে এ মুহূর্তের সংকট শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা নয়। অর্থনীতিতে একটা অবিচারের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনীতিতে এখন লৌহ ত্রিভুজ গেড়ে বসেছে। মুষ্টিমেয় লোক সুবিধা পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতি বেশ কিছু ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। দেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা গতকাল রবিবার এক সেমিনারে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন।

‘সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ : কতটা ঝুঁকিপূর্ণ’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ,  বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম তামিম, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান আলোচনায় অংশ নেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘পিপিআরসির গবেষণায় দেখেছি, অর্থনীতিতে সংস্কারের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কভিডের ধাক্কায় কিছুটা রিকভারি হয়েছে কিন্তু কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। পিপিআরসির গবেষণায় দেখেছি, মে মাসে মানুষের গড় আয় কভিডের আগে ১৫ শতাংশ নিচে ছিল। শহরাঞ্চলে আরও ২৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতির ব্যষ্টিক পর্যায়ে অবিচারের একটা বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।’

অর্থনৈতিক অবিচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক অবিচারের তিনটি চেহারা স্পষ্ট। একটা হচ্ছে নতুন দারিদ্র্য। অর্থনৈতিক অবিচারের ফলে নতুন দারিদ্র্য বেড়েছে। পিপিআরসির হিসাব অনুযায়ী, মে মাসে ৩ কোটি মানুষ নতুন দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, আমাদের অন্যতম লক্ষ্য হলো টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন। এ ছাড়া পুষ্টির উন্নতির দিকে যাওয়ার বদলে আমরা উল্টো দিকে যাচ্ছি। দ্বিতীয় হচ্ছে, মাধ্যমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার সংখ্যা বেড়েছে। এটা চাকরির বাজার থেকে শুরু করে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। আবাসন খাতে দুই বছরের কভিডের প্রভাবে ১০ শতাংশ মানুষ শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

অবিচারের তৃতীয় চেহারা হচ্ছে, এসডিজির যে লক্ষ্যে এগোচ্ছি, সেখানে জব সংকট তৈরি হচ্ছে। বেকারত্ব সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে; বিশেষ করে মধ্যম অর্থনীতিতে, এদের যে কাঠামোগত অসুবিধা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া-সার্বিকভাবে সরকার যে ধরনের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে এগোচ্ছে তাতে যুব বেকারত্ব বাড়ছে। এ রকম অবস্থায় প্রশাসনের যদি সার্বিক উন্নতি না হয়, তাহলে অবিচারের নতুন দিক সৃষ্টি হবে।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সুদের হারের সীমারেখা বেঁধে দেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হচ্ছে। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। বিপরীতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ২৭ শতাংশ বেশি। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ মূলত এ দেশে ব্যাংক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। পুঁজিবাজার এখানে যথার্থ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। প্রশ্ন হচ্ছে, সুদের বেঁধে দেওয়া সীমারেখা কতটুকু যৌক্তিক।’

দেশের চলমান সংকটের কথা তুলে ধরে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, আমদানি প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ার কারণে রিজার্ভ অনেক কমে গেছে। দেশে অর্থ পাচার রোধ হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমদানির ক্ষেত্রে কতটুকু জেনুইন, কতটুকু ওভার ইনভয়েসিং আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ ব্যাপারে সরকার বা এনবিআরের পক্ষ থেকে বড় রকমের কোনো উদ্যোগ নিতে দেখিনি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অমর্ত্য সেন বলেছেন, গরিব লোক দেখলেই চেনা যায়। আমাদের দেশেও একই অবস্থা। বাংলাদেশের সমস্যা হলো বাজার। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক ও রেগুলেটরি সংস্থার কর্মদক্ষতা নিয়ে আমাদের যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বলে কিছুই নেই, কোনো ম্যানেজমেন্ট নেই, জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। ওপরের দিকটা ঠিক করলেন, কিন্তু ভেতরে নড়বড়ে। সেটা দিয়ে লাভ কী হবে?’

সালেহউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘বাংলাদেশেও শ্রীলঙ্কার সিম্পটম আছে। ব্যাংক খাতের কথা বলি। কোনো সমস্যা হলেই ব্যাংক খাতের মুখপাত্র বলেন, দেখছি, দেখব। তারা বলছে, নজর রাখছি, কোথায়  নজর রাখছে জনগণের জানতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘খুব সহজে আমরা সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব, এটা বলার কোনো সুযোগ নেই।’

বিদ্যুতের প্রাথমিক জ্বালানি জোগান না বাড়িয়ে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম তামিম। তিনি বলেন, ‘দ্রুতগতিতে বিদ্যুৎ আনার জন্য একসময় তেলভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন ছিল। তবে সেটাকে তিন বা পাঁচ বছর পর্যন্ত রাখার পরামর্শ ছিল। কিন্তু সেটা না করে এখন পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে তেলের ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। আর তেলের ওপর এই নির্ভরতার কারণেই বর্তমান সমস্যা তৈরি হয়েছে।’ অধ্যাপক তামিম বলেন, দেশে যখন কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র শুরু হয়, তখন কয়লা ও তেল আমদানি সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। একই সময়ে উচিত ছিল নিজেদের গ্যাসের জন্য অনুসন্ধান চালানো। সেটি হয়নি।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘সংকট স্বল্পমেয়াদি প্রকৃতির নয়। সহজে সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না। বাংলাদেশ মাঝারি মেয়াদির সংকটে রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থা অপ্রতুল। তাই স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি উভয় ধরনের ব্যবস্থা হওয়া উচিত।’ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘জ্বালানি আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং দ্বিপক্ষীয় উৎস, যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার থেকে ঋণ নিতে পারে।’