বিশালাকৃতির যান্ত্রিক ষাঁড়, ব্রিটিশদের ঐতিহ্যের গাড়ির মহড়া আর সৌহার্দ্যরে নানা প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে পর্দা উঠেছে ২২তম কমনওয়েলথ গেমসের। বিশ্বখ্যাত কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়রের শহরে উপহার মনোমুগ্ধকর এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। আলেকজান্ডার স্টেডিয়ামে রাত ৮টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানের প্রতিটি অধ্যায়েই ছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেল। চোখধাঁধানো মোটর র্যালির মধ্য দিয়ে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেছিলেন প্রিন্স চার্লস। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের পক্ষে ১১ দিনের গেমসের উদ্বোধন ঘোষণা করেন তিনি। এই ১১ দিনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কমনওয়েলথভুক্ত ৭২টি দেশের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতিও মিলেছে আয়োজকদের পক্ষ থেকে।
বার্মিংহামের বিখ্যাত সিটি অব সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার সুরে সুরে জাতীয় সংগীত বাজানোর মধ্য দিয়ে শুরু অনুষ্ঠানের। একে একে বার্মিংহামের ইতিহাস উঠে আসে নানা প্রদর্শনীতে। ১৮৭৯ সালে বার্মিংহাম লাইব্রেরিতে আগুন দেওয়া, তাতে শেক্সপিয়রের অনেক বই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দৃশ্য ফুটে ওঠে বিশাল সব ডিজিটাল ডিসপ্লেতে।
খেলাধুলা সীমানার ধার ধারে না। এটাকেই মূল প্রতিপাদ্য মেনে এই গেমসের অন্যতম সেøাগান করা হয়েছে ‘গেমস ফর এভরিওয়ান’। প্রায় চার ঘণ্টার উদ্বোধনী সাজানো হয়েছিল এই সম্পৃক্ততার বিষয়টি মাথায় রেখে। তাই তো এখানে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছেন পাকিস্তানি শিক্ষা আন্দোলনকর্মী ও সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই। উজ্জীবনী বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আগামী ১১ দিন বিশ্বের বড় বড় ক্রীড়া তারকাদের দেখে শিশুরা নিজেদের দিগন্ত ছাড়িয়ে বিকশিত হওয়ার, স্বপ্নকে রাঙানোর সাহস পাবে।’
ইংলিশ তো ছিলই, আফ্রিকান, ক্যারিবিয়ান, এশিয়ান সুরের মূর্ছনায় সারাক্ষণ বুঁদ থাকতে হয়েছে উপস্থিত ৩০ হাজার দর্শককে। ইংল্যান্ডের হয়ে অলিম্পিকে সোনাজয়ী ডাইভার টম ড্যালে সমকামিতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রদর্শনীর নেতৃত্ব দেন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রদর্শনী। প্রায় দুই হাজার নারী-পুরুষ অংশ নেন নানা ডিসপ্লেতে। উদ্বোধনীর প্রথমভাগে সবার মাঝে শপথবাক্যের মতোই উপস্থিত সবাইকে বলানো হয়Ñ অন্ধকারে আমরাই স্বপ্ন দেখার আলো বহন করব, যা আমাদের সবাইকে একত্রিত করবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান পরিচালক ছিলেন জনপ্রিয় ইংলিশ নাটক পিকে ব্লাইন্ডারের লেখক স্টিভেন নাইট। গেমসের মাসকটের সঙ্গে তার কথোপকথনটা দিয়েছিল অন্য মাত্রা। তবে সবার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল স্থানীয় জনপ্রিয় ব্যান্ড ডুরান-ডুরান। এ ছাড়া হেভি মেটাল ব্যান্ড ব্ল্যাক সাব্বাথও পারফর্ম করেন।
কমনওয়েলথভুক্ত ৫৬টি দেশে সমকামিতা নিয়ে কড়াকড়ি থাকলেও টম ড্যালে আহ্বান জানান সমকামিতাকে সমর্থন জানানোর। ১০ মিটার লম্বা যান্ত্রিক ষাঁড়ের আগমনে মানুষের হিংস্রতার বহির্প্রকাশ ঘটানো হয়েছে। ৫০ জন নারী প্রথমে টেনে নিয়ে আসেন বিশালাকৃতির রাগী ষাঁড়কে। তবে যখনই অলিম্পিক পদকজয়ী স্টেলা তার সামনে নিয়ে আসে সম্প্রীতির বার্তা তখনই দেখা যায় তাতে নুয়ে পড়ে ষাঁড়। এরপর দেখা যায় আলোকবর্তিকা হাতে স্টেলার ষাঁড়ের ঘাড়ে চড়ে বসা। এ থেকে বোঝানো হয়েছে সামাজিক বিবর্তনে যান্ত্রিকতার জয়জয়কার। তাতে হারিয়ে যেতে বসেছে পারস্পরিক সৌহার্দ্য।
শেক্সপিয়রের বিশাল পুতুলে মাঠ জুড়ে নেচে বেড়ানো, হাজার বাতির আলো-আঁধারি খেলা। ক্ষণে ক্ষণে আতশবাজির প্রচন্ড শব্দে নানা রঙে আলোকিত করা। বিমানবাহিনীর চৌকস তিন বিমানের ডিসপ্লে আর সুরের মূর্ছনায় মেতে থাকতে হয়েছে পুরোটা সময়। এবার প্যারেডেও আনা হয়েছে বিশেষত্ব। ইংরেজি শব্দ মেনে নয়, এবার মহাদেশ ভাগ করে একে একে মাঠে আসেন ক্রীড়াবিদরা। এশিয়ার হয়ে প্রথম দল হিসেবে মাঠে আসে বাংলাদেশ। ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার নেতৃত্ব দেন পতাকা হাতে। একটা সময় অবশ্য বক্সার সুর কৃষ্ণ চাকমাকেও দেখা যায় পতাকা বহন করতে। প্যারেডের সময় নেচে-গেয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ এনে দেয় ভলান্টিয়াররা। উই উইল রক ইউ গানের মূর্ছনায় কখনো সাহেবি ঢংয়ে, আবার কখনো ভারতীয় জনপ্রিয় ভাঙরা নাচে মেতে উঠতে দেখা গেছে তাদের। বার্মিংহামে বহু ভারতীয়র বসবাস। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সীমানার ব্যবধান পেছনে রেখে তাই অন্য দেশের সংস্কৃতিকে গ্রহণে পিছপা হয়নি বার্মিংহামের আদিবাসীরা।
প্যারেড শেষে এক হাজার গায়ক দলের সঙ্গে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে কুইন্স ব্যাটন। মশাল প্রজ¦ালনের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার শুরু হয় প্রায় পাঁচ হাজার ক্রীড়াবিদের অংশগ্রহণে এই মর্যাদার আসর।