খাঁ খাঁ রোদের দুপুর। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে একটি মাইক্রোবাসে ফিরছিল ১৭ জন তরুণের একটি দল। সদ্য প্রিয় এলাকায় ভ্রমণ শেষে হুল্লোড়ে কাটছিল তাদের সময়। তবে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া রেলক্রসিংয়ে সেই হুল্লোড় মিলিয়ে যায় আর্তনাদ আহাজারিতে। অরক্ষিত ওই রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন ১১ জন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ছয়জন। হতাহতরা সবাই হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। একটি কোচিং সেন্টার থেকে তারা ভ্রমণে গিয়েছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, গতকাল শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। রেলক্রসিংয়ে পর্যটকবাহী মাইক্রোবাসে ধাক্কা দেওয়ার পর ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে পড়ে সেটি। এভাবে দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ঠেলে নিয়ে যায়। এ সময় পুরো রেললাইন এলাকায় চলে তাণ্ডবলীলা। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে মাইক্রোবাসের যন্ত্রাংশ, যাত্রীদের জামা, জুতা, ব্যাগ। উপড়ে পড়েছে রেললাইনের পাশের খুঁটি। দুমড়ে-মুচড়ে গেছে মাইক্রোবাসটি।
এদিকে ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ। এছাড়া দুর্ঘটনাস্থলের রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা গেটম্যান মো. সাদ্দাম হোসেনকে আটক করেছে রেলওয়ে পুলিশ। গতকাল বিকেল ৬টার দিকে রেলক্রসিং এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
রেলওয়ে পুলিশের এসপি প্রকৌশলী মো. হাছান চৌধুরী জানান, হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজার এলাকার আর অ্যান্ড জে কোচিং সেন্টার থেকে একটি মাইক্রোবাসযোগে ১৭ জন মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যান। সেখান থেকে দুপুর পৌনে ১টার দিকে বড়তাকিয়া রেলক্রসিং পার হচ্ছিল। মাইক্রোবাসটি ক্রসিং পার হওয়ার আগেই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামমুখী মহানগর প্রভাতী ট্রেন সেখানে চলে আসে এবং উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে মাইক্রোবাসে থাকা যাত্রীদের মধ্যে ১১ জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন লোকজন মসজিদে জুমার নামাজে ছিলেন। বড়তাকিয়া রেলক্রসিংয়ের গেটকিপারও দুর্ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এ সময় পর্যটকবাহী মাইক্রোবাসটি ক্রসিং পার হওয়ার জন্য রাস্তার ওপর উঠে যায়। কিন্তু রাস্তা পার হওয়ার আগেই দ্রুতগতির ট্রেনের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এ সময় মাইক্রোবাসটি ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে যায়। এ অবস্থায় মাইক্রোবাসসহ প্রায় এক কিলোমিটার গিয়ে ট্রেনটি থামে।
খবর পেয়ে মিরসরাই ও সীতাকু- থেকে ফায়ার সার্ভিসের দুটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। উদ্ধার টিমের সদস্য সীতাকুন্ড ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র অফিসার নুরুল আলম দুলাল উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে ১১ জন মারা গেছেন। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, দুর্ঘটনায় আহত ছয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তারা হলেন মাইক্রোবাসের হেলপার তৌকিদ ইবনে শাওন (২০), তসমির পাভেল (১৬), মো. মাহিম (১৮), মো. সৈকত (১৮), তানভির হাসান হৃদয় (১৮) ও মো. ইমন (১৯)। তাদের সবার বাড়ি হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকায়।
আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েন মহানগর প্রভাতী ট্রেনের যাত্রীরাও। ট্রেন না থামা পর্যন্ত তারাও বুঝতে পারেননি এত বড় দুর্ঘটনার বিষয়টি। ট্রেনটির যাত্রী আবদুল হান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রেনের সামনে থেকে তৃতীয় বগিতে ছিলাম আমি। কিন্তু প্রথমে বুঝতে পারিনি দুর্ঘটনার কথা। ট্রেন থেমে যাওয়ার পর অনেককে দেখি নেমে সামনের দিকে দৌড়াচ্ছে। তারপর আমিও নেমে গেলাম। সামনে গিয়ে দেখি ট্রেনের সামনে ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে আছে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া মাইক্রোবাস। বাসের ভেতরে রক্তাক্ত হতাহতরা। তাৎক্ষণিকভাবে উপস্থিত লোকজন সেখান থেকে কয়েকজনকে বের করলেও গাড়িটি আটকানো ছিল। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে হতাহতদের সেখান থেকে উদ্ধার করেন।’
মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া এলাকায় যে রেলক্রসিংয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে সেখানে নিয়োজিত ছিলেন রেলওয়ের গেটম্যান। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দুর্ঘটনার সময় গেটম্যান ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি গেটবার ফেলে রেখে কোথাও চলে গিয়েছিলেন। এ সময় মাইক্রোবাসটি এসে গেটে কাউকে না দেখে যাত্রীরা নিজেরাই গেটবারটি উঠিয়ে দেন এবং ক্রসিং পার হওয়ার জন্য গাড়িটি রাস্তায় উঠে যায়।
বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘খৈয়াছড়া এলাকায় রেলওয়ের ওপর দিয়ে একটি সড়ক পথ গেছে। সেখানে রেলওয়ের নিযুক্ত গেটম্যানও আছে। দুর্ঘটনার পরপর গেটম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। গেটম্যান জানিয়েছেন, ট্রেন আসার আগেই গেট ফেলা ছিল। কিন্তু মাইক্রোবাসের চালক গেটবারটি জোর করে তুলে রেললাইনে প্রবেশ করেন। এরপর মহানগর প্রভাতী ট্রেন মাইক্রোবাসটিকে ধাক্কা দেয়। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ ব্যাপারে পরিষ্কার হওয়া যাবে।’
এদিকে দুর্ঘটনার কারণে বড়তাকিয়ায় আটকা পড়ে মহানগর প্রভাতীর প্রায় এক হাজার যাত্রী। ট্রেনের সঙ্গে আটকে থাকা মাইক্রোবাসটি আলাদা করার জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল। পরে চট্টগ্রাম থেকে একটি উদ্ধারকারী ট্রেন বিকেল ৪টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে এবং দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটি ট্রেন থকে আলাদা করে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মহানগর প্রভাতী মিরসরাই থেকে ফের চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়।
রেলওয়ের তদন্ত কমিটি গঠন : মিরসরাইয়ে ট্রেন-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মো. আনছার আলীকে প্রধান করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেনÑ বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হামিদ, বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার জাহিদ হাসান, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট রেজানুর রহমান ও বিভাগীয় মেডিকেল অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন। কমিটিকে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্তসহ দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।