বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ভ্রান্তনীতি

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে বিদ্যুৎ ও তেলের খরচ কমানোর একগুচ্ছ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ডিজেলের দাম ‘আকাশচুম্বী’ হয়ে যাওয়ায় আপাতত দেশের ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সেই ঘাটতি সমন্বয় করতে গ্রাহক পর্যায়ে দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। জ্বালানি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনির্ভরযোগ্য পণ্য। এর দর একই রকম থাকবে, তা কখনোই দেখা যায়নি। কিন্তু সরকার থেকে গেছে ঝুঁকিপূর্ণ আমদানির ভরসাতেই। ফলে যখন বিশ্বব্যাপী গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে, তখন আর কম দামে এলএনজি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা নিতে হচ্ছে সারা দেশের মানুষকে, ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন। মূলত গত এক যুগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার যতটা মনোযোগ দিয়েছে, এর কাঁচামাল সরবরাহের দিকে তেমন নজরই দেয়নি।

গ্যাসের অভাবের কারণে সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ক্ষমতার পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়নি। সে তুলনায়, বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে সরকার গ্যাস সরবরাহ করছে প্রায় ৩০% বেশি। যা ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফা দেওয়ার একটি নকশা বলেও মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। সরকার গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে সংস্কারের পথে আর যায়নি। গ্যাস অনুসন্ধানেরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো কিছু ব্যবসায়ীর পরামর্শে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে। এভাবেই জ্বালানি খাতকে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর করা হয়, যা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে অনেক সমালোচনা ও লেখালেখি হলেও সরকার কর্ণপাত করেনি। বরং সরকার সব পরিকল্পনা সাজায় আমাদানি করা এলএনজি নিয়ে। এ জন্য টার্মিনাল নির্মাণ ও পাইপলাইন তৈরিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

দেশে এখন দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৭০ কোটি ঘনফুট। সাধারণত গড়ে ৩০০ কোটি ঘনফুটের মতো সরবরাহ করা হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে ক্রমান্বয়ে এর সরবরাহ কমানো হচ্ছে। দেশে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তার একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। শিল্পকারখানায়ও বিপুল পরিমাণ গ্যাস লাগে। বিশ্বব্যাপী যে মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। গত এক বছরে কেবল ইউরোপের বাজারেই গ্যাসের দর বেড়েছে ৭০০ শতাংশ, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কভিড-১৯ এর কারণে এমনিতেই পণ্যমূল্য বাড়ছিল। কিন্তু গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর থেকে সেই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসের জন্য ইউরোপের প্রায় পুরোটাই নির্ভর করে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর। গ্যাস সংকট এখন কেবল ইউরোপে আর সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি এশিয়ায় গ্যাসের দর বেড়েছে ৬০ শতাংশ। ফলে এলএনজির দাম বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিদ্যুৎ নিয়ে সংকটে পড়ে গেছে। মিয়ানমার এলএনজি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে। পাকিস্তান বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের রেশনিংয়ের দিকে গেছে। চীন, ভারত ও থাইল্যান্ড এলএনজি কেনা কমিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশকেও যেতে হয়েছে একই পথে। মূলত সরকারের ভ্রান্তনীতির ফলে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার তিনটি ভুল করেছে গ্যাস খাতে। গ্যাসের উৎপাদন কমার প্রক্ষেপণ ছিল পেট্রোবাংলার, কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। অথচ সারা বিশ্ব এটাই করে, এটাই নিয়ম। এখন তড়িঘড়ি করছে। উৎপাদন না বাড়িয়ে ২০১৮ থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে সরকার। এখন ৪০ ডলার দাম এলএনজির। যেখানে দেশীয় গ্যাসের খরচ এক ডলারের কম।

দেশের ৫০ শতাংশ গ্যাস শেভরনের ওপর নির্ভর করে আছে। কয়েক বছরের মধ্যে তাদের পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানায় ধস নামতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারের কোনো বিকল্প ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস তুলছে। একই সীমানায় বাংলাদেশ একটা অনুসন্ধান কূপ খনন করতে পারেনি। সব মিলিয়েও বিশ্বের সবচেয়ে কম গ্যাস অনুসন্ধান হয়েছে বাংলাদেশে। গ্যাস অনুসন্ধান না করেই আমদানির পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। ফলে এখন সংকট গভীরে চলে গেছে। বিদ্যুৎ খাতে ৬৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন শীর্ষ ১২টি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও শুধু অলস বসে থেকে সরকারের কাছ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ আদায় করছে।

বাংলাদেশে বিদ্যুতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। দেশের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে এবং বসে বসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে টাকা আদায় করা এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অর্থনীতির গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু সরকার কোম্পানিগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে আসছে, যার ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিশাল অর্থনৈতিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে। বিশাল ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করার পরও সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট ৪৯ হাজার ৩৯২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আরও ৪৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। এর অধিকাংশই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যদিও পেট্রোবাংলা বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের মাত্র ৫৫.৩ শতাংশ সরবরাহ করতে সক্ষম।

নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও সেগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদর্শ কোনো মানদ- নেই। ২০১২ সালে একটি বিবিয়ানা-২ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। একটিমাত্র কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জ বেশি ধরা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন সেটিকেই আদর্শ ধরে নিয়ে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। যদিও গত এক দশকে বৈশ্বিকভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ব্যয় প্রায় ৫০% কমেছে। যেহেতু স্থাপিত সক্ষমতা বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে তাই ২০২৫-২০৩০ সালের মধ্যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পেছনের দিকে টানবে।

অব্যবহৃত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেওয়া, ‘নো ইলেক্ট্রিসিটি নো পে’ নীতি গ্রহণ করা এবং জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করাই হবে নতুন অর্থবছরের জন্য উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। এর ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও সরবরাহের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য আসবে এবং বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আরও বেশি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব হবে, যাতে করে বিদ্যুৎ খাতের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান বোঝা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনায় সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের সক্ষমতা তৈরি না করায় উৎপাদিত বিদ্যুতের যথাযথ সুফল আসছে না। বরং দলীয় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা চুক্তির ফাঁদে ‘ক্যাপাসিটি চার্জের’ নামে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে ও যাচ্ছে। অভিযোগ আছে যে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা অপরীক্ষিত এবং বহু ক্ষেত্রে মিথ্যা। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুটি কোম্পানির পকেটেই গেছে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ৭ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। একটি কোম্পানির ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোকে কখনোই সক্ষমতার অর্ধেকেও ব্যবহার করা হয়নি বা যায়নি। ৫০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অলস থাকার পরও ভারতের পাঁচটি উৎস থেকে বর্তমানে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছে বাংলাদেশ। যদিও চাহিদা না থাকায় আমদানি সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না। এরপরও ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে নতুন আমদানির চুক্তি হয়েছে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য।

নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে পর্যায়ক্রমে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। ওভারহোলিং চার্জের নামেও বেসরকারি কেন্দ্রকে ভর্তুকি দিতে হয়, যা সরকারি কেন্দ্রে নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিকভাবে চাহিদার ১০ শতাংশ অধিক ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র রাখলেই চলে। সে অনুযায়ী দেশে সাড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেই চলে। আর ২০২৫ সালে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন সক্ষমতা লাগবে ২২ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদার চেয়ে ৫০ শতাংশ বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।