মিরসরাই রেলক্রসিং ট্র্যাজেডি

শোক-ভালোবাসায় নিহতদের শেষ বিদায়

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বড়তাকিয়া রেলক্রসিংয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত ১১ জনের জানাজা ও সৎকার সম্পন্ন হয়েছে। গত শুক্রবার রাত ও গতকাল শনিবার দিনের ভিন্ন সময়ে নিজ নিজ এলাকায় নিহদের দাফন ও সৎকার হয়। সে সময় নিহতদের পরিবার ও প্রতিবেশীদের বিলাপে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

শুক্রবার রাতে নিহতদের বহনকারী লাশের অ্যাম্বুলেন্স চিকনদন্ডী এলাকায় পৌঁছলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে সাবেক মন্ত্রী ও হাটহাজারী থেকে নির্বাচিত সাংসদ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চিকনদন্ডী এলাকায় গিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের সান্তনা দেন।

এদিকে ওই দুর্ঘটনায় ১১ জনের প্রাণহানির জন্য গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনের গাফিলতিকে দায়ী করেছে পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকেই এ ঘটনায় ওই গেটম্যানকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানায় এসআই জহিরুল ইসলাম বাদী হয়ে এ মামলা করেন। তার আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় গেটম্যান সাদ্দামকে আটক করে নিজেদের হেফাজতে নেয় রেলওয়ে পুলিশ। রাতে দুর্ঘটনার বিষয়ে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের ওসি মো. নাজিম উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই আমরা তদন্তকাজ শুরু করেছি। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার জন্য গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনের অবহেলার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাই তার বিরুদ্ধে কর্তব্যকাজে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে শনিবার আদালতে পাঠানো হলে সেখান থেকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখে ফেরার পথে গত শুক্রবার দুপুরে বড়তাকিয়া রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মর্মান্তিক মৃত্যু হয় মাইক্রোবাস আরোহী ১১ জনের। দুর্ঘটনার জন্য রেলক্রসিং এ গেটম্যানের অনুপস্থিতি ও মাইক্রোচালকের গেটবার তুলে যাওয়ার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পাওয়া যায় বিভিন্ন মহল থেকে। ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, যখন দুর্ঘটনা ঘটে তখন গেটম্যান সাদ্দামকে সেখানে দেখা যায়নি। পরে হতাহতদের উদ্ধারকাজ চলার সময় তিনি আসেন। কেউ বলেছেন গেটম্যান ওই সময় গেটবার ফেলে রেখে মসজিদে জুমার নামাজে গিয়েছিলেন। তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নিজের অনুপস্থিতির বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশের এসপি প্রকৌশলী মো. হাছান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুর্ঘটনার সময় গেটম্যানের অনুপস্থিতির বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাই কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে তার বিরূদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হবে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে প্রকৃতপক্ষে এ দুর্ঘটনার দায় কার।

হাটহাজারীর আমানবাজার এলাকার একটি কোচিং সেন্টারের ছাত্র-শিক্ষকরা শুক্রবার সকালে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যান। সেখান থেকে ফেরার পথে দুপুর পৌনে ২টার দিকে বড়তাকিয়া রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী মহানগর প্রভাতী ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এ সময় গাড়িতে থাকা ১১ জন ঘটনাস্থলে মারা যান। এছাড়া আহত আরও ছয়জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

নিহতদের সৎকার ও দাফন সম্পন্ন : গত শুক্রবার রাতে নিহতদের বহনকারী লাশের অ্যাম্বুলেন্স চিকনদন্ডী এলাকায় পৌঁছলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে সাবেক মন্ত্রী ও হাটহাজারী থেকে নির্বাচিত সাংসদ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ চিকনদন্ডী এলাকায় গিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের সান্তনা দেন। পরে ১২টার দিকে দুজনের দাফন ও একজনের সৎকার হয়। আর শনিবার দিনের ভিন্ন সময়ে নিজ নিজ এলাকায় নিহতদের দাফন ও সৎকার হয়।

বিভিন্ন দফায় তাদের জানাজায় অংশগ্রহণ করেন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুর ইসলাম মাহমুদ, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক এমএ সালাম, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ইবরাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন শাহ, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ইউনুস গনি চৌধুরী, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এসএম রাশেদুল আলম, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শাহানেওয়াজ চৌধুরী, চিকনদ-ী ইউপি চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান বাচ্চু, শিক্ষানুরাগী নেচার উদ্দিন বুলু ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা।

গতকাল হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিদুল আলম গতকাল গণমাধ্যমকে জানান, দুর্ঘটনায় নিহতদের দাফনকাফনের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫ হাজার এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের জন্য ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।