গোল্ডেন অফিসাররা অপরাধে

পরিদর্শকরা ফাইল আটকে রাখেন 'তাদের খুশি করানোর জন্য'

রানা প্লাজা ধসের পর এ সেক্টরের তদারকি নিয়ে সারা বিশ্ব কথা শুনিয়েছে বাংলাদেশকে। মানহীন তদারকির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তুলেছিল বৈশ্বিক শ্রম সংস্থা ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ত্বরিত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিয়েছিল সরকার।

২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের আগে সরকারের পর্যাপ্ত পরিদর্শক ছিল না। পরিদর্শনের প্রশাসনিক কাঠামোও পরিদপ্তরে সীমিত ছিল। মূলত পরিদর্শনের অক্ষমতার কারণেই অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসের মতো ঘটনা ঘটেছে এমন অভিযোগের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি তত্ত্বাবধানে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে জনবল নিয়োগের কাজ তদারকি করেন। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা বিধিমালা রাতারাতি সংশোধন করা হয়। বিসিএস পাস কিন্তু পদ-স্বল্পতার কারণে ক্যাডার পদে সুপারিশবঞ্চিতদের দিয়ে পরিদর্শকদের পদ পূরণ করা হয়। দুই ধাপে ২৩০ জন কর্মকর্তা পরিদর্শক পদে যোগ দিয়েছিলেন। এসব কর্মকর্তার ওরিয়েন্টেশন (পরিচিতিমূলক) হয়েছিল ২০১৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন শ্রম সচিব মিকাইল শিপার। তিনি এসব কর্মকর্তাকে ‘গোল্ডেন অফিসার’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন। তাদের দিকে পুরো বাংলাদেশ তাকিয়ে থাকবে বলে সচিব বলেছিলেন। এসব পরিদর্শকের কাজের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী কলকারখানাগুলোতে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে বলে আশার কথা শুনিয়েছিলেন সচিবসহ অন্যরা।

ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহমদ। তারাও সচিবের গোল্ডেন অফিসার সম্বোধনের সঙ্গে একমত হয়ে পরিদর্শকদের সার্বিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন।

পরিদর্শন কাজে যোগ দেওয়ার সাত বছর পর এসব কর্মকর্তার দিকে ফিরে তাকালে সে আশাবাদের ছাপ দেখা যাচ্ছে না; বরং লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নেয় অনেকে। গণশুনানিতে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন সাধারণ মানুষ। ১০০ টাকাও ঘুষ নিচ্ছেন তারা। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী কারখানার লাইসেন্সের আবেদন করলে তাতে সাড়া না দিয়ে পরিদর্শকরা ফাইল আটকে রাখেন তাদের ‘খুশি করানোর জন্য’। বিনিয়োগকারীরা অনন্যোপায় হয়ে প্রতিকারের চেষ্টা করলে এমন ঘটনার দু-একটি প্রকাশ হয়। বাকিগুলো চাপা পড়ে থাকে। ঘুষ নিতে গিয়ে হাতেনাতে আটক হচ্ছেন তারা, এমন ঘটনাও আছে। ঘুষের টাকায় তারা পোষেন ড্রাইভার, ক্যাশিয়ার, পিয়নসহ বাহারি টাইপের কর্মচারী।

যে অধিদপ্তর বৈশ্বিক চাপে এবং সরকারপ্রধানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সৃষ্টি হয়েছে, রাতারাতি বিধিবিধান পাল্টে ও নজির সৃষ্টি করে পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গোল্ডেন অফিসারদের এ পরিণতি কেন জানতে চাইলে একজন শ্রম পরিদর্শক জানান, গত সাত বছরেও পদ স্থায়ী হয়নি। গত মাসে কিছু পদ স্থায়ী হয়েছে। বাকিগুলোর কবে হবে তার কোনো ঠিক নেই। পদ স্থায়ী হয়নি তো চাকরিও স্থায়ী হয়নি। গ্রেডেশন তালিকাও ঝুলছে সাত বছর ধরে, এখনো চূড়ান্ত হয়নি। গ্রেডেশন হয়নি বলে পদোন্নতির কোনো ভরসা নেই। এসব কারণে যে যেভাবে পারছে আখের গুছিয়ে নিচ্ছে।

সাবেক শ্রম সচিব মিকাইল শিপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে অধিদপ্তর সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিহাস। পরের কাজগুলো যাদের এগিয়ে নেওয়ার কথা তারা তা করতে পারেননি। কোন পরিস্থিতিতে অধিদপ্তর হয়েছিল তা আমরা ভুলে গেছি।’

৩৩তম বিসিএসে সহকারী মহপরিদর্শক পদে সুপারিশ পেয়েছিলেন ৪৯ জন। তাদের মাত্র ২৬ জন এখন আছে। বাকিদের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণির শ্রম পরিদর্শক আছেন ৮০ জন। এরপর ৩৪, ৩৫ এবং ৩৮তম বিসিএসে ধাপে ধাপে পরিদর্শকরা যোগদান করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরা বা তাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সহযোগীরা নানা অপকর্মে জড়াচ্ছেন।

গত ১৬ জুলাই দিনাজপুরে অটোরাইস মিলের নিবন্ধন নবায়নের জন্য ঘুষ নেওয়ার সময় দুদকের পাতা ফাঁদে গ্রেপ্তার হয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। ওইদিন শহরের ষষ্ঠীতলা এলাকা থেকে ঘুষের ৮০ হাজার টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আমবাড়ী এলাকায় ঈশান অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুডের ২০২২-২৩ অর্থবছরের কারখানার লাইসেন্স নবায়নের জন্য গত ২৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী মো. রাশেদুজ্জামান নির্ধারিত ফরমে আবেদন করেন। পরে নিবন্ধন নবায়ন কাজের সর্বশেষ অবস্থা জানতে উপমহাপরিদর্শকের সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় উপমহাপরিদর্শক অফিস ও অন্যান্য খরচ বাবদ ৮০ হাজার টাকা দাবি করেন। অন্যথায় কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানান। রাশেদুজ্জামান বিষয়টি দিনাজপুর দুদক কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানান। পরে দুদকের পাতা ফাঁদে পড়েন উপমহাপরিদর্শক। জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলছে।

কুমিল্লার এএইচ চৌধুরী অ্যান্ড সন্স আউটসোর্সিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। এ ঠিকাদারি সংস্থার রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আকবর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের পরিদর্শক ফারজানা ইসলাম। ফারজানা লাইসেন্সসংক্রান্ত কাজে তদবির এবং ঘুষ হিসেবে প্রধান কার্যালয়ের সাধারণ শাখার অফিস সহকারীর নামে ৫ হাজার এবং সহকারী মহাপরিদর্শকের নামে ৩০ হাজার টাকা এএইচ চৌধুরী অ্যান্ড সন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছ থেকে গ্রহণ করেন। এমডি ফারজানা ইসলামসহ আরও দুই শ্রম পরিদর্শকের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার লিখিত অভিযোগ দেন। গত ৫ জুন তদন্তে টাকা গ্রহণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা শুরু হয়েছে।

একই প্রতিষ্ঠানের এমডি অভিযোগ করেছেন, রেজিস্ট্রেশন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কুমিল্লা কার্যালয়ের শ্রম পরিদর্শক এসএম সাঈদ আলম তার কাছ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। ৫০ হাজার টাকা সাঈদ আলমের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে, যার হিসাব নম্বর সাঈদ আলম হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়েছিলেন। এ ঘটনাও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিনামূল্যের ফরমের বিপরীতে ১০০ টাকা ঘুষ গ্রহণ ও লাইসেন্সের জন্য আলাদা ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগে রংপুরের শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) তপন রায়কে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৮ মার্চ। ওইদিন ছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রংপুর কার্যালয়ের গণশুনানি। সেখানে উপস্থিত হয়ে মিঠাপুকুর উপজেলার মোস্তাফিজার রহমান নামে এক ব্যক্তি তপন রায়ের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি করাসহ বিনামূল্যের ফরমের বিপরীতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেন। তপন রায়ের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা চলছে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের প্রধান অফিসের কর্মকর্তারা।

গত ৫ মার্চ চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় শ্রম পরিদর্শক (সেফটি) পলাশ কুমার দাসকে গ্রেপ্তার করে দুর্নীতি দমন কমিশন। তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠান লাইসেন্স দেওয়ার নামে মামলার ভয় দেখিয়ে এক বেকারির মালিকের কাছ থেকে ঘুষের ১০ হাজার টাকা নেওয়ার সময় গ্রেপ্তার হন। জানা গেছে, মামলার ভয় দেখিয়ে পলাশ কুমার দাস ঘুষ চেয়েছিলেন বলে ওই ব্যক্তি আগেই দুদকে অভিযোগ করেছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ধরনের আরও অনেক বিভাগীয় মামলা চলছে। প্রায় প্রতি মাসে মামলার তালিকা বড় হচ্ছে। বিভাগীয় মামলা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।

পরিদপ্তর থেকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর হওয়ার পর এর প্রথম মহাপরিদর্শক ছিলেন সৈয়দ আহমদ। নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অনিয়মের খবর তার কাছেও পৌঁছায় বলে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অনিয়ম সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে। তা না হলে একজন শ্রম পরিদর্শক কীভাবে ১০০ টাকাও ঘুষ নেন!

একদিকে সরকার সবকিছু ব্যবসাবান্ধব করতে চাচ্ছে, অন্যদিকে পরিদর্শকরা লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলে ঘুষ নিচ্ছেন এ বৈপরীত্য দূর করতে হবে। অনেক কষ্ট করে এ অধিদপ্তর গড়তে হয়েছে। যে চেতনা নিয়ে অধিদপ্তর হয়েছিল, পরে সে চেতনা ধরে রাখা যায়নি বলেই এ পরিণতি মন্তব্য করেন অধিদপ্তরের প্রথম মহাপরিদর্শক সৈয়দ আহমদ।