এলিয়েনরা ঢাকায় পোস্টার ও তার দেখে কী ভাববেন

ধরুন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো ভিন্ন গ্রহ থেকে কোনো এলিয়েন বা কোনো প্রাণীর আগমন ঘটল ঢাকা শহরে, নেমেই প্রযুক্তির উৎকর্ষ দেখে সে তো অবাক! যন্ত্রপাতি ও কলকবজা খুব একটা চোখে না পড়লেও, রোবোটিক কায়দায় তারের জটিল বিন্যাস তাকে আকৃষ্ট করল। একই সঙ্গে ঢাকায় অগণিত পোস্টারে লাখ লাখ মানুষের মুখ দেখে তিনি হকচকিয়ে গেলেন। তিনি হয়তো ভাবতে থাকলেন, পৃথিবী এ মুহূর্তে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কোনো একটি ধাপ অতিক্রম করলেও ‘ঢাকা’ সম্ভবত বেশ কিছুটা এগিয়ে, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে! এরপর আবার হয়তো কিছুটা সময় যেতে না যেতেই গুমোর ফাঁস। এত শত তো দূরের কথা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দিতেই ঢাকার এই ত্রাহি অবস্থা! কিন্তু তখনো পোস্টার-ব্যানারের মাহাত্ম্য হয়তো তিনি বুঝে উঠতে পারেননি!

এবার মর্তে ফিরে আসা যাক। ধুলাবালু, জঞ্জাল, যত্রতত্র ময়লা ও আবর্জনা ঢাকা শহরকে প্রতিদিন আবর্জনাময় করে তুলছে। আজকে আমরা বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলছি, অগ্রগতি নিশ্চয়ই আছে কিন্তু শহরের রাস্তাঘাটের দিকে তাকালে তা কোনো এক রহস্যময় শহরেরই প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। রাস্তায় রাস্তায় তারের যে প্যাঁচ কষা হয়েছে তার রহস্যভেদ করা কঠিন। যদিও নগরপিতারা বলছেন এই জঞ্জাল থেকে শহরকে মুক্ত করা হবে। নিশ্চয়ই হবে, তবে তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ততই মঙ্গল। যেনতেন উপায় কোনো কিছু করা যেন আমাদের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমরা সেই অভ্যাসেরই দাস হয়ে আছি।

জাতি হিসেবে আমাদের অর্থ-বৃত্তের ঘাটতি থাকতে পারে। হয়তো আমাদের রাস্তাঘাট ঝকঝকে ও তকতকে না বা আমাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিও প্রকট। কিন্তু যেটুকু আছে তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে সমস্যাটা কোথায়? নোংরা করে রাখার মধ্যে যে কোনো মাহাত্ম্য নেই, আছে শুধু অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা। এই অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার পেছনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের যেমন ঘাটতি আছে এবং একই সঙ্গে আছে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যে প্রতিনিয়ত আপনাকে বলছে, আমি কোনোভাবে পার পেয়ে গেলেই হলো, অন্যের অসুবিধার কথা চিন্তা করে লাভ কী? আর এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল হচ্ছে, প্রায় সবাই যেহেতু একই চিন্তা করছে, তাই সবাই এর ভুক্তভোগী হতে হয় কখনো না কখনো। টোটাল কলাপস বা সর্বাংশ অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কারও জানা নেই। মশার উৎপাত, ডেঙ্গু, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও দমবন্ধ অবস্থা ইত্যাদি অনেক কিছুর ভুক্তভোগী সবাই।

নিজের ঢোল নাকি নিজেকেই পেটাতে হয়, এই উক্তির যথার্থ প্রতিফলন আমাদের শহর ও গ্রামগুলোর পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে। ছাপাখানার ডিজিটাইজেশন যেমন আশীর্বাদ এবং একই সঙ্গে এই প্রচারপ্রেমীদের পাল্লায় পড়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের জঞ্জাল এখন প্রায় চোখ-সওয়া। আগে নির্বাচন এলে প্রার্থীরা পোস্টারের মাধ্যমে প্রচারণা চলাত। কিন্তু এখনকার সময়ে পোস্টার ছাপানোর জন্য কোনো নির্বাচন বা বিশেষ কোনো কারণ লাগে না। যেকোনো উপলক্ষেই পরতে পরতে পোস্টার ও ব্যানারে ঢেকে যাচ্ছে বাসাবাড়ির দেয়াল, সবুজ বৃক্ষ, বৈদ্যুতিক পোল, ফ্লাইওভার ও মেট্রোরেলের পিলার, সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো, ফাঁকা জায়গা, প্রায় সবকিছু।

নিজ নিজ এলাকায় রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার জন্য জনকল্যাণে সময় দেওয়াটাই একসময় মুখ্য ছিল। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি দেখে মনে হয় সেই ঘাটতিটা পূরণ করা হয় পোস্টারের পর পোস্টার ছাপিয়ে ও যেখানে-সেখানে ব্যানার লাগিয়ে। আর এর বৈধতা দেওয়া হয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতানেত্রীদের ছবি সংযোজন করে। শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে ব্যক্তিগত প্রচারণাই নয়, সিনেমা, স্কুল-কলেজ-কোচিং, মেলা, কবিরাজি চিকিৎসা, ওয়াজ মাহফিল, বিভিন্ন ধরনের দিবস উদযাপন ইত্যাদির পোস্টার ও ব্যানারে শহর, অলিগলি ভরে ওঠে সময়ে সময়ে। যদিও তথ্য-প্রচারে পোস্টার পদ্ধতি খুবই সেকেলে, ক্ষণস্থায়ী ও অকার্যকর। অনেক সময় হাজার হাজার পোস্টার মানুষের মধ্যে সামান্যই আবেদন তৈরি করতে পারে। তবে পোস্টারপ্রেমীদের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো এটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

আমাদের শহর ও গ্রামাঞ্চলে এমন পোস্টার হরহামেশাই দেখা যায়, যেখানে একই পোস্টারে নানাজনের ছবি থাকে, বিভিন্ন অবস্থানে, ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির, যাতে তথ্যের উপস্থিতি খুবই সামান্য। আবার অনেক সময় এসব পোস্টার ও ব্যানারে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবির আকৃতি ও অবস্থানে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার তারতম্যের প্রতিফলনও থাকে। আর এর মাধ্যমে খুব সহজেই সমাজের ক্ষমতার চালচিত্র সবার সামনে উন্মোচিত হয়, যা আবার কখনো কখনো সাধারণ জনগণের মধ্যে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতিও সৃষ্টি করে।

সারা দেশে পোস্টারের ব্যাপক আধিপত্য থাকলেও শহরাঞ্চলে এর উৎপাত সহ্যসীমার বাইরে। পোস্টার ও ব্যানার শুধু চোখের জন্যই অসহ্যকর নয়, যথেচ্ছাচার পোস্টার ও ব্যানারের ব্যবহার পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এগুলো যেমন রাস্তাঘাট নোংরা ও অপরিষ্কারাচ্ছন্ন করে, তেমনি ড্রেন ও নর্দমার মধ্যে জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। আবার প্রতিদিন এসব পোস্টার ছাপানোর জন্য যে পরিমাণে গাছ বা বৃক্ষরাজি ধ্বংস করা হচ্ছে, তাও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পোস্টার শুধু প্রাকৃতিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ী নয়, এটি একটি অযাচিত অপচয়।

এখনকার এই কৃচ্ছ্রসাধন ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনার কালে এভাবে পোস্টারের ব্যবহার অন্যায়ও বটে। একটু সচেতন হলেই আমরা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি অপচয় বন্ধ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারি। আর এই ডিজিটাল বিপ্লবের সময়ে এটা করা খুবই সম্ভব। আজকের এ সময়ে আমরা সবাই যতটুকু বাস্তব সামাজিক পরিমণ্ডলে থাকি তার থেকে সাইবার স্পেসে বিচরণ কোনো অংশেই কম না। আর এই স্পেসগুলোই হচ্ছে নিজেদের ও পণ্যের প্রচারণায় সর্বোত্তম জায়গা, যার মাধ্যমে প্রযুক্তিগতভাবে সহজেই উদ্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব। আর বাড়তি পাওনা, প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দূষণরোধ, অযাচিত অপচয় বন্ধ ও সবিশেষ চোখের শান্তি।

‘পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’ গেজেট আকারে প্রকাশ হওয়ার ১০ বছর বা এক দশক পরেও তা অকার্যকর রয়ে গেছে। বাংলাদেশে আরও আট-দশটা ইতিবাচক আইনের মতোই এ আইন বাস্তবায়নে জনগণের অসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। এ আইন অনুসারে নির্দিষ্ট স্থানে পোস্টার লাগানো অথবা কর্র্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে পোস্টার লাগানোর কথা।

প্রকৃতপক্ষে এর কোনোটাই হয় না বা হওয়া উচিত এ রকম প্রয়োজনের অনুভবও কদাচিৎ।

এখন এই জঞ্জাল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবার সচেতন হওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেকটা পর্যায়ে শৃঙ্খলা ও দায়বদ্ধতা তৈরির জন্য দায়িত্ব তো সরকারেরই। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যারা বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে হাজার হাজার পোস্টার ও ব্যানার ছাপিয়ে থাকে, তাদেরও এই চর্চা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলো ও এর নেতাকর্মীরা যারা এই সংস্কৃতির চর্চা করে থাকেন তাদের সচেতন হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন সবার অনুধাবন করার সময় এসেছে কীভাবে এই চর্চা থেকে ধীরে ধীরে বের হওয়া যায় এবং কীভাবে বিকল্প ও পরিবেশসম্মত উপায়ে প্রচার-প্রচারণা ও তথ্য বিনিময় করা যায়।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

psmiraz@yahoo.com