অমিতদার নামের অমিত অংশটা তার স্বোপার্জিত। আসল নাম ছিল আহসান হাবিব। তিনি নিজে কবি ছিলেন, কবিতা লিখতেন; আবৃত্তি করতেন, ফলে আহসান হাবিব নামটা তিনি বদলে নেন। তিনি নিজের নাম রাখেন অমিত হাবিব। এখন আমরা সবাই তাকে অমিত নামেই চিনি, আমাদের কাছে তিনি অমিতদা।
অমিতদাকে প্রথম দেখার স্মৃতি জ্বলজ্বল করে এখনো। সাপ্তাহিক পূর্বাভাস অফিস। ১৯৮৯ সাল হবে। পুরানা পল্টনের ভেতরে জামাতখানার বিপরীতে একটা লাল রঙের বিল্ডিংয়ের নিচতলা আর দোতলা জুড়ে সেই অফিস। সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু ভাই। কাজ করেন আমিনুর রশীদ, দীপু হাসান, কুদ্দুস আফ্রাদ। নিয়মিত আসেন মিনার মাহমুদ, আমান উদ দৌলা, ফজলুল বারী, মাইনুল। মাঝে-মধ্যে আসেন তসলিমা নাসরিন। আসেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহও। প্রচ্ছদ আঁকেন শিশির ভট্টাচার্য্য। রঙিন কার্টুন দিয়ে অসাধারণ সব প্রচ্ছদ। সেই অফিসের নিচতলায় পাশাপাশি দুটো টেবিল। আমিনুর রশীদ আর আমি পাশাপাশি বসি। উল্টো দিকে দর্শনার্থীদের বসার সোফা ধরনের চেয়ার। তাতে বসে আছেন অমিত হাবিব। তিনি পূর্বাভাসে টেলিভিশনের রিভিউ লেখেন। নিয়মিত। সেই লেখা পড়ে আমরা শ্রদ্ধায় নত হয়ে থাকি। একজন মানুষের জানাশোনার পরিধি কত বড় হতে পারে?
একদিন তিনি নিয়ে এলেন সেলিম আল দীনের সাক্ষাৎকার। তা পড়ে আমিনুর রশীদ বললেন, এ তো সাক্ষাৎকার নয়। আড্ডা। সেলিম আল দীনও কথা বলেছেন, অমিত হাবিবও কথা বলেছেন। কাজেই শিরোনামে তা-ই রাখা হলো। অমিত হাবিবের সঙ্গে সেলিম আল দীনের কথোপকথন। ওই সময় বিচিন্তায় বা আরেকটা পত্রিকায় টেলিভিশনের সমালোচনা লিখতেন সুবল বণিক। তিনি সেলিম আল দীনের নাটক গ্রন্থিকগণ কহে-র নেতিবাচক আলোচনা লিখেছিলেন। পরে দেখা গেল, সেলিম আল দীন নাটকে সুবল বণিক নামের একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তার কাজ যাত্রাদলের আধিকারিকের পদসেবা করা। সে এক সময় ছিল। নাট্যকাররা পত্রিকার আলোচনা পাঠ করতেন। তার দ্বারা বিচলিতও হতেন।
অমিত হাবিব সেলিম আল দীনের ভক্ত ছিলেন। অমিত হাবিবের পড়াশোনার পরিধি ছিল ভয়াবহ রকমের বিস্তৃত। তিনি মার্কসবাদে খানিকটা দীক্ষিত ছিলেন। মহসিন শস্ত্রপাণির সাহচর্য লাভ করেছিলেন। সাংঘাতিক ভক্ত ছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের। ব্রায়ান লারার নামে অজ্ঞান হয়ে যেতেন। আর ক্রিকেট নিয়ে উৎপল শুভ্রর সঙ্গে ঝগড়া করতেন।
সেই ১৯৮৯/৯০ সালেই আমার সঙ্গে উৎপল শুভ্রেরও পরিচয় ঘটে। তিনিও পূর্বাভাস অফিসে আসতেন আড্ডা দিতে। আমার বয়স তখন ২৪/২৫। বুয়েট থেকে সদ্য বেরিয়েছি, ইঞ্জিনিয়ারিং করি না, পূর্বাভাস অফিসেই ৩০০ টাকার চকিতে থাকি। সাড়ে তিন হাজার টাকা বেতন পাই। এক রাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমি কোথায়। এটা কি রংপুর? এটা কি বুয়েটের হল? অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয় করতে লাগল। আমি বুয়েট থেকে পাস করে বেরিয়ে এ কী করছি? কেন আমি ৩০০ টাকার চকিতে শুয়ে আছি? আমার ভবিষ্যৎ কী? পূর্বাভাস থেকে আমি যোগ দিলাম সাপ্তাহিক খবরের কাগজে। অমিত হাবিব তখন আজকের কাগজে কাজ করছেন। তিনি নিউজ ডেস্কে শিফট ইনচার্জ ছিলেন। সুমনা শারমীন, মেরিনা, মুন্নি সাহা, একেএম জাকারিয়া এরা সবাই তার সহকর্মী। মেরিনা এখনো বলেন, সাংবাদিকতার বহু কিছু তিনি অমিত হাবিবের কাছ থেকে শিখেছেন এবং শিখেছেন পুলক গুপ্তদার কাছ থেকে।
এরপর আমরা সবাই চলে এলাম ভোরের কাগজে। আমরা বহুদিন অমিত হাবিবের বাসায় রাত কাটিয়েছি। রায়ের বাজারের ভেতরে একটা বাসা ছিল। কারণ আজকের কাগজ অফিস ছিল জিগাতলায়। ভোরের কাগজের অফিস চলে এলো শাহবাগে। তারপর তিনি শাহবাগের আশপাশে একটা বাসা নিয়েছিলেন। উৎপল শুভ্রও সেই বাসায় থাকতেন। কাজেই আমাদের আড্ডার একটা প্রধান জায়গা ছিল অমিতদার বাসা। আমি বহু রাত সেই বাসায় কার্পেটে শুয়ে কাটিয়েছি।
কত মজার মজার স্মৃতি আছে। আমরা উৎপল শুভ্রকে খেপাতাম কিপ্টে বলে। একদিন অমিতদা, উৎপল শুভ্র, সাজ্জাদ শরিফ ভাই আর আমি বেবিট্যাক্সিতে করে জার্মান কালচারাল সেন্টার থেকে সিনেমা দেখে ভোরের কাগজের বাংলা মোটর অফিসে এসেছি। বেবিট্যাক্সির ভাড়া না দেওয়ার জন্য অমিত দা, সাজ্জাদ ভাই আর আমি দৌড়ে অফিসের তিনতলায় উঠে গেলাম। মাঝখানে বসেছিলেন উৎপল শুভ্র। তিনি পড়লেন বিপদে। তাকেই ভাড়া দিতে হবে। তিনি ক্ষিপ্ত। ভাড়া দিতে তার আপত্তি নেই, কিন্তু তারপরেও তাকেই কেন কিপ্টে বলা হবে?
অমিতদা প্রমিত বাংলায় কথা বলতেন। দেশের খবর রাখতেন। বিদেশের খবর রাখতেন। রাজনীতি কবিতা সাহিত্য সমাজ ইতিহাস নিয়ে তার ব্যাপকভাবে পড়া ছিল। তিনি বয়সে একটু বড় ছিলেন, আমার চেয়ে বছর দুয়েকের। ফলে তার গুরুত্ব আমরা মেনে নিতাম। মানে আমাদের তিনি গুরু ছিলেন। তিনি একটা কথা বললে সেটাকে আমরা রায় হিসেবে নিতাম। তবে উৎপল শুভ্র তা নিতেন না। তিনি তর্ক জুড়ে দিতেন। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে উৎপল শুভ্র বনাম অমিত হাবিব ঝগড়া একটা বড় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তারা বহুদিন একই বাসায় থেকেছেন।
সুমনা শারমীনের বিয়ের রাতের কথা আমার মনে আছে। প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমাদের সহকর্মী মেয়েরা শাড়ি পরে বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছেন। অমিতদা বললেন, আমাদের মেয়েগুলোকেই তো সবচেয়ে সুন্দর লাগছে।
অমিতদা, আমি, উৎপল শুভ্র, মেরিনা, জাকারিয়া, অলক... আমরা আসলে একই থালা থেকে খাবার ভাগ করে খেয়ে দিন পার করেছি। আজকের কাগজ থেকে ভোরের কাগজ। অমিতদা ততদিনে নিউজ এডিটর হয়ে গেছেন। আমরা চলে এলাম প্রথম আলোয়। অমিতদা আরও বড় হতে লাগলেন। সম্পাদক হয়ে গেলেন।
আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো কম। মাঝখানে একবার ফোন করলেন। গুলশানে তিনি একটা রেস্তোরাঁ দিচ্ছেন। উদ্বোধনী দিনে গিয়ে খেতে হবে। মধুর প্রস্তাব। আমরা গেলাম। ভোরের কাগজের একটা পুনর্মিলনী হয়ে গেল। তারপর এই বছর মার্চ মাসে ফোন করলেন। দেশ রূপান্তর পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। গুলশানের পাঁচতারা হোটেলের বলরুমে হবে। আমি মেরিনা শুভ্র গেলাম সেখানে। আমাকে ডেকে মঞ্চে তুললেন। পরে আমাদের তিনি নিয়ে গেলেন ভিড়ের বাইরে একটা নিরিবিলি জায়গায়। সেখানে আমাদের বসিয়ে আলাদা করে যত্ন করে খাওয়ালেন। সেই আদর আর সম্মানটাই আমার মনের মধ্যে গেঁথে আছে। অমিতদা আমাদের মনে রেখেছেন। আমরা যে তার কাছের মানুষ ছিলাম।
দেশ রূপান্তর পত্রিকা যখন বের হলো, তখন পত্রিকাটা আমার এত ভালো লাগতে শুরু করল যে আমি আলাদা করে হকারকে ডেকে বললাম, এই পত্রিকা আমার বাসায় দেবেন। খুব সুন্দর হতো পত্রিকাটা। নিউজ ট্রিটমেন্ট দেখে আমি আর মেরিনা বলতাম, অমিতদার কাগজ, ভালো হবেই। তারপর করোনার সময় বাসায় কাগজ আসা বন্ধ হয়ে গেল। পরে অনেকদিন পত্রিকাটা দেখি না। জানি না, এখন কেমন হয়!
শেষের দিকে অমিতদা নাকি বিষন্ন ছিলেন। তাও জানি না। জীবন এমন হয়ে গেছে, যেন রোলার কোস্টারে চড়েছি। অন্য কারও দিকে খেয়াল করার সময় পাই না। অমিতদার খবর দূর থেকে পেতাম। কাছে যাওয়া হয়নি।
অমিতদার একটা চমৎকার ঘিয়ে রঙের দুই পকেটওয়ালা একটু মোটা সুতির শার্ট ছিল। সেই নব্বইয়ের দশকের কথা বলছি। সেই শার্টপরা তাজা শক্ত দৃঢ় অমিত হাবিবকে মনে পড়ে। ভোরের কাগজ অফিসে মহসিন শস্ত্রপাণি এসেছেন। বামপন্থা নিয়ে আলাপ করছেন। সেই দৃশ্য মনে পড়ে। আর মনে পড়ে অমিতদার তর্ক করার ভঙ্গিটা, ডান হাতের তর্জনি টেবিলে ঠোকা দিতে দিতে জোরের সঙ্গে কথা বলতেন।
ব্রায়ান লারা যে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান, সেটা তিনি প্রমাণ করেই ছাড়তেন। লারা অপরাজিত ৪০০ করে তা প্রমাণ করেছিলেন বটে। তা অমিতদাকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য, নাকি লারার শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে অমিতদার মূল্যায়ন আগে থেকেই সঠিক ছিল বলে, তার হিসাব তো ইতিহাস রাখবে না।
আমাদের দেশে ওয়ার্কিং জার্নালিস্ট কম। যারা কাজ করেন, তারা পেছনে থাকেন। যারা সামনে থাকেন, তারা কাজ করেন না। অমিত হাবিব ছিলেন সত্যিকারের নেতা, তিনি সামনে থেকে কাজ করেছেন, পেছনে থেকে কাজ করেছেন, ভেতরে থেকে কাজ করেছেন, সাব-এডিটর থেকে কাজ করতে করতে বড় হয়েছেন; এবং শেষ পর্যন্ত কাজই করে গেছেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা বোঝা, নেতৃত্বের গুণ, ব্যবস্থাপনা, সংগঠন চালানো, সব পারতেন অমিতদা। শফিক রেহমানের যায়যায়দিনে যখন তিনি যোগ দেন, তখন প্রথম আলো থেকে অনেকে যায়যায়দিনে চলে গিয়েছিলেন। তাদের একজনকে আমি বললাম, আপনারা কী বুঝে যায়যায়দিনে গেলেন? ওটা যে টিকবে না, তাতো আমি আগে থেকেই জানতাম। তিনি বললেন, আমরা অমিত হাবিবের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। অমিত হাবিব আমাদের বুঝিয়েছিলেন, কেন যায়যায়দিনে যোগ দেওয়া উচিত। আমরা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
অমিত হাবিবের মুগ্ধ করার ক্ষমতা ছিল জাদুকরী। এবং অন্যকে কনভিন্স করার ব্যাপারে তার উৎসাহ ছিল মিশনারি।
অমিত হাবিব নেই, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা পূরণ হওয়ার নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক