৭৬ কোটির জমি ২৩ কোটিতে

রাজধানীর মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একটি প্লট কম দামে বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া প্লটটি বরাদ্দের ক্ষেত্রেও গৃহায়ন নীতিমালা মানা হয়নি। সম্প্রতি ৭৫ দশমিক ৭৬ কাঠার এ প্লটটি প্রায় ২৩ কোটি টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ জমিটির প্রকৃত দাম কমপক্ষে ৭৬ কোটি টাকা। নীতিমালা মেনে বরাদ্দ দিলে সরকার ১০০ কোটি টাকাও পেতে পারত।

এভাবে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জমি বিক্রির ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন সংস্থাটিরই কয়েকজন প্রকৌশলী। তারা বলছেন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একের পর এক জমি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এভাবে জমি বরাদ্দ দেওয়ারও আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের যোগসাজশে জমি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

নীতিমালা উপেক্ষা করে কম দামে ওই জমি বরাদ্দের বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের একটি ইস্যু ছিল। তবে বরাদ্দের বিষয়টি সম্ভবত আগেই হয়েছিল। এখন রুটিন কাজকর্ম হতে পারে। ফাইল না দেখে এর বেশি বলতে পারছি না।’ আইন না মেনে বরাদ্দ হওয়ার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন সরকারের এ অতিরিক্ত সচিব।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মিরপুরের ১৪ নম্বর সেকশনের ডি-ব্লকের যে প্লটটি বিক্রি করা হয়েছে সেখানে এর আগে গৃহায়ন একটি প্রকল্পও হাতে নিয়েছিল। এ প্লটটি বরাদ্দ পেতে মো. সামসুল আলম নামে এক ব্যক্তি আবেদন করেন। তিনি আবেদনপত্রে নিজেকে গ্রিনফিল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যক্তির আবেদনের পর গৃহায়ন প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে মতামত নেয়। সংস্থার বোর্ড সভায় এসব বিষয় উল্লেখ করে সামসুল আলমের এ প্রতিষ্ঠানের নামে ৭৫ দশমিক ৭৬ কাঠার এই প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ২৩১তম বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সংস্থার প্রধান মো. দেলওয়ার হায়দারের সভাপতিতে বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) মো. শাহজাহান আলী, সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) ড. মইনুল হক আনছারী, সদস্য (পরিকল্পনা, নকশা ও বিশেষ প্রকল্প) ও সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) কাজী ওয়াসিফ আহমাদ। তবে জমি ও বরাদ্দসংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে মূল ভূমিকা পালন করেন সদস্য (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) ড. মইনুল হক আনছারী। কাগজপত্রে বোর্ড সভা করার তারিখ দেখানো হয় ৩০ জুন। তবে প্লটটি বরাদ্দের জন্য জুলাই মাসের বেশিরভাগ পর্যন্ত সভা দীর্ঘায়িত হয়। অবশেষে দুই-তিন দিন আগে সভার কার্যবিবরণীতে সব সদস্য স্বাক্ষর করেন বলে জানা যায়।

অভিজ্ঞ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। গৃহায়নের রাজধানীর মিরপুর ও মোহাম্মদপুরসহ সারা দেশে হাজার হাজার একর জমি রয়েছে। ফলে সংস্থাটি সৃষ্টির শুরুতেই এ ধরনের শত শত আবেদন আসে। কিন্তু বিধি অনুযায়ী তা আমলে নিয়ে কাউকে বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়ার নজির খুব একটা নেই। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ চলে তার বরাদ্দ নির্দেশিকা অনুযায়ী। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বরাদ্দ নির্দেশিকা ২০০৮, (সংশোধনী -২০১৬) অনুযায়ী, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্লট বরাদ্দ দিতে হলে প্রথমে এ সংক্রান্ত একটি কমিটি করতে হবে। এ কমিটি এসব প্লট বরাদ্দের বিষয়টি উল্লেখ করে একাধিক জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেবে। সেখানে অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্লটের দাম নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোচ্চ দরদাতাকে জমি বরাদ্দ দিতে হবে। সরকারি কোনো সংস্থা বা মন্ত্রণালয় বললেই স্কুল-কলেজ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে এভাবে বরাদ্দ দিতে পারে না। যদি তাই হতো তাহলে এতদিন গৃহায়নের কোনো জমি থাকত না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো মিরপুর নিয়ে গৃহায়নের একটি মাস্টারপ্ল্যান বা বিশদ পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে কোথায় স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, খেলার মাঠ ও রাস্তা হবে তা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বা প্রকৌশলী চাইলে মাস্টারপ্ল্যান ভেঙে সেখানে নতুন করে নকশা করে প্লট বানিয়ে তা বরাদ্দ বা বিক্রি করলে আইনসিদ্ধ হবে না। যে প্লটটি স্কুলের নামে দেওয়া হয়েছে সেটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিক্রি করলে কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা সরকার পেত। কিন্তু সেখানে নানা ‘মারপ্যাঁচ’ লাগিয়ে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ ২২ কোটি ৭২ লাখ ৮০ হাজার দাম নিচ্ছে। প্রকৃত দাম হিসাব করলে সরকারের কমপক্ষে ৫৫ কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।

ফরম্যাট নকশার সঙ্গে জড়িত একজন প্রকৌশলী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে গিয়ে এভাবে নকশা তৈরি করা যায় না। যে এলাকায় জমির অবস্থান সেখানে দীপক কুমার সরকার নামে একজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রয়েছেন। তিনি মূলত উপসহকারী প্রকৌশলী। নিজের যোগ্যতার বাইরে গিয়ে এক পদ ডিঙিয়ে বসেছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর চেয়ারে। এখন শীর্ষ পর্যায় থেকে ‘ন্যায়-অন্যায় যাই বলা হয়’ তিনি তাই করেন। আর দীপককে দিয়ে এসব নকশা তৈরি হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ অন্যদের চাপ দেওয়া হয়। কখনো বদলির হুমকি দেওয়া হয়। ফলে তারাও বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করে দেন। আর এর ওপরে যারা নকশা বা বরাদ্দের সঙ্গে জড়িত তাদের কাছে পদ বা ‘টেবিল’ অনুযায়ী আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে যায়। বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ছাড়া এমন অনিয়ম করে বরাদ্দ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

নিজ সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে প্রকৌশলী দীপক কুমার সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে প্লটের নকশা সৃজন করার কথা বলা হচ্ছে তা উপবিভাগ-১ থেকে প্রকৌশলী সালোয়া জামান করেছে। এ কাজের সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত নই।’ এ বিষয়ে প্রকৌশলী সালোয়া জামানের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ফোন করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

গৃহায়নের নির্বাহী প্রকৌশলী (গৃহসংস্থান বিভাগ-২, মিরপুর) আবু হোরায়রা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবেদনকারীর আবেদন অনুযায়ী আমরা প্রথমে একটি হাতনকশা করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠাই। সেখান থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত আসার পর ফরম্যাট নকশা করে প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাব দেওয়া মানে কাউকে বরাদ্দ দেওয়া নয়। উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে এখানে বরাদ্দ হয়। মাঠপর্যায় থেকে শুধু প্রতিবেদন নেওয়া হয়।’

গত এক যুগ এ ধরনের বড় আকারের জমি বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ থাকলেও তা আবার পুরোদমে শুরু হয়েছে জানিয়েছেন জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একজন প্রকৌশলী। নাম প্রকাশ না করে জমি বরাদ্দে অনিয়মের বিষয়ে দেশ রূপান্তরের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এ প্রকৌশলী। তিনি বলেন, সম্প্রতি যে হারে জমি বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়েছে এতে সংস্থাটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। নিজেদের চোখের সামনে এসব মেনে নিতে কষ্ট হয় বলেও জানান তিনি।

এ প্রকৌশলীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিয়মনীতি সম্পর্কে ধারণা রাখা গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনের এ জমিটির মতো এভাবে আরও জমি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য দফারফা চলছে।’

গৃহায়নের পরিচালক (ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা) মো. আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোর্ড অনেক শক্তিশালী, মানে বোর্ডকে আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বোর্ড ইচ্ছে করলে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখানে (মিরপুর ১৪ নম্বরের প্লট বিক্রি) অনিয়মের কিছু হয়নি।’