আল কায়েদার সম্ভাব্য নতুন নেতা কে এই ‘আতঙ্ক আদেল’

কাবুলের একটি বাড়িতে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন বিশ্বের ত্রাস হয়ে ওঠা জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরি। এই ‘সমাপ্তি’ জন্ম দিয়েছে নতুন প্রশ্নের। এবার কে বসতে চলেছেন আল কায়দার নেতৃত্বে? জল্পনায় উঠে আসছে বিভিন্ন নাম। সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞরা ‘বাজি’ ধরছেন জওয়াহিরির মতো আরও এক মিশরীয়র উপর। ইনি প্রাক্তন মিশরীয় সেনানায়ক সাইফ আল আদেল। মনে করা হচ্ছে তারই কাঁধে সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।

ওসামা বিন লাদেনের জীবদ্দশায় জওয়াহিরি ছিলেন সংগঠনের দ্বিতীয় মুখ। লাদেনের মৃত্যুর পর মিশরের ওই শল্যচিকিৎসকের কাঁধে দেওয়া হয় সংগঠনের দায়িত্বভার। জওয়াহিরির মৃত্যুর পর আল কায়দার প্রধান হিসাবে উঠে আসছে আদেলের নাম। ঘটনাচক্রে প্রাক্তন ওই মিশরীয় সেনানায়ক এখন আল কায়দার দ্বিতীয় ব্যক্তি।

আদেল ছিলেন মিশরে ইসলামিক জেহাদ গোষ্ঠীতে ওসামা ও জাওয়াহিরির সহযোগী। ১৯৮০-এর দশকে লাদেন-জাওয়াহিরির তৈরি জঙ্গি সংগঠন মক্তব অল খিদমতেরও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সাইফ আল আদেল। আফগানিস্তানে লড়েছেন সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধেও।

২০০১ সাল থেকে আদেল এফবিআইআই-এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছেন। তাকে ধরিয়ে দিলে যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ডলার পুরস্কার দেবে। ১৯৯৮ সালে দার এস সালাম, তানজানিয়া এবং কেনিয়ায় আমেরিকার দূতাবাসে হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে ওই বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে।

আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের মতে, আদেলের ওপর আমেরিকান বাহিনীর বিশেষ নজর পড়ে ১৯৯৩ সালে সোমালিয়ায় কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’এর ঘটনায়। ওই ঘটনায় আমেরিকার ‘ব্ল্যাক হক’ হেলিকপ্টার গুলি করে নামায় সোমালিয়ায় আল কায়দার সঙ্গে যুক্ত জঙ্গিরা। ঘটনায় মৃত্যু হয় ১৮ জন আমেরিকানের। আমেরিকান গোয়েন্দাদের মতে, গোটা হামলার দায়িত্বে ছিলেন আদেল। তখন তার বয়স ছিল ৩০।

এফবিআইয়ের নথি বলছে, আদেলের গায়ের রং জলপাই। চোখের মণির রং কালো। চুলের রংও কালো। আমেরিকার ওই তদন্তকারী সংস্থাটির কাছে রয়েছে আদেলের একটি পুরনো ছবিও। মনে করা হয়, এই মুহর্তে আদেল রয়েছেন ইরানে। সেখান থেকে সংগঠনের কাজকর্ম সামলাচ্ছেন তিনি। যদিও আমেরিকার সন্ত্রাসবাদ বিশেষজ্ঞ রিটা কাটজের মতে, ইরানের জেল থেকে মুক্তি পেয়ে এখন সিরিয়ায় রয়েছেন আদেল।

সংগঠনের কাজে এক সময় মিশর ছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সুদান, সোমালিয়া চষে ফেলেছিলেন আদেল। সংগঠনে নবাগতদের প্রশিক্ষণও দিতেন তিনি। অনেকে মনে করেন, লাদেনের ৯/১১ হামলার বিরুদ্ধে ছিলেন আদেল। এমন ‘ঠান্ডা দৈত্য’-র হাতেই আল কায়দার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হতে পারে বলে অনেকের ধারণা।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শীর্ষ পদে আদেলকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যাও রয়েছে। কারণ বর্তমানে তিনি রয়েছেন ইরানে। বস্তুত ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’-এর ঘটনার পর থেকেই তিনি ইরানে রয়েছেন বলে মত আমেরিকান গোয়েন্দাদের। সেখানে তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলেও দাবি তাদের। তার নির্দেশের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে আল কায়দার তিনটি শাখা সংগঠন।

তবে অন্য সূত্রের দাবি, অপহৃত এক ইরানি কূটনীতিকের বদলে আদেলকে মুক্তি দিয়েছে ইরান। তিনি এখন পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তান এলাকায় রয়েছেন। ওই সূত্রের মতে, জাওয়াহিরি যেভাবে কাবুলে তালেবানের আশ্রয়ে ছিলেন, তা থেকেই বোঝা যাচ্ছে তালেবান ও আল কায়দার সম্পর্ক এখনও কতটা ঘনিষ্ঠ। আবার তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একাংশের। ফলে ওয়াজিরিস্তান থেকে আল কায়দা পরিচালনা করতে সুবিধে হতে পারে আদেলের।

আল-কায়দার এই সন্ধিক্ষণে আদেল ছাড়াও আরও অনেকের নাম উঠে আসছে। এদের মধ্যে রয়েছেন আবদ আল রহমান আল মাঘরিবি, ইয়াসিন আল সুরি এবং আবু আবদুল করিম আল খোরাসানির মতো নেতা। এদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আল মাঘরিবির মাথার দাম ৫৫ কোটি টাকা ঘোষণা করেছে আমেরিকা। তার ঘাড়েও সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, আল কায়দার প্রধান হওয়া মানে আসলে ‘কাঁটার মুকুট’ মাথায় তোলা। আমেরিকার কড়া নজর রয়েছে আল কায়দার ছোট থেকে বড় সমস্ত উত্থানপতনের দিকে। পাশাপাশি আইএস এর মতো সংগঠনের সঙ্গে তীব্র সঙ্ঘাতের আবহও রয়েছে। ফলে এই সময়ে ওই জঙ্গি সংগঠনে নেতৃত্বের সঙ্কট তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাদের মতে, মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকায় বহু জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। সেই সংগঠনগুলো আল-কায়দার মতো সন্ত্রাসবাদকে ‘আন্তর্জাতিক’ পর্যায়ে নিয়ে যেতে নারাজ। বরং তারা অর্থ-সময় ‘খরচ’ করে স্থানীয় ইস্যুতেই।