দেড় মাস পর ফুলেল শুভেচ্ছায় কলেজে অধ্যক্ষ স্বপন

দেড় মাস পর কর্মস্থলে ফিরেছেন নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজের লাঞ্ছিত অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) স্বপন কুমার বিশ্বাস। বুধবার (৩ আগস্ট) দুপুরে  নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে পৌঁছান তিনি।

এর আগে কলেজ গেটে অপেক্ষমাণ কয়েক শ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে বরণ করতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

সংসদ সদস্য বিএম কবিরুল হক মুক্তি, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচিন চক্রবর্ত্তী, বীর মুক্তিযোদ্ধা এসএ মতিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুর রহমান হিলু, বিছালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হেমায়েত হোসেন ফারুক, সাবেক চেয়ারম্যান আনিচুর রহমানসহ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করেন।

পরে তিনি কলেজ ক্যাম্পাস দিয়ে হেঁটে পূর্ব পাশের চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় নিজ কক্ষে প্রবেশ করেন। অধ্যক্ষের কক্ষে উপস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক আবদুস সালাম হাওলাদার, রেজিস্ট্রার মাহমুদ আল হোসেন, আইন বিভাগের পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান, কলেজ মনিটরিং ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক রফিকুল আকবরের পক্ষ থেকেও শুভেচ্ছা জানানো হয়। এ সময় নড়াইল সদর থানার ওসি (চলতি দায়িত্বে) মাহমুদুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

কলেজে প্রবেশের প্রাক্কালে অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের কাছে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ১৮ জুন কয়েকজন ষড়যন্ত্রকারী যে ঘটনা ঘটিয়েছে তা ভুলে যেতে চাই। সমাজে ষড়যন্ত্রকারীর সংখ্যা হাতেগোনা, ভালো মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। সমাজে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠিত হবেই। এ ঘটনার পর জেলা ও পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ। আজ সবাই যেভাবে আমাকে সম্মান দেখিয়েছে তাতে আমি অভিভূত। আমি নিজেকে ধন্য ও গর্বিত মনে করছি।

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘদিন পর কলেজে যোগদান করে খুব ভালো লাগছে। আমি সবার সহযোগিতা নিয়েই কলেজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করব।  সবার সহযোগিতায় এখন থেকে কলেজের সার্বিক কার্যক্রম চালিয়ে যাব। আমার দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

তিনি ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ সপরিবারে নিহতদের স্মরণ করেন।

এ প্রসঙ্গে মির্জাপুর ইউনাইটেড ডিগ্রি কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচিন চক্রবর্ত্তী বলেন, অধ্যক্ষ অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ।

নড়াইল-১ আসনের এমপি কবিরুল হক মুক্তি বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক নড়াইলে আগে কখনো এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করি। ধর্মান্ধতা এখন সমাজে ক্যানসারে রূপ নিয়েছে। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বে একই অবস্থা। আগে পাড়ায় পাড়ায় জারিগান, কবিগান হতো। এখন হয় না। এ জন্য সমাজে সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুস সালাম হাওলাদার বলেন, আমরা এসেছি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির দ্বারা নির্দেশিত হয়ে কলেজের অধ্যক্ষের আগমনকে স্বাগত জানাতে। তিনি যাতে সসম্মানে নিজ চেয়ারে বসতে পারেন সে বিষয়ে অভিনন্দন এবং সম্মান জানাতে এসেছি।’

এদিকে প্রিয় অধ্যক্ষকে কাছে পেয়ে খুশি কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

অধ্যক্ষের আগমনের প্রতিক্রিয়া জানাতে কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুক্তা বিশ্বাস, তোনিয়া খানম ও তিথি বিশ্বাস বলেন, পিতা-মাতার পরেই শিক্ষকের স্থান, শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষক একটি জাতি গঠন করেন। সেই শিক্ষকের অপমান মানে গোটা জাতির অপমান। আজ যেভাবে আমরা স্যারকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিলাম তাতে স্যারের হয়তো কিছুটা লজ্জা লাঘব হবে। আমরা চাই না এ ধরনের ঘটনা দেশের আর কোথাও না ঘটুক। আমরা অনেক আনন্দিত স্যার কলেজে আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন। তিনি আগে যেভাবে কলেজে এসেছেন, ক্লাস নিয়েছেন, হাসিখুশি থেকেছেন এখন থেকে ঠিক সেভাবেই কলেজে আসবেন এবং আমাদের মাঝে অবস্থান করবেন।

কলেজের একাদশ শ্রেণির এহসান আহম্মেদ, মেহেদী হাসান, ইব্রাহীম শেখসহ কয়েক ছাত্র বলেন, অধ্যক্ষ স্যারের আগমনে আমরা সবাই অত্যন্ত আনন্দিত। ঘটনার দিন আমরা শুরু রাহুলকে পোস্টটি ডিলিট করতে বলেছিলাম। সে তা না করায় আমরা তার বিচার চেয়েছি। কিন্তু যারা এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে অধিকাংশই তারা মাদ্রাসার ছাত্র এবং বাইরের মানুষ। কিন্তু পুলিশ কলেজের চার নির্দোষ ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা তাদের মুক্তির দাবি জানাই। ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনা হোক। গ্রেপ্তারের ভয়ে এবং আতঙ্কে অধিকাংশ ছাত্র কলেজে ক্লাস করতে পারছে না।

অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস কলেজে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে তার নিজ গ্রাম পার্শ্ববর্তী বড়কুলায় যান। সেখানে মা বনলতা বিশ্বাস, বাবা সুমন্ত বিশ্বাস, স্ত্রী এবং স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া ৩ কন্যা রয়েছেন। ১৮ জুনের পর বুধবারই প্রথম বাড়ি ফিরলেন তিনি। এ ঘটনার পর তিনি নড়াইল শহর ও শহরতলিতে বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।

প্রসঙ্গত, মির্জাপুর কলেজের এক ছাত্র ফেসবুকে ভারতের বিজেপির বহিষ্কৃত নেত্রী নূপুর শর্মাকে প্রণাম জানিয়ে  পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় ১৮ জুন সহিংস ঘটনার পর কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর দীর্ঘ ৩৬ দিন বন্ধ থাকার পর গত ২৪ জুলাই খুললেও অধ্যক্ষ কলেজে যাননি। এমনকি অধ্যক্ষ পার্শ্ববর্তী গ্রাম বড়কুলার নিজ বাড়িতেও ফেরেননি।

অধ্যক্ষ হেনস্তা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর থানার ওসি (চলতি দায়িত্বে) মো. মাহামুদুর রহমান জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা সবাই হাজতে। এর মধ্যে মির্জাপুর কলেজেরই ছাত্রই রয়েছেন চারজন। এ চারজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভিডিও ফুটেজে তাদের কর্মকাণ্ড দেখে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  অভিযুক্ত পোস্টকারী কলেজছাত্র রাহুলও হাজতে রয়েছে।