সাত মাসের ব্যবধানে আবারও পানির দাম বাড়াচ্ছে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। আবাসিক সংযোগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে (এক হাজার লিটার) ৫ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ৫ টাকা ১৮ পয়সা করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নতুন এ দাম কার্যকর করা হবে। আগামী বছর থেকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে; তাই পানির দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মকর্তারা।
এদিকে সাত মাসের ব্যবধানে আবাসিকে প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং বাণিজ্যিক সংযোগে ১৬ শতাংশ পানির দাম বাড়ানোর বিষয়টিকে অনৈতিক বলে আখ্যায়িত করছেন অনেক গ্রাহক। প্রকল্প ঋণ পরিশোধের নামে গ্রাহকদের ওপর খড়গ বসিয়ে দেওয়াটা সমীচীন হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সুধীমহল।
আবারও ওয়াসার পানির দাম বাড়ানোর খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর আশকারদীঘিরপাড় এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারিতে একবার বাড়িয়েছে, এখন সাত মাস পর এসে আবার পানির দাম বাড়ানোটা পুরোপুরিই অনৈতিক। ওয়াসা আমাদের চাহিদা অনুসারে পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ। সেখানে এ বছরে দুবার পানির দাম বাড়ানোটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার আবাসিক সংযোগ রয়েছে ৭৮ হাজার ৫৪২টি ও বাণিজ্যিক সংযোগ ৭ হাজার ৭৬৭টি। প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম হিসাবে বর্তমানে আবাসিকে ১৩ ও বাণিজ্যিকে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা করে ওয়াসাকে দিতে হয়। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে আবাসিক সংযোগের প্রতি ইউনিট পানির জন্য ১৮ ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ৩৭ টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ নতুন বর্ধিত দাম অনুসারে আবাসিকে পানির দাম ৩৮ শতাংশ এবং বাণিজ্যিকে ১৬ শতাংশ বাড়ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক দাবি করে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পানির দাম বাড়ানোর এমন অযৌক্তিক প্রস্তাব ওয়াসার কয়েক বছর ধরে দিয়ে আসছিল। এমনিতেই প্রতি বছর ওয়াসা ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়িয়েছে, এর মধ্যে সাত মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার দাম বাড়ানো এবং তাও আবাসিকের গ্রাহকদের ৩৮ শতাংশের বেশি দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। পানির দাম বাড়াতে হলে গণশুনানির প্রয়োজন আছে। প্রকল্পের ঋণের টাকা পরিশোধের খড়গ গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’ জনস্বার্থ বিবেচনায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসারও আহ্বানও জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক এএসএম শাহেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি আইন ও নির্দেশনা মেনেই পানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কেননা আগামী বছর থেকে চট্টগ্রাম ওয়াসার উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তাছাড়া বর্তমানে পানি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। সব বিষয়কে সামনে রেখে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। তবে কখন থেকে বর্ধিত দাম কার্যকর হবে, তা আমাদের এমডি স্যার জানাবেন।’
১২-১৫ শতাংশ পানি সিস্টেম লসের নামে খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পকেট ভারী করা হচ্ছে। এ অভিযোগের বিষয়ে ওয়াসার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না এ প্রশ্নের উত্তরে বাণ্যিজিক ব্যবস্থাপক বলেন, ‘একটু সময় দেন। সিস্টেম লস সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে ইতিমধ্যে ডিএমএ (ডিটেইলড মিটারড এরিয়া) সিস্টেম চালুর প্রক্রিয়া চলছে। এই ডিএমএ সিস্টেম চালু হলেই এসব রোধ হবে। পাশাপাশি সিস্টেম লসের সঙ্গে কারা জড়িত, তথ্য দেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি সরবরাহ ত্বরান্বিত করতে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি দেশের বাইরের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২৩ সাল থেকে এসব ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে পানির উৎপাদন খরচ ক্রমেই বাড়ছে। তাই পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে তা কার্যকর হবে। বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গ্রাহকদের তা জানানো হবে।’
ওয়াসা কর্মকর্তারা জানান, ২০০৯ সালে আবাসিক সংযোগে প্রতি ইউনিট পানির জন্য ৫ টাকা ৪১ পয়সা ও বাণিজ্যিক সংযোগে ১৫ টাকা ৩২ পয়সা গুনতে হতো। পরে ২০১৪ সালে বাড়িয়ে আবাসিকে প্রতি ইউনিট পানির জন্য ৬ টাকা ৯০ পয়সা, বাণিজ্যিকে ১৯ টাকা ৫৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। ২০২০ সালে আবারও বাড়িয়ে আবাসিকে পানির দাম ১২ টাকা ৪০ পয়সা, বাণিজ্যিকে ৩০ টাকা ৩০ পয়সা নেওয়া হয়। পরে চলতি বছর জানুয়ারিতে আবারও বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট পানির জন্য আবাসিকে ১৩ ও বাণিজ্যিকে ৩১ টাকা ৮২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।