শেখ কামাল ছিলেন একজন বিরল প্রতিভাধর মানুষ। তার দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অসাধারণ। ফুটবল নিয়ে আধুনিক চিন্তাভাবনা অনেক বছর আগেই করতে পেরেছিলেন। তিনি তার সংক্ষিপ্ত জীবনে যা করে গেছেন অনেক সংগঠক তা কল্পনাও করতে পারবে না। আমি নিজের চোখে দেখেছি তার ক্রীড়া দক্ষতা। নিজে ভালো বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন। জাতীয় দলে খেলার মতো দক্ষতা ছিল। ভালো ক্রিকেট খেলতে পারতেন। অ্যাথলেটিকসেও দক্ষতা ছিল। মঞ্চে দাপটের সঙ্গে অভিনয় করতেন। সেতার বাজাতেন। সেই সময় স্পন্দন নামে একটি গানের সংগঠনও তৈরি করেছিলেন। তবে শেখ কামালের সেরা সৃষ্টি আবাহনী ক্রীড়া চক্র। এই একটি ক্লাব তৈরি করে এদেশের ফুটবলে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তিনি।
ক্লাব তৈরির প্রেক্ষাপট দেখুন। দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ শেষে ঘরে ফিরেছে যুবসমাজ। অস্ত্র তাদের হাতেই ছিল। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রসমর্পণের নির্দেশ দিলেন। সবাই সেটা করল। এরপরেও তরুণ সমাজকে শৃঙ্খলিত, সৃষ্টিশীল জীবনে ফিরিয়ে আনাটা ছিল সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন যুব সমাজকে মাঠে ফেরানোর। তার নির্দেশ কার্যকর করতে প্রায় একক দক্ষতায় আবাহনী গড়ে তুললেন শেখ কামাল। আমাদের চোখে তিনি ছিলেন স্বপ্নপুরুষ। তার ধ্যান-জ্ঞান সব কিছু ছিল ক্রীড়াঙ্গন-কেন্দ্রিক। মাত্র ৫ বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শেখ কামাল চেয়েছিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে মর্যাদাপূর্ণ উচ্চতায় নিয়ে যেতে। সারা দেশে আবাহনীর শাখা-প্রশাখা তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। ফুটবলকে বাংলাদেশের প্রতিটি কোনায় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেই লক্ষ্যে আবাহনীর যাত্রা শুরু। ১৯৭৪-এ ফুটবল হকি ও ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়েই শেখ কামালের স্বপ্ন অনেকটাই সার্থক করেছিল ক্লাবটি।
এত বছর পর আমার উপলব্ধি, শেখ কামালকে নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আছে অনেক কিছু। তার কর্মকা-, পরিকল্পনা, উদ্যোগ- গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। বই আকারে কিংবা সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শেখ কামাল সম্পর্কে জানাতে হবে। ক্রীড়াঙ্গনের জন্য তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা। আবাহনী গঠনের পরে ১৯৭৪ সালে তিনি বিদেশি কোচ এনে প্রশিক্ষণের কথা ভেবেছিলেন। উইলিয়াম বিল হার্টকে নিয়ে এসেছিলেন। তার প্রশিক্ষণে আমাদের ফুটবল সম্পর্কে ধ্যানধারণা বদলে গিয়েছিল।
আবাহনীকে দিয়ে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন শেখ কামাল। আর স্পন্দন দিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ঢেউ তুলতে চেয়েছিলেন। তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের কথা মনে পড়লে এখনো অভিভূত হই। আমাকে দেখেই কাছে ডেকে বললেন, তুই কি চুন্ন? আবাহনীতে খেলবি? তার বলার আন্তরিকায় আমি খেলতে রাজি হয়েছিলাম। আমার দৃঢ বিশ্বাস শেখ কামাল বেঁচে থাকলে আমি আরও বড় ফুটবলার হতাম। যতটুকু হতে পেরেছি, সেটা ঐ এক বছর তার সন্নিধ্যে থাকার অনুপ্রেরণা। প্রথম দিকে আবাহনীতে আমি কয়েকটা ম্যাচ খারাপ খেলি। শেখ কামালের বন্ধুরা তা দেখে ঠাট্টা করে বলেছিল, ‘কারে আনলি, এ তো খেলতেই পারে না’। দূর থেকে শুনলাম, ‘জহুরী জহর চেনে...মিলিয়ে নিস ছেলেটা ভালো খেলবে।’ শেখ কামালের ওই কথাটা বলে আমাকে বদলে দিয়েছিলেন। ফুটবল মাঠে যা করতে পেরেছি- তার জন্যই।
লেখক : সাবেক ফুটবলার