হঠাৎ করেই তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে; বিশেষ করে পরিবহন খাতে অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্প, যানবাহনে ক্ষোভ-বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ করেছে মাঠের রাজনীতিতে প্রভাবশালী বিএনপি। এ কারণে দেশে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার আশঙ্কা করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পাশাপাশি সরকারের হাইকমান্ডও একই ধরনের আশঙ্কা জানিয়ে পুলিশ ও র্যাবকে সতর্ক থাকতে বলেছেন।
যেকোনো পরিস্থিতি ঠেকাতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সব মহানগর পুলিশের কমিশনার, রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), জেলার পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন ইউনিটপ্রধানদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গতকাল শনিবার অনির্ধারিত বৈঠক করেছেন বলে পুলিশ সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কেউ যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সতর্ক আছে। আমাদেরও চেষ্টা আছে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে। তারপরও কোনো মহল বা ব্যক্তি যদি নাশকতার চেষ্টা চালায় তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। তবে আশা করি কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হবে না।’
শুক্রবার প্রায় মধ্যরাতে সরকার হঠাৎ করে তেলের দাম বাড়িয়েছে। এরপর থেকেই দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচলার ঝড় বইছে। অনেক স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারের হাইকমান্ডের কাছে তথ্য এসেছে, দাম বাড়ানোকে পুঁজি করে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নাশকতা হতে পারে। ঘাপটি মেরে আছে একটি প্রভাবশালী মহল। এসব তথ্য পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর শীর্ষ কর্তারা অনির্ধারিত একটি বৈঠক করেছেন। গতকাল দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ কিছু বার্তা পাঠানো হয়েছে। ওই সব বার্তায় বলা হয়েছে, একটি মহল ফায়দা লুটতে চাইছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও তেলের পাম্পগুলো কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি যারা নাশকতা করতে না পারে তাদের ওপর কঠোর দৃষ্টি দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, তেলের দাম বাড়ায় সারা দেশেই অসন্তোষ আছে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। এটিকে পুঁজি করে কেউ কেউ বিষয়টি আরও ঘোলাটে করার পাঁয়তারা করছে। শুক্রবার রাতেই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এ নিয়ে পুলিশ-র্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যরা সতর্ক ছিলেন। পাম্পগুলোতে সাদা পোশাকধারী পুলিশ সদস্য নজরদারি করেছে। যেকোনো পরিস্থিতি প্রতিরোধ করতে ডিআইজি ও এসপিদের কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশৃঙ্খলা বা যেকোনো ধরনের নাশকতা মোকাবিলায় স্পর্শকাতর পয়েন্টে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স, দাঙ্গা পুলিশ সতর্ক আছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আর্মড পার্সোনাল কেরিয়ার (এপিসি), রায়ট কন্ট্রোল কার (আরসিসি) ও জলকামান।
পুলিশ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক অঙ্গনে গোয়েন্দা নজরদারি কয়েক গুণ বাড়ানো হচ্ছে। বোমাবাজি, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরসহ নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা-ে সরাসরি জড়িত থাকবে তাদের সার্বিক গতিবিধি জোরালো পর্যবেক্ষণে রাখবে পুলিশ। যাতে রাজনৈতিক ক্যাডার কিংবা ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা কোনো ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা চালালেই তাদের আইনের আওতায় এনে সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়। প্রয়োজনে সোর্সও নিয়োগ করছে পুলিশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আছে, সেগুলোতে কয়েক স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কয়েকটি জেলার এসপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নাশকতা হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ নিয়ে জেলার থানাগুলোর ওসি ও গোয়েন্দা টিমের সদস্যদের নিয়ে তারা গতকাল বৈঠক করেছেন। তা ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর থেকেও বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
তারা আরও বলেন, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কায় সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে জন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এবং আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে সরকারের হাইকমান্ড থেকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ইস্যু নিয়ে কোনো ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করার চেষ্টা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে। এ বিষয়টি নিয়ে আজ (গতকাল) পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারি সম্পত্তি বা পাবলিকের জানমালের ক্ষতি যদি কেউ করতে চায় তারা বরাবরের মতোই শক্ত হাতে দমন করবেন। পুলিশের সব কটি ইউনিটপ্রধানদের এমন বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা নাশকতার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। থানার ওসিদের কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।