জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেই এবার সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে মিলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন।
মিলমালিকদের দেওয়া প্রস্তাবে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮০ টাকা, এক লিটারের বোতল ২০৫ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতল ৯৬০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জুন-জুলাইয়ে দুই দফা যেটুকু কমেছিল সেটাই আবার বর্তমান দামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে।
গত ৩ আগস্ট বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি) চিঠি দিয়ে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন মিলমালিকরা। তবে ট্যারিফ কমিশন এই মুহূর্তে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে নয়।
এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিলমালিকরা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করা হবে।’ লিটারে কত টাকা বাড়তে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
গত শুক্রবার রাত ১২টা থেকে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। পরদিন রাজধানীসহ সারা দেশে গণপরিবহন একপ্রকার বন্ধই ছিল। এতে ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছে মানুষকে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেলের পর সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলে চাপ আরও বাড়বে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের কোনো সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষকে স্বস্তির সংবাদ দিচ্ছে না। নিম্নবিত্তরা যাতে স্বস্তিতে থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। করা হচ্ছে তার বিপরীত।’ সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মিলমালিকরা বলছেন, বর্তমানে দেশে ডলারের দাম অনেক বেড়ে গেছে। এ কারণে ভোজ্য তেলের আমদানি ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় করার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সহকারী প্রধান (বাজার নিয়ন্ত্রণ) মাহমুদুল হাসান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিলমালিকদের সংগঠন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেই দাম বাড়বে বিষয়টি এমন নয়। মিলমালিকরা প্রতি মাসেই সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় করার প্রস্তাব দেন।’
রোজার ঈদের পর গত ৫ মে এক লাফে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৩৮, খোলা সয়াবিন ৪৪ ও পাম তেল ৪২ টাকা বাড়ানো হয়। সে হিসাবে ১৬০ টাকা লিটারের বোতলের দাম বেড়ে হয় ১৯৮ ও খোলা সয়াবিন ১৩৬ থেকে বেড়ে হয় ১৮০ টাকা। নতুন দাম কার্যকর হয় পরদিন ৬ মে থেকে। এরপর গত ৯ জুন আবার ভোজ্য তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়। তখন এক লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম মিলগেটে ১৮০, ডিলার পর্যায়ে ১৮২ ও সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার মিলগেটে ১৯৫, ডিলার পর্যায়ে ১৯৯ ও খুচরা পর্যায়ে ২০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
পরে ২৬ জুন ও ১৮ জুলাই দুই দফায় লিটারপ্রতি ২০ টাকা কমানো হয়। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৬, বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৮৫ এবং পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৯১০ টাকা। পাম তেলের দামও এক দফা ৬ টাকা কমানো হয়। বর্তমানে পাম তেলের নির্ধারিত দাম ১৪৮ টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্থানীয় বাজারে গত এক বছরে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে (খোলা) ৪৭ শতাংশ, (বোতল) পাঁচ লিটার ৪১ শতাংশ, (বোতল) এক লিটার ৩৩ শতাংশ, পাম তেল (লুজ) ৩৯ শতাংশ এবং পাম অয়েল সুপার ৪১ শতাংশ। আর গত জুন ও জুলাই মিলে কমেছে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, ২ দশমিক ১২ শতাংশ, ৪ শতাংশ, ১৫ শতাংশ ও ১১ শতাংশ।
ভোজ্য তেল পরিশোধন ও বিপণনকারী শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি সিটি গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সয়াবিন তেল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয় করার নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমদানিতে আমাদের কত খরচ হচ্ছে, ডলারের দাম কত বেড়েছে, এসব বিবেচনা করে দাম সমন্বয় করার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।’
দেশে মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, টি কে গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত ভোজ্য তেল আমদানি ও পরিশোধন করে বাজারজাত করে। কেউ কেউ সয়াবিন বীজ আমদানি করে তেল উৎপাদন করে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব ও কয়েকটি তেল ক্রয়-বিক্রয় ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, জুলাই মাসে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দর কমে ১ হাজার ৫৩৩ ডলারে নেমে এসেছে। গতকাল বিজনেস ইনসাইডারের মার্কেট আপডেটের তথ্য বলছে, প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল গড়ে ১ হাজার ৪০৬ দশমিক ৬৫ ডলারে বিক্রি হয়েছে। ট্যারিফ কমিশন বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব ধরে দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদন বলছে, ২৩ মে’র তুলনায় ৩১ জুলাই সয়াবিন তেলের দাম ৩১ শতাংশ কম ছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সয়াবিন তেলের দাম নিয়ে ভোক্তা দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম কমলে তার সুফল পান না। কিন্তু দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি দামে কিনতে হয়।’ দেশে সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় উপযুক্তভাবে করা হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সয়াবিন তেলের মূল্য প্রস্তাব আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সয়াবিন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে এতটা বৃদ্ধি পায়নি যে মিলমালিকদের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে। দাম সমন্বয়ের জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করা প্রয়োজন।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। রমজান মাসের চাহিদা ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টন। স্থানীয় উৎপাদন হয় ২ লাখ ৩ হাজার টন। আমদানি করা হয় ১৮ লাখ টন। অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি করা হয় প্রায় ৫ লাখ টন। এছাড়া ২৪ লাখ টন সয়াবিন বীজ আমদানি করা হয়, সেখান থেকে ৪ লাখ টন অপরিশোধিত তেল হয়। অপরিশোধিত পাম তেল আমদানি করা হয় প্রায় ১১ লাখ টন।