রুশদির ওপর হামলা, তসলিমা বললেন ‘আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে’

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের শাটাকোয়া ইনস্টিটিউশনে ভাষণ দিতে গিয়ে ছুরিকাহত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত লেখক ও ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ২০ সেকেন্ডের মধ্যে ১০-১৫ বার কোপানো হয়েছে রুশদিকে। তার ঘাড়েও কোপ মারা হয়েছে।

হামলার পরপরই হাসপাতাল নেওয়া হয়ে বুকারজয়ী এই লেখককে। তিনি এখন ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার এজেন্ট অ্যান্ড্রু ওয়াইলি। তিনি জানিয়েছেন, রুশদির ‘খবর ভালো নয়’। তিনি কথা বলতে পারছেন না, সম্ভবত একটি চোখ হারাতে পারেন। তার বাহুর স্নায়ু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং লিভার ছুরিকাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বুকার পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক সালমান রুশদির ওপর ছুরি হামলার এই ঘটনায় উদ্বেগ করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

শুক্রবার রাত সাড়ে ১১ টার দিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে এক বার্তায় তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘এইমাত্র জানতে পারলাম, নিউইয়র্কে সালমান রুশদি হামলার শিকার হয়েছেন। আমি হতবাক; এমনটা ঘটতে পারে, কখনও ভাবতেও পারিনি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমে বসবাস করে আসছিলেন, এবং সুরক্ষা পেয়ে আসছিলেন সেই ১৯৮৯ সাল থেকে। যদি তার ওপর হামলা হয়, সেক্ষেত্রে ইসলামকে সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখা যে কেউই হামলার শিকার হতে পারেন। আমার দুশ্চিন্তা হচ্ছে’।

স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে নিউ ইয়র্ক শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে শাটাকোয়া ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলেন বুকারজয়ী এই লেখক। যখন তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখনই এক লোক দৌড়ে স্টেজে উঠে ছুরি নিয়ে তার ওপর হামলা চালায়।

৭৫ বছর বয়সী রুশদির ঘাড়ে ও শরীরে গুরুতর জখম হয় বলে জানায় নিউ ইয়র্ক পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হেলিকপ্টারে করে পেনসিলভানিয়ার ইরি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত স্যাটানিক ভার্সেস উপন্যাসের জন্য তিন দশকের বেশি সময় ধরে হত্যার হুমকি পেয়ে আসছিলেন এর লেখক রুশদি।

বিবিসি জানিয়েছে, এ ঘটনায় পুলিশ হাদি মাতার (২৪) নামের এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। সে নিউ জার্সির ফেয়ারভিউয়ের বাসিন্দা; একটি পাস কিনে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেছিল।

তবে ঠিক কী কারণে হাদি মাতার এই হামলা করল (হামলার মোটিভ), সে সম্পর্কে এখনও কোনো মন্তব্য করেনি নিউ ইয়র্ক পুলিশ।

বিষয়টির সমালোচনা করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ‘তিনি (রুশদি) দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ইসলামপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন এবং তাদেরই একজন তার ওপর হামলা চালিয়েছে। এ ব্যাপারটি স্বীকার করতে লোকজনের এত রাখঢাক কেন?’

আহমেদ সালমান রুশদির জন্ম ১৯৪৭ সালে মুম্বাইয়ে এক কাশ্মিরি মুসলিম পরিবারে, ভারত ভাগের ঠিক আগে আগে। ১৯৮১ সালে তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ প্রকাশিত হলে লেখক হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত রুশদির চতুর্থ উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দেয়। বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভ আর সহিংসতার মধ্যে বহু দেশে বইটি নিষিদ্ধ করে, রুশদির জন্মস্থান ভারতের সরকারই প্রথম সেই সিদ্ধান্ত নেয়।

ভারতের একটি মুসলিম পরিবারে জন্ম হলেও রুশদি নিজেকে একজন নিরীশ্বরবাদী হিসেবেই পরিচয় দেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতার একজন কট্টর সমর্থক তিনি।

১৯৮৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি এই লেখকের মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া ঘোষণা করেন। রুশদির মাথার দাম ঘোষণা করা হয় ৩০ লাখ ডলার। ইরানের সেই ঘোষণা এখনও বহাল আছে।

পরবর্তীতে ইরান সরকার খোমেনির ওই ঘোষণার বিষয়ে আর আগে না বাড়লেও সরকার সমর্থিত একটি ধর্মীয় ফাউন্ডেশন ২০২১ সালে পুরস্কারের ওই অংকের সঙ্গে আরও ৫ লাখ ডলার যোগ করার ঘোষণা দেয়।

এই লেখক ১৩ বছর বেনামে কাটিয়েছেন। প্রতিনিয়ত পুলিশি পাহারায় কার্যত ‘বন্দি’ থেকেছেন। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে ‘ছদ্মনামে’র জীবন থেকে বেরিয়ে আসেন রুশদি। গত ২০ বছর ধরে নিউ ইয়র্কেরই বাসিন্দা রুশদি।