শেষ ছবির গল্প

সেনাবাহিনীর জোয়ানরা জোরপূর্বক জিপে তুলে নেয় গোলাম মাওলাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে গিয়ে থামে জিপটি। বিষন্ন মনে জিপ থেকে নামেন ৪০ বছর বয়সী প্রখ্যাত এই ফটোসাংবাদিক। তার পেছনে রিভলভার তাক করা। দীর্ঘদিনের চেনা বাড়িটি আজ তার বড় বেশি অচেনা লাগছে। নিস্তব্ধ বাড়ি থেকে করুণ বাতাসের একটা ঝাপটা এসে তার গায়ে লাগে। নাকে এসে লাগে বারুদ আর রক্তপোড়া গন্ধ। ঘোর লাগা মানুষের মতো তিনি থমকে দাঁড়ান। জোয়ানদের চাপে বাড়ির ভেতর পা রাখতেই দেখেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন শেখ কামাল। সামনের সিঁড়িতে রক্ত। ওপর তলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসেছে রক্তের স্রোত। শুকনো রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলেন গোলাম মাওলা। সিড়ির বাঁক ঘুরতেই বড় ধাক্কা। ওপরের সিঁড়ির ঠিক তিনটা ধাপ নিচে পড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবি, চেক লুঙ্গি। পাশে পড়ে আছে ভাঙা চশমা। চেহারাটা স্বাভাবিক। কিন্তু বুকের অংশটুকু ভীষণ রকম রক্তাক্ত। বাম হাতটা নিচে ভাঁজ করা। বুলেট উড়িয়ে নিয়ে গেছে তার তর্জনী! যে তর্জনী উঁচিয়ে তিনি দিয়েছিলেন স্বাধীনতার ডাক।

ঘুমোঘোরের দুঃস্বপ্ন নয় তো; নিজের হাত-পা ছুঁয়ে দেখলেন। এরপর ১২০ মিলিমিটার রোলিকড ক্যামেরায় ফ্লাশগান লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর নীরব চেহারায় ফোকাস করতে গিয়ে তার রক্ত হিম হয়ে আসে। নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ভেজা চশমাটা মুছে নেন রুমাল দিয়ে। বহুদিনের সঙ্গী ক্যামেরাটাও আজ তার কাছে বেশ ভারী মনে হচ্ছে। কাঁপা কাঁপা হাতে ম্যানুয়েল ফোকাসে বঙ্গবন্ধুর নি®প্রাণ দেহের কয়েকটা ছবি তুললেন। ফ্লাশের আলোয় রক্তমাখা সিঁড়িতে স্পষ্ট হয়ে উঠল আলপনার রং। গোলাম মাওলার মনে পড়ে গেল এই তো কয়েক দিন আগে বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলে শেখ কামাল আর শেখ জামালের বিয়ের আনন্দে নেচে উঠেছিল বাড়িটা।

কয়েকজন জোয়ান বঙ্গবন্ধুর লাশ টপকে ওপরে উঠে গেল। গোলাম মাওলাকেও ওপরে আসতে বলল। কিন্তু কেমন করে তিনি ওপরে উঠবেন! সিঁড়িতে পড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। গোলাম মাওলার মনে শঙ্কা পার হতে গিয়ে যদি এই পবিত্র শরীরে পা লেগে যায়! উঠতে দেরি হচ্ছিল বলে ওপর থেকে একজন ধমক দিচ্ছিল। রেলিং ধরে কোনো রকমে ওপরে উঠলেন তিনি। সিঁড়ির মুখেই বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের দেহ ঘরের দেউড়ির ওপর উপুড় হয়ে আছে। কামরার মেঝেতে জমে থাকা রক্ত। এরমধ্যে কয়েকটি লাশ। বাম পাশেরটি শেখ জামালের। গ্রেনেডে তার দেহ ক্ষতবিক্ষত। সদ্য বিবাহিত রোজী জামালের হাতে তাজা মেহেদির রং। তার মুখে গ্রেনেডের আঘাত। পাশে সুলতানা কামাল। প্রচুর রক্তক্ষরণে তার চেহারা সম্পূর্ণ বিবর্ণ। তার কোল ঘেঁষে ছোট রাসেলের মরদেহ। শেখ মুজিবের ছোট ভাই শেখ নাসেরের মুখটি চেনা যাচ্ছে না। গোলাম মাওলা সবার ছবি তুলে চললেন।  

মাঝ দুপুরে সেনাবাহিনীর সেই জিপটা ১ ডিআইটি এভিনিউয়ের দৈনিক বাংলা কার্যালয়ের সামনে গিয়ে থামে। জোয়ানদের সশস্ত্র পাহারায় জিপ থেকে নামলেন পত্রিকার প্রধান ফটোসাংবাদিক গোলাম মাওলা। প্রতিদিন অ্যাসাইনমেন্ট শেষে মোটরসাইকেলে করে অফিসে ঢোকার সময় যে উচ্ছলতা, আজ তার লেশমাত্র নেই। আজ তিনি বড্ড ক্লান্ত। লিফটে ওঠার মতো শক্তি তার শরীরে নেই। ছোট্ট লিফটে ঠাসাঠাসি করে গোলাম মাওলাকে নিয়ে জোয়ানরা উঠে এলো দ্বিতীয় তলার বার্তা কক্ষে। বড় টেবিলটার ওপর ক্যামেরার ব্যাগটা রেখে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লেন তিনি। চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। ক্লান্তিতে তার চোখ বুজে আসছে।

অনুজ ফটোসাংবাদিক ওয়াসে আনসারী বাবুর ডাকে কিছুক্ষণ পর তিনি চোখ মেলে তাকালেন। ব্যাগ থেকে চারটা ফিল্ম বের করে দিলেন বাবু আনসারীর হাতে। বললেন, ‘ফিল্মগুলো ডেভেলপ আর ছবি প্রিন্ট করে ওদের দিয়ে দাও।’ গোলাম মাওলার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন যে দুজন অফিসার, তাদের চোখগুলো পাকা মরিচের মতো লাল। এমন চোখ দেখে বাবু আনসারীর অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাওয়ার দশা। একজন বাবু আনসারীকে হুংকার দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি করুন।’ সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে গেলেন বাবু আনসারী। সেখানেই দৈনিক বাংলার ডার্করুম। পেছন-পেছন অস্ত্র হাতে আসে ওই দুজনও। ডার্করুমের দরজা বন্ধ করতেই ক্ষেপে গেল ওরা। বাবু আনসারী বললেন, ‘দরজা বন্ধ না করলে ফিল্ম ডেভেলপ করা যাবে না।’ শুনে ওদের স্বর নরম হলো। বাবু আনসারী বললেন, ‘শুধু দরজা নয়, লাইটও বন্ধ করতে হবে। তা না হলে আলো লেগে ফিল্ম নষ্ট হয়ে যাবে।’ পরে ওরা বাবু আনসারীর কথা মানতে বাধ্য হলো।

ছোট্ট ডার্করুমটায় তিনজনের জায়গা হচ্ছে না। একজন অস্ত্র ঠেকিয়ে বসেছে বাবু আনসারীর পিঠে। টের পেয়ে আনসারীর গলা শুকিয়ে আসে। চারটা ফিল্ম ডেভেলপ করা বেশ সময়ের ব্যাপার। একজন বলল, ‘অন্ধকারে কী করছেন, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আর কত সময় লাগবে?’ বাবু আনসারী ওদের ধৈর্য ধরতে বললেন। তাতে তারা উসখুস করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বাবু আনসারী বললেন, ‘ফিল্ম ডেভেলপ হয়ে গেছে। এখন হাইপোতে ফিক্স করব।’ একজন বলে উঠল, ‘তাহলে লাইটটা জ্বালিয়ে দিই?’

বাবু আনসারী ‘না না’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, ‘ফিল্মগুলো ফিক্স হতে আরও মিনিট পাঁচেক সময় লাগবে।’ ফিক্সের পর লাইট জ্বালানো হলো। নেগেটিভ শুকানোর পর ছবি বানানোর জন্য রেড লাইট অন করা হলো। এতে অফিসার দুজন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। লাইট সেনসেটিভ পেপারে ছবি প্রিন্ট করে চলেছেন বাবু আনসারী। ইচ্ছে করেই কয়েকটি ছবি নিচের ঝুড়িতে ফেলে দিলেন। ওরা বলল, ‘এগুলো ফেললেন কেন?’ বাবু আনসারী বললেন, ‘প্রিন্ট ভালো হয়নি।’ ওরা বলল, ‘খারাপগুলোও দিয়ে দেন।’ ওদের যেন তর সইছিল না। বেলা ৩টার দিকে ভেজা ছবি নিয়েই ওরা চলে গেল। সপ্তাহখানেক পর ওরা আবার গোলাম মাওলাকে তুলে নিয়ে গেল। বঙ্গবন্ধুর ছবি বিদেশে প্রকাশ হয়েছে এমন অজুহাতে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে তাকে সামরিক জেরায় জর্জরিত করা হলো। যুক্তি খন্ডনের পর তিনি ছাড়া পেলেন। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এক দুঃসহ স্মৃতি।

সেদিন সাদাকালো সেলুলয়েডে গভীর আবেগে বঙ্গবন্ধুর ছবিটি ধারণ করেছিলেন গোলাম মাওলা। মিডিয়াম ফরমেট ক্যামেরার শাটার চেপে প্রিয় বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিবেদন করেছিলেন শ্রদ্ধার অর্ঘ্য। সেই অর্ঘ্যই বাঙালি মনে বঙ্গবন্ধুর শেষ স্মৃতি হয়ে রইল। ছবিটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের একমাত্র দালিলিক আলোকচিত্র। ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে আলোকচিত্রটি জাগরণ তৈরি করেছিল। বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি তুলে বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন গোলাম মাওলা। বঙ্গবন্ধু প্রায় মজা করে বলতেন, ‘আমার ওপরে এক মাওলা, নিচে আরেক মাওলা; আর মাঝখানে আমি শেখ মুজিব।’ এমনই ছিল তাদের সম্পর্কের রসায়ন।

বাবু আনসারী এখনো বেঁচে আছেন বলে এই ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ জানা গেল। গোলাম মাওলা সময় পেলেই বাবু আনসারীকে কাছে ডেকে সেদিনের সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার কথা বলতেন। ঘুমের মধ্যে তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠতেন। হাহাকারে তার জীবন বিষিয়ে উঠেছিল। কথাগুলো বলতে গিয়ে তার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠত। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মাত্র আট বছরের মাথায় গোলাম মাওলাও চলে গেলেন। এক সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে ৪৭ বছর আগের বিভীষিকাময় সেই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ৮০ বছর বয়সী বাবু আনসারীর কণ্ঠও ভারী হয়ে আসে।

দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে খবর পেলেন ঘাতকরা পঁচাত্তরের কিছু ছবি বাইরে প্রচারের চেষ্টা করছে। তিনি ছবি খুঁজতে শুরু করলেন। ১০ বছর পর তার চেষ্টা সফল হলো। এক রাতে তিনি বাংলার বাণী অফিসে গিয়ে হাজির হলেন। সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম সেলিমের রুমে বসলেন। ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর থেকে কাগজে মোড়ানো একটি নেগেটিভ বের করে দিলেন ফটোসাংবাদিক স্বপন সরকারের হাতে। বাংলার বাণীর ডার্করুমে ছবিটি প্রিন্ট করা হলো। এরপর ব্যানারে ফেস্টুনে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল ছবিটি।

লেখক : দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক।

shahadatparvezpix@gnail.com