১ টাকা আয় করতে ১২ টাকা ব্যয়!

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২২ এএম

বাংলাদেশ ডাক বিভাগে প্রচলিত ডাকসেবার ব্যবহার দ্রুত কমছে। চিঠি, নিবন্ধিত ডাক, বীমাকৃত ডাক ও মূল্য পরিশোধসাপেক্ষ (ভ্যালু পে-অ্যাবল) ডাক সব ধরনের সেবাতেই কমেছে গ্রাহক। তবে গ্রাহক কমলেও ব্যয় কমছে না। বরং প্রতি বছরই বাড়ছে। ডাক বিভাগের উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেখা গেছে, এ সময়ে তারা এই অঞ্চলে আয় করেছে ১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর জন্য তাদের ব্যয় করতে হয়েছে ১৭৩ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১ টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১২ টাকারও বেশি।

তিন বছরের আর্থিক চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলা নিয়ে গঠিত উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের আয় প্রায় স্থির থাকলেও ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সময়ে কমেছে প্রচলিত ডাকসেবার ব্যবহার। ফলে নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি ও সেবার আধুনিকায়ন ছাড়া ডাক বিভাগের আর্থিক চাপ কমানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। ডাক বিভাগ বলছে, তাদের গ্রাহকসেবা এখন আগের থেকে অনেক আধুনিক হয়েছে, কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে চিঠিসহ পণ্য। কিন্তু সাধারণ গ্রাহকরা বলছেন, এখনো গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছতে পারে না সরকারি ডাক বিভাগ, এ কারণে দুই-তিনগুণ বেশি খরচ করেও তারা কুরিয়ার সার্ভিসেই আস্থা রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।

ডাক বিভাগের উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের তিন বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে ডাক বিভাগে গ্রাহকের সংখ্যা কমছেই। আবার যে সেবা তারা দিচ্ছেন তাতে খরচের পরিমাণ বাড়ছেই। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সার্কেলটির ব্যয় ছিল প্রায় ১৫৪ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬৩ কোটি টাকায়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ১৭৩ কোটি ১ লাখ টাকা। বিপরীতে তিন বছর ধরেই সার্কেলটির আয় ১৩ কোটি টাকার আশপাশে ছিল। সার্কেলটির আয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে হয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৬ লাখ  টাকা, পরের অর্থবছরে ১৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। 

প্রচলিত ডাকসেবার ব্যবহার কমার চিত্রও স্পষ্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলে নিবন্ধিত ডাকপণ্যের সংখ্যা ছিল ৭১ লাখ ২৮ হাজার। পরের অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৪৭ হাজারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার হয়।

সবচেয়ে বেশি কমেছে সাধারণ নিবন্ধিত চিঠির ব্যবহার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ ধরনের চিঠির সংখ্যা ছিল ৬০ লাখ ৬ হাজার। দুই বছর পর তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৫৯ হাজারে। একই সময়ে নিবন্ধিত বীমাকৃত ডাক ৩ হাজার ৩০টি থেকে শূন্যে নেমেছে। মূল্য পরিশোধসাপেক্ষ (ভ্যালু পে-অ্যাবল) ডাকের সংখ্যাও ৩৪ হাজার ৬৫০ থেকে কমে হয়েছে ১৬ হাজার ৫২৮টি।

প্রচলিত ডাকসেবা থেকে আয় কমলেও উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের রাজস্বের বড় অংশ এখন আসে বিভিন্ন সংস্থার সেবা চার্জ ও কমিশন থেকে। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ডাকটিকিট বিক্রি থেকে এসেছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ডাক মাশুল থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৩২ লাখ এবং অন্যান্য সেবা থেকে এসেছে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সময়ে সব থেকে বেশি খরচ হয়েছে পেনশন ও আনুতোষিক ব্যয় খাতে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেতন বাবদ ৩৬ কোটি, ভাতা ৩৩ কোটি, সরবরাহ ব্যয় ৩৮ কোটি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়  কোটি, কল্যাণ ব্যয় হয়েছে ২৭ লাখ আর এই সময়ে সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে ১৮ লাখ টাকার।  

গত কয়েক বছর ধরেই ডাক বিভাগের সেবার মান উন্নয়ন নিয়ে নানা কথা বলা হলেও সাধারণ গ্রাহক টানতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারি এই সেবা প্রতিষ্ঠানটি। বেসরকারি কুরিয়ার সেবার ওপরই আস্থা রাখছেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহক। তুলনামূলক কয়েকগুণ বেশি খরচ করেও মানুষ কুরিয়ারেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে কম টাকায় বাড়তি সেবা দেওয়ার বিভিন্ন ঘোষণা দিলেও গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে পারছে না। আবার সরকারি এই সেবার অনেক তথ্য অনেকেরই অজানা।

রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারে থাকা একাধিক কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে যেকোনো সময় গিয়েই গ্রাহকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। অনেক সময়ই দেখা যায়, গ্রাহকরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নিজেদের চিঠি কিংবা পণ্য বুকিং দিচ্ছেন।

রাজশাহী থেকে অনলাইনে আম, মধু, ঘি ও গুড় বিক্রি করেন রায়হানুল ইসলাম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ২০ থেকে ৩০টি পার্সেল পাঠাতে হয় তাকে। তবে সরকারি ডাক বিভাগ নয়, তার ভরসা বেসরকারি কুরিয়ার। রায়হানুল বলেন, ‘ডাক বিভাগের খরচ তুলনামূলক কম হলেও সময়মতো পণ্য পৌঁছানো, ক্যাশ অন ডেলিভারি, বাসায় ডেলিভারি কিংবা ছোট শহরে দ্রুত সরবরাহের মতো সুবিধা নেই। অন্যদিকে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে অর্ডার দিলেই তারা অফিস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে নেয়। তাই খরচ বেশি হলেও কুরিয়ারেই পণ্য পাঠাই।’

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইয়ামিন বলেন, ‘আগে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ডাকযোগে পাঠাতাম। এখন কুরিয়ারে দিই। এটাই আমার কাছে আস্থার মনে হয়। আবার কোনো কারণে বিলম্ব হলে আমি এখানে এসে ম্যানেজারকে বলতেও পারি। কিন্তু ডাক বিভাগে এই দায়বদ্ধতা আমরা অনেক সময়ই দেখি না। এ ছাড়া কুরিয়ারে এক-দুই দিনের মধ্যেই পৌঁছে যায়। অনলাইনে পার্সেলের অবস্থানও দেখা যায়। এসব কারণেই কুরিয়ারেই বেশি ভরসা করি।’

এখন আমের মৌসুমের শেষ সময়। এ বছর আমের মৌসুমের শুরু থেকেই কুরিয়ারগুলোতে লাইন জমে যায় আমের কার্টনের। আম ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসগুলো বাজারে বাজারে নিজেদের শাখা করেছে। এ কারণে আম বুকিং দিতে বাইরে কোথাও যেতে হয় না। বরং তারই দোকানে এসে কার্টন নিয়ে যায়। এ কারণে আমরা এখন পর্যন্ত কুরিয়ারের বিকল্প হিসেবে ডাক বিভাগকে ভাবতে পারি না।’

অনলাইন ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ই-কমার্স ব্যবসায় দ্রুত ডেলিভারি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছে দেয়। ক্যাশ অন ডেলিভারির সুবিধাও রয়েছে। তাই ডাক বিভাগের পরিবর্তে কুরিয়ারই বেছে নিতে হয়।’

ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, প্রতিষ্ঠানটিকে কেবল লাভ-লোকসানের হিসাবে বিচার করা ঠিক হবে না। উত্তরাঞ্চলীয় সার্কেলের অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ডাক বিভাগ একটি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। রেলওয়ের মতো প্রত্যন্ত এলাকাতেও আমাদের সেবা চালু রাখতে হয়। অনেক ডাকঘর লাভজনক না হলেও জনস্বার্থে পরিচালনা করতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘অনলাইনে যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার দ্রুত কমেছে। তবে ডাকঘরের নেটওয়ার্ক, জনবল ও সেবা কাঠামো বহাল রাখতে হয়। এ কারণেই ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও ব্যয় কমিয়ে আনা এবং সেবাকে আরও যুগোপযোগী করার চেষ্টা চলছে।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রচলিত ডাকসেবার ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়ার বাস্তবতায় বাংলাদেশ ডাক বিভাগকে নতুন ব্যবসায়িক মডেলে যেতে হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘শুধু চিঠি পরিবহনের ওপর নির্ভর করে এখন আর ডাক বিভাগ টিকতে পারবে না। পার্সেল লজিস্টিকস, ই-কমার্সভিত্তিক ডেলিভারি, ডিজিটাল আর্থিক সেবা এবং অব্যবহৃত সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সেবার মান উন্নয়ন করে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে আগামী বছরগুলোতে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান আরও বাড়বে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত