পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতাল মর্গের সামনে বসে আহাজারি করতে দেখা যায় ষাটোর্ধ্ব সালমা বেগমকে। নাতি শরীফের (১৬) লাশের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। চকবাজারের দেবীদ্বারঘাটে প্লাস্টিক কারখানায় আগুনের ঘটনায় প্রাণ হারায় শরীফ। এ কিশোর বরিশাল হোটেলের কর্মচারী ছিল।
গত সোমবার দুপুরে ওই অগ্নিকা-ে শরীফসহ ছয়জন প্রাণ হারায়। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় যখন সালমা বেগমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের তখন পর্যন্ত নাতির মরদেহ পাননি। অথচ সোমবার রাতেই তার মৃত্যুর খবর পেয়ে সালমা বেগমসহ অন্য স্বজনরা কুমিল্লার চান্দিনা থেকে আসেন মর্গে।
গতকাল রাত সোয়া ৯টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কারোরই লাশ হস্তান্তর করা হয়নি। দিনভর লাশের অপেক্ষায় থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।
শরীফের দাদি সালমা বেগমের পাশেই মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন তার খালা নাসরিন বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে অপেক্ষা স্বজনদের জানান, শরীফের বাবা মিজানুর রহমান মেরুদণ্ডের রোগে আক্রান্ত। কিছুদিন আগে অপারেশন করেছেন। আর্থিক সংকটের কারণে অভাবের সংসারে কিছুটা হাসি ফোটাতে গত কোরবানির ঈদের পর দাদা কাশেমের (বরিশাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি) সঙ্গে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসে শরীফ। দিনে ২০০ টাকা মজুরিতে ওই হোটেলে কাজ শুরু করে। তার মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে।
শরীফের স্বজনদের মতোই মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বপন সরকারের লাশের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায় স্বজনদের। স্বপনের ভাই কাজল সরকারকে গড়াগড়ি করে কাঁদতে দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা আরেক ভাই রাকেশ সরকার জানান, মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে বরিশাল হোটেলে কাজ নেন স্বপন। সারা রাত কাজ করে সকালে ঘুমাতে গিয়েছিলেন তিনি। এ আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। সোমবার রাতে মর্গে এসে লাশ শনাক্ত করলেও বুঝে পাচ্ছেন না। কখন পাবেন তাও জানেন না।
আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ওই হোটেলের কর্মচারী ওসমান (২৫), বিল্লাল (৩৫), মোতালেব (১৬) ও রুবেল (২৮)। তাদের মরদেহও মর্গে পড়েছিল। শনাক্ত হয়নি বলে হস্তান্তর করা হচ্ছিল না।
চকবাজার থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) মো. শরিফুল ইসলাম গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লাশের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের স্বজনদের সঙ্গে ম্যাচিং হলে (নমুনা মিলে গেলে) লাশ হস্তান্তর করা হবে। তবে যেহেতু ছয়টি লাশই তাদের স্বজনরা শনাক্ত করেছেন সেহেতু আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সন্ধ্যার মধ্যে হস্তান্তরের চেষ্টা করছি।’
গতকাল রাত ৯টার দিকে শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘লাশ জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তারাই স্বজনদের বুঝিয়ে দেবে।’
কিন্তু মর্গে অপেক্ষায় থাকা রুবেলের ভাই মো. আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত রাত হলো, কারা লাশ দেবে কিছুই বুঝতেছি না। কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না। ভোগান্তির তো একটা সীমা থাকা উচিত।’
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. ওমর ফারুক জানান, মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সম্পন্ন হয়েছে। আরও কিছু নিয়মমাফিক কাজ আছে সেগুলো শেষ করা হচ্ছে। এছাড়া মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এ নমুনাগুলো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক টিমকে দেওয়া হবে।
আগুনের ঘটনায় প্লাস্টিক কারখানা ভবনের নিচে থাকা বরিশাল হোটেলের মালিক ফখর উদ্দিনকে গতকাল গ্রেপ্তার করেছে চকবাজার থানা পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মো. জাফর হোসেন গ্রেপ্তারের তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘ভবন মালিক ও প্লাস্টিক কারখানার মালিককে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
গত সোমবার রাত সোয়া ১২টার দিকে নিহত মো. রুবেলের ভাই মো. আলী বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় ভবন মালিক মো. রানা ও হোটেল মালিক মো. ফখর উদ্দিনসহ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বরিশাল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে হোটেলটিতে আগুন লাগে। ভবন মালিক ভবনে কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না রেখে মানুষের জীবন ও মালামাল ধ্বংস হতে পারে জেনেও বেশি মুনাফা লাভের আশায় প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক জাতীয় মালামাল গুদামজাত করার জন্য গুদাম ও হোটেল ভাড়া দেয়। যা সরকারি প্রচলিত নিয়মনীতিকে অমান্য করে অবহেলা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজের দ্বারা জীবন বিপন্নের শামিল। আর হোটেল মালিক ফখর উদ্দিন মানুষের জীবন ও মালামাল ধ্বংস হতে পারে জেনেও অগ্নিনির্বাপকের ব্যবস্থা রাখেনি।
অগ্নিকাণ্ডের স্থানে গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বরিশাল হোটেলের ফলস ছাদের ওপর ছোট্ট একটি খুপরিঘর। সেখানেই গাদাগাদি করে থাকতেন ওই হোটেলের শ্রমিকরা। ওই ঘরের ছোট্ট একটি দরজা। তবে সেটি আবার ভবনের পাশের পুরাতন জুতার সোল প্রক্রিয়াকরণ কারখানার দিকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, ওই কারখানায়ও দাউ দাউ করে আগুন জ¦লতে থাকায় খুপরিঘর থেকে কেউ বের হতে পারেনি।
ওই জুতার কারখানার ভেতর গতকাল বিকেলে গিয়ে দেখা যায়, বড় দুটি কক্ষে পুরাতন জুতা ও স্যান্ডেলের স্তূপ। সেগুলো পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এগুলো সরিয়ে ফেলতে অন্তত ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছে। কারখানাটি জুতা স্যান্ডেলের সোল মেশিনে গুঁড়ো করে।
কারখানার প্রহরী দীন মোহাম্মদ (৬০) দেশ রূপান্তরকে জানান, ঘটনার সময় কারখানাটি বন্ধ ছিল। তিনি তখন ভেতরে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে তার ঘুম ভাঙে। এ সময় চারদিকে শুধু ধোঁয়া দেখতে পান। পরে দ্রুত বাইরে চলে আসেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক দিনমণি শর্মাকে প্রধান করে সোমবার রাতেই পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দিনমণি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে কমিটির প্রধান করা হয়েছি শুনেছি। কিন্তু এখনো এ বিষিয়ে কোনো চিঠি পাইনি। আগামীকাল (আজ বুধবার) চিঠি পেলেই কাজ শুরু করব।’