জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটের সফরকে গুরুত্ব দিতে চাচ্ছে না আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটি বলছে, মিশেলের বক্তব্য একপেশে। মূলত তিনি বিএনপি ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংস্থার মিথ্যা তথ্যের ওপর বেশি ভর করেছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও মিশেলের সমালোচনা আছে দলটিতে।
তবে মিশেলের সফর আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। দলের এ পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমনটি জানা গেছে।
চার দিনের সফর শেষ করে যাওয়ার আগের দিন গত বুধবার ‘গুম’, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন মিশেল ব্যাচেলেট। তিনি এসব অভিযোগ স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের প্রস্তাব দেন।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘গুম’, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের ব্যাপারে মিশেলের বক্তব্য সরকারকে দায়ী করার মতো অবস্থান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নীতিনির্ধারকরা আরও বলেন, র্যাবের সম্পৃক্ততার ও দেশে জবাবদিহির অভাব রয়েছে জানিয়ে মিশেল কার্যত সরকারকে দোষারোপ করে গেছেন। এসবের সঙ্গে র্যাবের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলার মধ্য দিয়ে সংস্থাটির বিরুদ্ধে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা আরও বলেন, মিশেল সত্যিই মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে আসলে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ‘সিরিয়াস’ কোনো পদক্ষেপের কথা জানিয়ে যেতেন। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। তাহলে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার কোথায়? তারা যে নিজের দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে এসে বসবাস করছে সেই রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার দিচ্ছে না আ.লীগকোথায়? রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে মানবতা দেখিয়েছেন সফরে এসে তার প্রশংসাও করেননি মিশেল।
অবশ্য মানবাধিকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের অন্য মন্ত্রীরা মিশেলকে অবহিত করেছেন। মিশেল সাক্ষাৎ করতে গেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের বিষয়টি তুলেছেন। এ ছাড়া অন্য মন্ত্রীরা মিশেলকে জানিয়েছেন, এগুলো সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অংশ।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। নিজের দেশ ছেড়ে এখানে এসে যারা বাস করছে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিয়ে সংস্থাটির কেন পদক্ষেপ নেই?
আওয়ামী লীগ আশা করেছিল মিশেলের সফর সুফল দেবে। কারণ বিরোধীদের অভিযোগের উৎস ও পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে সরাসরি জানানো যাবে। কিন্তু সে রকম কিছু হয়নি বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পর্কের টানাপড়েন থাকা অবস্থায় বিভিন্ন দেশের ও সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সফরকে নিরুৎসাহিত করা উচিত। এক্ষেত্রে আরও কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য ভালো হবে। সামনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন, এর আগে বিদেশিদের এ ধরনের বিরুদ্ধ অবস্থান দলের নেতাকর্মীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলবে।
মিশেলের সফর ও বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘তারা যা বলার বলুক, যা করার করুক। আমাদের ব্যস্ততা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যস্ততা এ দেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের। আমরা সেটাই করার চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও জাতিসংঘের কাছে পজিটিভ মনোভাব আশা করি না।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর আরও দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে জানিয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর দুই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনকে মাথায় রেখে ওই মন্ত্রণালয়ে আরও দক্ষ ও টেবিল টকে পারদর্শী নেতাকে যুক্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের মোকাবিলায় রাজনৈতিকভাবে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকে সামনে নিয়ে আসা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। ওই দুই নেতা বলেন, আমাদের মন্ত্রীদের ভেতরে এখনো অনেকেই সবকিছুর সমাধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করবেন এমন মনোভাব নিয়ে বসে থাকেন। আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব-কর্তব্যটুকুও প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে দিতে চান। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তো আছেনই। তারা যেহেতু দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছেন সেটুকু তো করতেই হবে।
সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ওনারা (জাতিসংঘ) যেভাবে বলছে সেভাবে আছে বলে মনে করি না।’ তিনি বলেন, ‘দেশের কিছু সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সেই সঙ্গে বিএনপি এবং কিছু আইনজীবী অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সহযোগিতা করার জন্য এ ধরনের তথ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বিভ্রান্ত করে।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিশেল ব্যাচেলেটের বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী? সত্যিই মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করতে আসলে মিশেলের প্রথম দায়িত্ব আমাদের দেশে যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের দেশে ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা ও তাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা।’ তিনি বলেন, ‘সফরে এসে বিএনপির মিথ্যা তথ্য নিয়ে যদি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে, তাহলে আমি বলব হ্যাঁ, তারা তদন্ত করুক।’