মোমেন নামধারী হওয়ার কারণে আমি অ্যামবারাসড হচ্ছি। প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছি। কিছুকাল আগেও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত থাকা একজন সরকার-বান্ধব বন্ধু সরকারি দলের মহাসচিবের ছবি সংবলিত যুক্তিযুক্ত এক বাক্যের একটি ক্লিপ পাঠালেন। বাক্যটি হচ্ছে : ‘মোমেনের বক্তব্যে ভারতও লজ্জা পাবে।’ পত্রিকার নামও সঙ্গে আছে। একই সময়ে একটি প্রশ্নও নিক্ষিপ্ত হয় আমাকে লক্ষ্য করে ‘হোয়াট ডিড ইউ সে?’ আপনি কী বলেছিলেন?
আমিও মোমেন, কিন্তু পারতপক্ষে মুখ খুলি না। এটা ওটা লিখি। প্রশ্নটির লক্ষ্য যদি আমিই হয়ে থাকি তাহলে হয়তো বলতেন, ‘হোয়াট ডিড ইউ রাইট? আমি ভারতকে লজ্জা দেওয়ার মতো কোনো কিছু লিখিনি বরং একাধিক রচনায় এবং ‘একাত্তরের ইন্দিরা ও প্রিয়দর্শিণী’ নামের একটি গ্রন্থে জোর দিয়ে উল্লেখ করেছি ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১-এ যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন আমাদের স্বাধীনতা লাভের গৌরবময় ঘটনাটি হয়তো আরও পিছিয়ে যেত। ইন্দিরা যদি প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন তা হলে সেই পদে থাকতেন মোরারজি দেশাই কিংবা চরণ সিং কিংবা জগজীবন রাম। প্রধানমন্ত্রী পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে রামস্বামী কামরাজ কিংবা গুলজারিলাল নন্দাও ছিলেন। কিন্তু সর্বভারতীয় সমর্থনের অভাব, নিজেদের রক্ষণশীল চরিত্র আর দেশীয় সংকটের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ক্ষুব্ধ চাহনি উপেক্ষা করে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি তাদের কেউই নিতেন কি না তা নিয়ে অবশ্যই সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
আমার লিখিত কোনো কথায় লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই ভারতের। সুতরাং আমাকে ধরে নিতে হবে ‘হোয়াট ডিড ইউ সে’ সঠিক গন্তব্য, সঠিক মোমেনের কাছে পৌঁছেনি, আমার কাছে চলে এসেছে। সঠিক গন্তব্যের সঠিক মোমেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মোমেন। এটাই স্বাভাবিক যে এমন দু’চারজন থাকতে পারেন যারা ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চেনেন এবং হ্রসগুরুত্বের লেখক হিসেবে আমাকেও চেনেন। তাকেই পাঠানো একজন বিদ্বান উপদেষ্টার ই-মেইল পথ ভুলে আমার কাছে চলে আসায় সবিনয়ে জানিয়ে দিই আমি নই, মোটেও আমি নই অন্য কেউ মেইলের প্রাপক। তারপর আর ভুল ঠিকানায় মেইল আসেনি। একজন বিশিষ্ট আফতাব উদ্দিন একাধিকবার ভিন্ন ও গুরুত্বপূর্ণ মোমেনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত মেইল ভুল ক্লিকের কারণে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অন্তত কয়েকবার স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পর মেইল আসা বন্ধ হয়েছে।
নামের মিল-মাহাত্ম্য আমার জন্য প্রীতিকরই হতো যদি না পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার ‘নেইমসেক’ গণমাধ্যমে বলতেন : ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর মতো। নিশ্চয়ই তিনি অধিকতর কিংবা ‘যার পর নাই’ আন্তরিক বোঝাতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অবতারণা করেছেন। আমি যত ‘ইনোসেন্ট’ ব্যাখ্যাতেই যাই না কেন ‘নেইমসেক’-এর কারণে আমাকে তখনো শুনতে হয়েছে একবারে সরাসরি কী বলেছিলে? স্বামী-স্ত্রী? তোমার দেশের ভূমিকা কীসের স্বামীর না স্ত্রীর? সংসার জীবনে স্বামী-স্ত্রী দুজনই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিভাজ্য। মন্ত্রী নিশ্চয়ই তার প্র্যাকটিশনার। তিনি অতঃপর বাংলাদেশকে কী বানালেন ভারতের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের পুরুষ না স্ত্রী?
মন্ত্রী-টন্ত্রীদের সঙ্গে নামের মিল থাকাতে যথেষ্ট হেনস্তা হয়। দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক হলে তা অবশ্যই দ্বিপক্ষীয়, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক। চিন্তা-প্রক্রিয়ায় বিবৃতি বা পার্ভার্শন না থাকলে এমন উপমা মাথায় প্রক্রিয়াজাত হবে কেন?
আমার নাম যদি মোমেন না হতো তাহলে হয়তো দাঁত চেপে, ঠোঁট চেপে, কলমের নিব ভেঙে নিজেকে নিরস্ত করতাম।
সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কি আর সরকারের মুখপাত্র না হয়ে পারেন? সেই মুখপাত্র বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ এবং খবরের কাগজের ভাষ্য অনুযায়ী সর্বংসহা বাংলাদেশ সরকারকেও বেকাদায় ফেলেছেন। “মোমেনের বেফাস মন্তব্যে ‘বিব্রত’ সরকার”এমন শিরোনাম প্রায় সব পত্রিকাতেই। তার সাম্প্রতিক বেসামাল মন্তব্য হুবহু ছাপা হয়েছে, প্রায় সব ইলেকট্রনিক মাধ্যমই তার রেকর্ড করা বক্তব্য শুনিয়েছে। ইহকালে কোনো মন্ত্রী এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীও করেননি এমন একটি ‘অসামান্য’ কাজ করে তিনি বুক ফুলিয়ে বলেছেন, ‘আমি ভারতে গিয়ে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা আমাদের আদর্শ, তাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের দেশ উন্নয়নের দিকে যাবে এবং সত্যিকারের সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ হবে। শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, আমি ভারতবর্ষের সরকারকে সেটা করতে অনুরোধ করেছি।’ সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ও অসাম্প্রদায়িক শব্দ দুটোর কূটনৈতিক মানে ভিন্ন নাকি? তিনি অবুঝ নন। বুঝেশুনেই যে সব বলেছেন সে কথার পুনরাবৃত্তিও করেছেন। তিনি কাদের প্রতিনিধি হয়ে কী প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন সরকার নিজ শক্তিতে টিকে থাকতে সক্ষম নয়। সুতরাং ভারত এসে টিকিয়ে রাখবে? তিনি তার শক্তিশালী বার্তায় সরকারের ভাবমূর্তি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কতটা ক্ষুণœ করেছেন এটা বোঝার মতো ক্ষমতা যে তার নেই দেশের মানুষকে এর মধ্যেই ‘বেহেশতবাসী’ বানিয়ে তিনি তার প্রমাণ দিয়েছেন।
‘চায়না ফ্যাক্টর’ বলে একটা বিষয় যে আছে এবং চীনও যে বাংলাদেশকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার মতো ক্ষমতা রাখে এটি তার ‘মোমেনিক রাডার’-এ ধরা পড়ে না।
মিসরের আইনমন্ত্রী আহমদ-আল-জিন্দ অত্যন্ত আাইনসম্মত কথা বলতে গিয়ে কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি ও কিঞ্চিৎ বেফাঁস উচ্চারণের জন্য তাৎক্ষণিক চাকরিচ্যুত হয়েছেন। সাদ-আল বালাদ নামের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তিনি বলেছেন, তার সরকার আইন অমান্যকারীদের কাউকেই ছাড় দেবে না। এমনকি তিনি যদি প্রোফেট মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ... তিনি বাক্যটি শেষ করতে পারেননি। দ্রুত অসমাপ্ত কথাটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার চেষ্টাও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী খেলাটা বিরোধী দলের হাতে তুলে দিতে চাননি বলে কোনো রকম তদন্ত না করে, কোনো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন নিয়োগ না করে আইনমন্ত্রীকে বলে দিয়েছেন, বিদায় হও। আরও বেশি বিব্রত হওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য তখন আলগাকথনপ্রিয় মন্ত্রীকে গিলোটিনে পাঠানো বরং প্রশংসাই কুড়াবে।
সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ কেউ কেউ বিব্রত বোধ করলেও দলের সভাপতিম-লীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের দলের কেউ নন। সুতরাং তার বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দলের বিব্রত হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এ কথায় আশ্বস্ত হওয়া যায়, যাক দলের তো নয়। কিন্তু আশঙ্কা জাগে তিনি কোন দলের হয়ে সরকারি দলের নমিনেমন নিয়ে এমপি হয়ে মন্ত্রী হয়ে সাবোটেজ করতে শুরু করেছেন লাগাতার সাবোটেজ। সরকার বড্ড সহনশীল। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে তিনি আর দু’ধাপ এগিয়ে গেলে বিরোধী কোনো দলের মুখপাত্র না বলেই ফেলেন, আসলে তিনি তো আমাদেরই লোক। হতেও পারে সেটাই সত্য। প্রায়ই শুনি বিএনপি-জামায়াতের ঘাপটি মারা লোক! কে যে কোথায় ঘাপটি মেরে আছে!
অবশ্য উল্টো দাবিও খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে, তার মতো বস্তুনিষ্ঠ মহান স্ট্র্যাটেজিক আর কোথায় মিলবে। তিনি সরকার টিকিয়ে রাখার যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে তিনি পুরস্কৃত হওয়ার দাবিদার। একজন চিকিৎসক অ্যাক্টিভিস্ট তাকে উপ-প্রধানমন্ত্রী করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই মনের কথাই বলেছেন, তামাশা তাকে মানায় না। মন্ত্রীদের কি ননসেন্স টক করার অধিকার নেই? অবশ্যই আছে। আফটার অল তারাও তো মানুষ। আবার সরকারের ধরন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের অধিকার আছে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পদচ্যুত করার তারাও তো আফটার অল রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা মানুষ।
উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী রাজারাম পান্ডে মাধুরী দীক্ষিত-ভক্ত মানুষ। তিনি বলেই ফেললেন উত্তর প্রদেশে এমন রাস্তা বানাবেন যা দেখতে হবে মাধুরী দীক্ষিতের চিবুকের মতো। তার চিবুক চর্চা আর চলেনি। মুখ্যমন্ত্রী আর ঝুঁকি নিতে রাজি হননি। পান্ডেকে বিদায় করেছেন।
বাজে কথা বলে চাকরি হারাতেই হবে এমন নয়। সামলে নিতে পারলে সমস্যা নেই। পুনে, কানপুর ও মুম্বাই-এর সাবেক পুলিশ কমিশনার চাকরি থেকে আগাম অবসর নিয়ে রাজনীতিতে যোগ দিলেন, মন্ত্রীও হলেন। তিনি রসায়নের ছাত্র, তিনি বৈজ্ঞানিক হতে চেয়েছিলেন। ডারউইনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে সুযোগ পেলেই বলেন, তিনি কখনো কোনো বানরকে মানুষ হতে দেখেননি, তার বাবা এবং তার বাবার বাবাও দেখেননি। বিজ্ঞানীরা মন্ত্রীর বিদ্যের দৌড় নিয়ে বললেন, তিনি কী দেখেছেন জানি না, তবে আমরা মানুষের বাঁদরামি দেখেছি। মন্ত্রীর বাঁদরামি তো আর বলতে পারেন না।
আর বাংলাদেশের একজন মন্ত্রী অভিনেত্রীকে বলাৎকারের ‘ফ্রেন্ডলি থ্রেট’ দিয়ে পদ হারিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরই নিজ দলের একজন বিদ্বান প্রকৌশলী তার নাম ধরে ঘরোয়া আলাপে বললেন, তিনি তো দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর ওকাজটি করে ফেললেন।
যখনই আশপাশে কেউ শ্লেষাত্মক কণ্ঠে তার নামটি উচ্চারণ করেন, একই নামধারী হওয়ার কারণে আমি বিব্রত হই, অস্বস্তি বোধ করি। মন্ত্রণালয়ের পররাষ্ট্র সচিবের স্মার্ট নামের শেষাংশে মোমেন থাকলেও তার বিব্রত হওয়ার সুযোগ নেই, দাপ্তরিকভাবে মোটেও না।
পাদটীকা:
সত্তরের দশকে আবুল মোমেন নামের একজন মননশীল লেখকের ‘তরঙ্গিণীর মৃগয়া’ নামের একটি রচনা পড়ে এতই মুগ্ধ হই যে হাতের কাছে তার লেখা পেলে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত পাঠ্য তালিকায় সেটাই চলে আসে। সেকালে আমিও লিখতে শুরু করি আবদুল মোমেন নামে। দুটি বিখ্যাত পত্রিকায় আমার একটি উপেক্ষা করার মতো লেখায় লেখকের নাম ছাপা হয় ‘আবুল মোমেন’ এবং একইভাবে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনায় লেখকের নাম ছাপা হয় ‘আবদুল মোমেন’। ব্যাপারটা আমার জন্য লাভজনক হলেও তার জন্য যে বিব্রতকর সেটা বোঝার মতো বিদ্যে আমার ছিল বলেই বিব্রতদশা থেকে তাকে বাঁচাতে আমি এম.এ. মোমেন হয়ে যাই এবং বহু বছর পর ক্ষমা প্রার্থনা করে আমার চেয়ে ৯ বছর আগে জন্মগ্রহণ করা আবুল মোমেনকে বিষয়টা বলি।
সমস্যা হচ্ছে নামের প্যাটেন্ট রাইট, কপিরাইট এসব কিছুই নেই। আমার বাবা জানতেনও না অধ্যাপক আবুল ফজলের একজন পুত্রের নাম মোমেন এবং তার পুত্র হয়ে আমি সেই মোমেনের জন্য খ-কালীন বিব্রতাবস্থার কারণ হব। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মোমেন নামের কারণে আমি মোমেন সার্বক্ষণিক বিব্রতাবস্থায় আছি এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? নতুন দুশ্চিন্তা তিনি যদি সত্যিই উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়ে যান তা হলে নিশ্চয় পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও বিব্রতকর একথা সেকথা বলতে শুরু করবেন। আমার কি রেহাই নেই?
লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট
momen98765@gmail.com