একজন কোরআন গবেষক আফসোস করে বলেছিলেন, পৃথিবীর সব ধর্মীয় গ্রন্থ বিকৃত হয়ে গেছে; একমাত্র কোরআন মজিদই অবিকৃত অবস্থায় দুনিয়ার বুকে হেদায়েতের নুর বিলাচ্ছে। এ বিবেচনায় মুসলমানদের মতো সৌভাগ্যবান জাতি আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কথা ছিল কোরআন মজিদের আলোয় পথ চলে বিশে^র নেতৃত্ব দেবে মুসলমানরা। পৃথিবীর নানান জাতি-গোষ্ঠী কোরআনে করিমের ছায়ায় স্বস্তির-শান্তির নিশ্বাস ফেলবে। কিন্তু আফসোসের কথা, মুসলমানরা আজ কোরআন পড়ে না, কোরআন বোঝে না, কোরআন গবেষণা তো সেই কবেই বন্ধ হয়ে গেছে! তাইতো এককালে নেতৃত্ব দেওয়া মুসলিম জাতি আজ গোলামির লাঞ্ছনা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবনযাপন করছে। মূলত জীবন থেকে যখন আল্লাহ হেদায়েতের নুর ছিনিয়ে নেন তখনই বান্দার জীবনে লাঞ্ছনা-গঞ্জনার অন্ধকার নেমে আসে। সে অন্ধকার এতই কালো যে-আলো নিভে গেছে সেটিও বান্দা বুঝতে পারে না!
এ প্রসঙ্গে সুরা বাকারায় আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওদের উপমা হচ্ছে এমন ব্যক্তির, যে আগুন জ্বালাল। আগুনে চারপাশ আলোকিত হওয়ার পরই আল্লাহ সে আলো সরিয়ে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ওরা ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল। অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখার থাকল না।’ সুরা বাকারা : ১৭
কোরআন হারা বান্দার জীবনে কীভাবে দুর্দিন নামে সে চিত্র একটি উদাহরণের মাধ্যমে এঁকেছেন আল্লাহতায়ালা। আয়াতে ‘ওদের উপমা’ বলতে কোরআন হারাদের কথা বলা হয়েছে। বর্ণিত আয়াতের আলোকে, চোখ বন্ধ করে কল্পনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। কল্পনার চিত্রটি এমন, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগের মরু আরবের গভীর রাতের দৃশ্য। চাঁদহীন আকাশ। কোনো তারকা দেখা যাচ্ছে না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে একদল মানুষ ভয়ে তটস্থ।যেকোনো মুহূর্তে শত্রু আক্রমণ করতে পারে। কানে আসছে হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের গর্জন। এমন ভয়ংকর অন্ধকারে এক ব্যক্তি আগুন জ্বালালো। চারপাশ আলোয় আলোয় ভরে উঠল। সবাই খুশি। যে যার মতো রাতের কাজে মন দিল। কেউ রান্না করছে। কেউ গোছগাছ করছে। হিসাব মিলাচ্ছে কেউ। কেউ বা আবার আড্ডা জমিয়েছে। হঠাৎ দপ করে আগুন নিভে গেলে। যে যেখানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থাতেই ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেলে। অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মুখে না বললেও সবাই বুঝতে পারছে ক্ষণিকের আলোটুকু তাদের প্রতি ছিল উপহাসের। কাজ শেষ হলো না, আলোও আসছে না এক সীমাহীন যন্ত্রণায় তারা হাবুডুবু খাচ্ছে।
মোটাদাগে এই হলো আয়াতে বলা উপমার সারকথা। আসলে অন্ধকারে ডুবে থাকা ওই কাফেলা হলো তারা যারা আল্লাহর আয়াত তথা কোরআন বিশ্বাস করেনি, জীবনে বাস্তবায়ন করেনি। শান্তিও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহ দিয়েছেন কোরআন, কিন্তু ‘তারা কোরআন বাদ দিয়ে নিজেরাই জীবনের নিরাপত্তা ও শান্তির ভার গ্রহণ করেছে। এক ব্যক্তি আগুন জ্বালিয়েছে, আর তারা ওই আলোর প্রতি হুমড়ি খেয়ে পড়ল। কপাল যখন পোড়ে এভাবেই পোড়ে। তাদের জানা ছিল না, আগুন যেই জ্বালাক না কোনো, আগুনের মূল নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ আলো নিয়ে গেলেন।
কোরআন মজিদের উপমা সৌন্দর্যটি উপভোগ করার মতো। তারা জ্বালিয়েছে ‘আগুন’, আল্লাহ নিয়ে গেলেন ‘আলো’। আরবি ‘নার’ অর্থ আগুন আর ‘নুর’ অর্থ আলো। গবেষকেরা বলেন, নার তথা আগুনের ভেতর দুটি জিনিস থাকে ‘ইশরাক’ ও ‘ইহরাক।’ ইশরাক মানে নরম বা হালকা আলো। আর ইহরাক মানে তাপ। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা তাদের আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে দিলেন না, বরং আগুনের আলো নিয়ে গিয়ে তাপ রেখে দিলেন। এমনিতেই মরুভূমি, তার ওপর যদি থাকে আগুনের তাপ তাহলে কী সীমাহীন দুর্ভোগ তা চোখ বন্ধ করেই অনুভব করা যায়।
আরবি ভাষায় আলো বোঝানোর জন্য আরেকটি শব্দ আছে ‘দুউন।’ গবেষকেরা প্রশ্ন করেছেন, আয়াতে দুউন ব্যবহার না করে নুর ব্যবহার করা হলো কেন। আগেই বলেছি, আয়াতে নুর বলতে ইশরাক তথা মৃদু আলো বোঝানো হয়েছে। সূর্যের প্রথম আলো কোমল থাকে তাই আরবি ভাষায় সূর্য ওঠার পরের অল্প কিছুক্ষণকে ইশরাক বলে। সূর্যের নরম আলোয় যে নামাজ পড়তে হয় শরিয়তে তার নাম ইশরাকের নামাজ। নরম আলো শেষে আসে উজ্জ্বল বা প্রখর আলো। উজ্জ্বল আলোকে বলা হয় দুউন। ইশরাকের ওয়াক্ত শেষ হলেই শুরু হয় জোহরের ওয়াক্ত। আয়াতে আল্লাহ যদি বলতেন ‘জাহাবাল্লাহু বিদুইহিম’ অর্থাৎ আল্লাহ তাদের উজ্জ্বল আলো নিয়ে গেছেন, তাহলে বোঝা যেত এখনো ক্ষীণ বা কোমল আলোটুকু রয়ে গেছে। কিন্তু ‘আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো, যারা কোরআন মজিদের নুর বাদ দিয়ে নিজের মনগড়ায় আলোয় পথ চলতে চায়, তাদের জন্য আগুনের উত্তাপ ও যন্ত্রণা ছাড়া আলোর ছিটে ফোটাও অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে নুর শব্দটিই এখানে যথার্থ দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে।
ভাবনার বিষয়, একদল মানুষ শান্তিও নিরাপত্তার জন্য আগুন জ্বালিয়ে পেল তাপ ও যন্ত্রণা, অন্যদিকে হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের বিনিময়ে আগুনের ভেতর পেলেন ফুলের বাগান। এ দুটি ঘটনা পৃথিবীবাসীর সামনে একটি সহজ সত্য তুলে ধরে। দুনিয়ার মানুষ সুখ, শান্তিও নিরাপত্তার জন্য উপকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়, কিন্তু ‘প্রকৃত সুখ শান্তি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আমরা মনে করি, অর্থবিত্ত, প্রাচুর্য, সুখ-শান্তির চাবিকাঠি। ভালো বেতন-ভালো চাকরি, দামি গাড়ি এসব থাকা সত্ত্বেও বান্দার জীবনে সুখ নামক পাখিটি অধরা থেকে যেতে পারে যদি তার ভেতর আল্লাহর নুর তথা আল্লাহ, আল্লাহর রাসুলের প্রেম না থাকে। আবার দিন আনে দিন খায় এমন গুরুত্বহীন মানুষটিও চরম সুখে চোখ বন্ধ করলেই ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতে পারে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা না থাকা এই দিনমজুর আমাদের চোখে বোকা হলেও খোদায়ি আলোয় পথ চলে ঠিকই সে আখেরাতের সম্বল গুছিয়ে নিচ্ছে।
তাইতো ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘কোরআনের আলোহীন মানুষগুলোর দুনিয়া হয়তো কিছু সময়ের জন্য আলোকিত মনে হয়, মানুষের কাছে তারা মর্যাদা পায়, বাহ্যিক নিরাপত্তাও ভাগ্যে জুটে, কিন্তু ‘মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের কবর অন্ধকারে পূর্ণ হয়ে যায়। সে অন্ধকার হলো কুফরের অন্ধকার, নিফাকের অন্ধকার, বদ আমলের অন্ধকার, অন্যের হক মেরে খাওয়ার অন্ধকার। এ জন্যই মহান আল্লাহ নুর বা আলোর ক্ষেত্রে একবচন ব্যবহার করলেও অন্ধকারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন জুলুমাত বা বহুবচন। অর্থাৎ বান্দা যখন এক আল্লাহর এক আলো বাদ দিয়ে দেয়, তখন সে হাজার অন্ধকারে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকে। এভাবেই মানুষ পথভ্রষ্ট হয়। তাই কোরআনের আলো জরুরি মানব জীবনে।