একটা সমাজ কতটা উন্নত, কতটা সংবেদনশীল সেটা বোঝা যায় শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। শিশুর প্রতি আচরণ আর পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও কাঠামোর ব্যবস্থা দেখে। বিশেষত শিশুর সুস্থ্য-সুন্দর-স্বাভাবিক বিকাশের বিষয়টি যেকোনো উন্নত সমাজে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে মুখে আমরা ‘শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ’ বলে গেলেও শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ নিয়ে আমাদের মনোযোগ কম। অন্যদিকে, যে কর্মজীবী মা-বাবারা শিশুর বিকাশে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও পেশাগত জীবনের কারণে শিশুদের লালন-পালনে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না, তাদের কষ্টের শেষ নেই। একদিকে কর্মক্ষেত্র, অন্যদিকে নিজের শিশুর যথাযথ লালন-পালন-শিক্ষার প্রশ্ন। খেয়াল করা জরুরি, অফিস সময়ে শিশুসন্তান কোথায় কার কাছে কীভাবে থাকবেএই প্রশ্নের সমাধান করতে না পেরেই অনেক নারীকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এক্ষেত্রে সন্তান লালনের ভার নারীর ওপরই বর্তায়, পুরুষের ওপর নয়। অথচ এটা কেবল কর্মজীবী নারীর সংকট নয়, কর্মজীবী পুরুষেরও। কিন্তু হাতের নাগালে মানসম্মত শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকলে এই সংকটের একটা আপাত সমাধান মেলে। শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র তাই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি কর্মজীবী নারী-পুরুষের পেশাগত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মনোযোগের জন্যও জরুরি।
দুঃখজনক বিষয় হলো, দেশে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের গতি অনেক বাড়লেও কর্মজীবী নারী-পুরুষদের প্রয়োজন মেটাতে শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্রের সংখ্যা নিতান্তই যৎসামান্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় নগর-শহরগুলোতে এবং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কর্মরত। এমন নারীদের মধ্যে কেবল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের জন্য ১৯৯১ সাল থেকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করছে। মোট ১১৯টি শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্রের মধ্যে রাজস্ব খাতে থাকা ৪৩টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের আসনসংখ্যা ২ হাজার ৮৩০। এ ছাড়া শিশু একাডেমির মাধ্যমে জাতিসংঘ শিশু তহবিলের অর্থায়নে বেসরকারি সংগঠন ফুলকি ৪০টি কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এর বাইরেও ব্যক্তি উদ্যোগে আরও বেশকিছু শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে দেশে। শিশুকে নিরাপদে রাখার জন্য শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র একটা ভরসার জায়গা। একটি আদর্শ কেন্দ্রে শিশুদের মাতৃস্নেহে লালন-পালন ও শারীরিক-মানসিক বিকাশের জন্য শিক্ষা, খেলাধুলা, বিনোদন, সুষম খাবার ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ কেন্দ্রই বেহাল।
অন্যদিকে, শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্রের ভৌত অবকাঠামো এবং নিয়মনীতি কেমন হবে সে বিষয়ে সরকারি দিকনির্দেশনা না থাকায় যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে এ-জাতীয় অনেক কেন্দ্র। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতে ‘শিশু-দিবাযত্ন বিধিমালা ২০২২’ চূড়ান্ত করেছে সরকার। তাতে ২১টি শর্ত দেওয়া হয়েছে। নতুন এ বিধিমালার শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে উদ্যোক্তাকে কমপক্ষে এইচএসসি পাস হতে হবে ও শিশু-দিবাযত্ন বিষয়ে তার প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। এ ছাড়া উদ্যোক্তার অবশ্যই ১০ লাখ টাকার ব্যাংক-সচ্ছলতা থাকতে হবে; ভৌত অবকাঠামো চারতলার বেশি হলে লিফট থাকতে হবে; ভবনে লিফট থাকলেও সাততলার ওপরে কোনো কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে না; কেন্দ্রের সর্বনিম্ন আয়তন ৩ হাজার বর্গফুট হতে হবে, যেখানে প্রত্যেক শিশুর জন্য ৫০ বর্গফুট জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কেন্দ্রে শিশুর ভর্তির সময় সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা নেওয়া যাবে, কিন্তু মাসিক ৩ হাজার টাকার বেশি ফি নেওয়া যাবে না। ব্যক্তিমালিকানাধীন কেন্দ্রে ভর্তি-ফি ৫০০ ও মাসিক ৫ হাজার টাকা ফি নেওয়া যাবে। প্রস্তাবিত আইনানুযায়ী শিশুর জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হলে, কর্তব্যে অবহেলা ও শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হলেও সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত জেল-জরিমানা ভোগ করতে হবে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি কেন্দ্রগুলোতে যেমন মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা নেই, তেমনি বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো যে যার মতো টাকা আদায় করলেও সেগুলোও নানা অনিয়ম-অবহেলায় ভরা। কেন্দ্রগুলো কেবল কয়েক ঘণ্টার জন্য শিশুকে রাখা ছাড়া শিশুর শারীরিক-মানসিক বিকাশ, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়াতে কোনো কাজ করে না। শিশু পরিচর্চায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে এমন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকজনও রাখা হয় না। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই, স্বাস্থ্যকর পরিবেশও নেই। ফলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগামী দিনের জন্য সুনাগরিক গড়তে হলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই শিশুর বিকাশে আরও দায়িত্ব নিতে হবে। এক্ষেত্রে ভালোভাবে শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করার জন্য সরকারিভাবে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি ভালো শিশু-দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ প্রণোদনা দিলে অন্যরা উৎসাহিত হবে। আমরা যেন ভুলে না যাই‘আজ যে শিশু/পৃথিবীর আলোয় এসেছে/আমরা তার তরে একটি সাজানো বাগান চাই।’