কোরআন মজিদ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে, মানুষ যেন চিন্তাভাবনা করে, শোনে, মনোযোগ দেয়, তুলনা করে বা পরিমাপ করে, ভাবে, বুদ্ধি ও বিবেকের চর্চা করে, বিচার-বিবেচনা করে সর্বোপরি মেধাকে কাজে লাগায়। যারা চিন্তাশক্তি, মেধা ও মননকে কাজে লাগায় না তাদের তিরস্কার করা হয়েছে কোরআনে করিমে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। এরা পশুর মতো; বরং তাদের চাইতেও অধম! তারা চরম গাফিলতির মধ্যে হারিয়ে গেছে।’ সুরা আরাফ : ১৭৯
বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই শ্রেণির লোকেরা কিছুই বোঝে না, কোনো কিছু দেখে না এবং শোনে না। অথচ বাস্তবে এরা পাগল নয় যে, কিছুই বুঝতে পারে না। অন্ধও নয় যে, কোনো কিছু দেখে না, কিংবা বধিরও নয় যে, কোনো কিছু শোনে না। প্রকৃতপক্ষে তারা পার্থিব বিষয়ে অধিকাংশ লোকের তুলনায় অধিক সতর্ক ও চতুর। আয়াতে তাদের কথা বলার উদ্দেশ্য, এই শ্রেণির লোকদের যা উপলব্ধি করা উচিত ছিল তারা তা করেনি, যা দেখা উচিত ছিল তা তারা দেখেনি, যা কিছু তাদের শোনা উচিত ছিল তা তারা শোনেনি। আর যা কিছু বুঝেছে, দেখেছে এবং শুনেছে, তা সবই ছিল সাধারণ জীবজন্তু‘র পর্যায়ের বোঝা, দেখা ও শোনা, যাতে গাধা-ঘোড়া, গরু-ছাগল সবই সমান।
এ জন্যই আয়াতের শেষাংশে এসব লোক সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘এরা চতুষ্পদ জীব-জানোয়ারের মতো’ শুধুমাত্র শরীরের বর্তমান কাঠামোর সেবায় নিয়োজিত। খাদ্য আর পেটই হলো তাদের চিন্তার সর্বোচ্চ স্তর। অতঃপর বলা হয়েছে, ‘তারা চতুষ্পদ জীব-জানোয়ারের চেয়েও নিকৃষ্ট।’ কারণ চতুষ্পদ জীব-জানোয়ার শরিয়তের বিধি-নিষেধের আওতাভুক্ত নয় তাদের জন্য কোনো শাস্তি কিংবা দান-প্রতিদান নেই। তাদের লক্ষ্য যদি শুধুমাত্র জীবন ও শরীর-কাঠামোতে সীমিত থাকে তবেই যথেষ্ট। কিন্তু ‘মানুষকে যে স্বীয় কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। সেজন্য তাদের সুফল কিংবা শাস্তিভোগ করতে হবে। কাজেই এসব বিষয়কেই নিজেদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বলে সাব্যস্ত করে বসা জীবজন্তু‘র চেয়েও অধিক নির্বুদ্ধিতা। তাছাড়া জীব-জানোয়ার নিজের প্রভু ও মালিকের সেবা যথার্থই সম্পাদন করে। পক্ষান্তরে অকৃতজ্ঞ মানুষ স্বীয় মালিক, পালনকর্তার আনুগত্যে ত্রুটি করতে থাকে। এ কারণে তারা চতুষ্পদ জানোয়ার অপেক্ষা বেশি নির্বোধ ও গাফেল। কাজেই বলা হয়েছে, ‘এরাই হলো প্রকৃত গাফেল।’
ইসলাম শিক্ষা দেয়, মানুষের যাবতীয় জ্ঞানের উৎস হচ্ছে অহি। আর আল্লাহতায়ালা কোরআনের জ্ঞান প্রদানের জন্য মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। অন্যদিকে হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বয়ং আল্লাহ শিক্ষাদান করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে চিরন্তন ও শাশ্বত নৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা, ভালোমন্দ নির্ধারণের ক্ষমতা অর্জন, পরিবেশের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল ও প্রযুক্তি গত দক্ষতা অর্জনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার নাম শিক্ষা।
শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষাব্যবস্থা জ্ঞানার্জনের আঙিনা। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া জ্ঞান পরিপূর্ণ হয় না। ইসলাম তাই পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জনের কথা বলে। কোরআন মজিদ একটি বিজ্ঞানময় গ্রন্থ। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই মুসলমানরা কোরআনে করিমের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। নবী মুহাম্মদ (সা.) শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর জাগরণের সৃষ্টি করেন, যার ফলে পরবর্তীকালে মুসলমানরা শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হয়। তিনি সমগ্র দুনিয়ার জন্য সেরা নমুনা উপস্থাপন করেছেন। সাফা মারওয়ার পাদদেশে অবস্থিত ‘দারুল আরকাম’ ছিল নবী করিম (সা.)-এর সাহাবিদের জ্ঞানার্জনের জন্য নির্ধারিত স্থান, মুসলিম উম্মাহর প্রথম শিক্ষালয়। শিক্ষা গ্রহণের জন্য হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো বয়স ও সময়কে সীমাবদ্ধ করেননি। জীবনব্যাপী মানুষ জ্ঞান চর্চায় আত্মনিয়োগ করবে এটাই মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা।
মদিনায় প্রিয়নবী (সা.) নারীদের শিক্ষাদানের জন্যও একটি সময় নির্দিষ্ট করেন। নবীর স্ত্রীরা ছিলেন নারীদের প্রশিক্ষক। মদিনায় হিজরতের পর নির্মিত মসজিদে নববিতে রাসুল (সা.) একটি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন। যা ‘সুফফা’ নামে পরিচিত। নবী করিম (সা.) স্বয়ং ছিলেন এর শিক্ষক এবং সাহাবায়ে কেরামের শিক্ষা প্রদানে তিনি একটি উল্লেখযোগ্য সময় এখানে ব্যয় করতেন।
আসহাবে সুফফার অন্তর্ভুক্ত শিক্ষার্থী জ্ঞানপিপাসু সাহাবায়ে কেরামরা প্রত্যেকেই প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি, হাদিস শাস্ত্র, কেরাত, আধ্যাত্মিক সাধনা, ফিকাহ, সামরিক বিজ্ঞান ইত্যাদি কোনো না কোনো বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেন। তারা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে যে শিক্ষা পেতেন, দূর দূরান্তে গিয়ে মানুষের মধ্যে সেই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতেন। সুফফার শিক্ষার্থীরা অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে পবিত্র কোরআন ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের চেষ্টা করতেন। পাশাপাশি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে থেকে তার জীবনের খুঁটিনাটি সব দিক প্রত্যক্ষ করে তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতেন।
পরবর্তী সময়েও দেখা যায়, মুসলমানরা বহুযুগ ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা একই সঙ্গে নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন আবার জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। কোরআনের বিজ্ঞানময়তার কারণে মুসলমানদের শিক্ষা, গবেষণা এবং আবিষ্কার খুলে দিয়েছিল আধুনিক সভ্যতার দ্বার। মুসলমানরাই বিভিন্ন ভাষা থেকে বিভিন্ন বিষয়ের মৌলিক বইসমূহ আরবিতে অনুবাদ করে জ্ঞান-ভা-ার সমৃদ্ধ করেছিলেন। মুসলমানদের প্রণীত ও চর্চিত শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস প্রকৃত অর্থেই গর্ব করার মতো এবং অনুসরণীয়।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হলেন উভয় জগতের জন্য একজন পরিপূর্ণ আদর্শ। তার পাঠদান কৌশলও ছিল অসাধারণ। যা শিক্ষক সমাজের জন্য অনুকরণীয়। উপযুক্ত পরিবেশে শিক্ষাদান, শিক্ষাগ্রহণে মনোযোগ আকর্ষণ, দরদি ও দয়ার্দ্র, কোমলতা প্রদর্শন ও কঠোরতা বর্জন, গুরুত্বপূর্ণ কথার পুনরাবৃত্তি, থেমে থেমে পাঠদান, ভাষা ও দেহভাষার সমন্বয়, গল্প বলার মিষ্টি ভঙ্গি, শিক্ষার্থীর কাছে প্রশ্ন করা, বিষয়বস্তু‘র গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা, আগ্রহী শিক্ষার্থী নির্বাচন, উপমা দিয়ে বোঝানো, প্রশ্ন গ্রহণ এবং প্রশ্নের জন্য প্রশংসা করা, ভালো কাজের জন্য পুরস্কার দেওয়া, নিজের ব্যবহারিক চরিত্র ও আমলের মাধ্যমে শিক্ষাদান, বিবেকের মুখোমুখি করা, বারবার পাঠে উদ্বুদ্ধকরণ, আশা ও ভয়ের মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি, মুক্ত আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিক্ষাদান, গুরুত্বপূর্ণ কথার পুনরাবৃত্তি, ভুল সংশোধনের মাধ্যমে শিক্ষাদান, শাস্তিদানের মাধ্যমে সংশোধন, অজানা বিষয়ে উত্তর না দেওয়া, ইত্যাদি ছিল তার শিক্ষাদানের কৌশল।