আলোর ফোয়ারায় জীবনের রহস্য

আলো-অন্ধকার, কালো-ভালো মিলিয়ে মানুষের জীবন। তবে মুমিনের জীবন শুধুই আলোয় পরিপূর্ণ। যেখানে অন্ধকারের লেশমাত্র নেই। আলোর ফোয়ারায় মুমিন জীবনের রহস্য সম্পর্কে কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘যারা ইমান এনেছে, আল্লাহ তাদের অভিভাবক। তাদের তিনি বের করে আনেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে। আর যারা কুফরি করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদের আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোজখের অধিবাসী, চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।’ সুরা বাকারা : ২৫৭

আরবি মুমিন শব্দ এসেছে ইমান থেকে। ইমান অর্থ বিশ্বাস। মুমিনরা বিশ্বাসী, আর বিশ্বাসীরা নুরানি। জীবনের প্রতিটি বাঁকে তারা নুরের পথে চলে। তাদের প্রতি কাজে নুরের ছোঁয়া থাকে। বিপরীতে যারা অবিশ্বাসী, সন্দেহবাদী, কোরআন মজিদ তাদের কাফের ও মুনাফিক বলেছে। উপরোক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ এটা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন।  অবিশ্বাসী-সন্দেহবাদীরা কীভাবে আলোর ফোয়ারা থেকে অন্ধকারের গর্তে ঘুরতে থাকে তা বড় মজার ঘটনা। সুরা বাকারার ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের অবস্থা সে ব্যক্তির মতো, যে লোক কোথাও আগুন জ্বালাল এবং তার চারদিককার সবকিছুকে যখন আগুন স্পষ্ট করে তুলল, ঠিক এমনি সময় আল্লাহ তার চারদিকের আলোকে উঠিয়ে নিলেন এবং তাদের অন্ধকারে ছেড়ে দিলেন। ফলে, তারা কিছুই দেখতে পায় না।’ সুরা বাকারা : ১৭

বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় এলেন, তিনি মদিনাবাসীর সামনে ইমানের আলো জ্বালালেন। মদিনার ইহুদিরা আগে থেকেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানতেন। তারা ইমান আনল। ইমানের আলোয় তারা হালাল-হারাম, ভালো-মন্দ, আলো-অন্ধকার চিনল। পরে তারা কুফরি করল এবং হারাম, মন্দ আর অন্ধকার বেছে নিল। তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘চারদিক আলোকিত হওয়ার পর তাদের থেকে অন্ধকার ছিনিয়ে নেওয়া হলো।’ তাফসিরে মাজহারি

আসলে আল্লাহতায়ালা এমনি এমনি কাউকে অন্ধকারের গর্তে ফেলেন না। প্রথমে বান্দাকে সুযোগ দেন। আলোর ফোয়ারা তার সামনে উদ্ভাসিত করেন। বান্দা যদি ইমানের নুর জীবনে ধারণ করতে পারে তাহলে তার দুনিয়া-আখেরাত কামিয়াব। আর যদি আলো দেখে সে বিরক্ত হয়, অসহ্য মনে করে, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় অন্ধকারের গহিনে। তখন সে আর কিছুই দেখে না। সন্দেহকেভাবে প্রজ্ঞা, বিশ্বাসকে মনে করে বোকামি! হারামকে ভাবে মজা, মন্দকে ভাবে ভালো!

মহাকবি শেখ সাদি বলেছেন, কারও অন্তর যখন আবরণ পড়ার কারণে কলুষিত হয়ে যায়, তখন বাদুড়ের মতো আলো তার অসহ্য লাগে। বাদুড় যেমন সূর্যকে অভিশাপ দেয়, তেমনি এমন শ্রেণির হতভাগারা ইমান, ইসলাম, হালাল ইত্যাদি নেক আমলকে সেকেলে-কুসংস্কার-অন্ধবিশ্বাস বলে ঘাড় ফিরিয়ে নেয়। অথচ বাদুড় যেমন অন্ধকারে থেকে বিশাল আলোর জগৎ সম্পর্কে কিছুই জানে না, তেমনি এমন লোকও গোমরাহির আঁধারে ডুবে আলোর ঝরনার রিনঝিন আনন্দ উপলব্ধি করতে পারে না। এক ব্যক্তি অল্পে তুষ্ট। বিশাল বাড়ি, দামি গাড়ি না হলেও তার মুখে তৃপ্তির হাসি লেগে থাকে। অন্যদিকে খোদার নুরহারা এমন মানুষের বিলাসী জীবন, অঢেল সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তার কপালের ভাঁজ এক মুহূর্তের জন্যও মিলিয়ে যায় না। গভীর রাতে ইমানের নুর নিয়ে অল্পে তুষ্ট বান্দা যখন তৃপ্তির ঘুমে বিভোর, অতৃপ্ত আলোহীন কালো মানুষ তখন হরেক নেশায় বেঘোর। বস্তুত জীবন থেকে খোদাই নুর চলে গেলে এমনই হয়। সব থেকেও তখন মানুষের কিছুই থাকে না।

শুধু যে দুনিয়াতেই তারা আলোহীন জগতের বাসিন্দা তা নয়, আখেরাতেও অন্ধকার তাদের পিছু ছাড়বে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘দুনিয়ায় যারা আলোহীন ছিল, আখেরাতে তারা আরও বেশি অন্ধ ও পথহারা হবে।’ সুরা বনি ইসরাইল : ৭২

অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘আর যে আমার কোরআনের আলো থেকে দূরে সরে যাবে, তার জীবন হবে অর্থহীন এবং মহাবিচার দিবসে তাকে তোলা হবে দৃষ্টিহীনরূপে। সেদিন সেই পাপিষ্ঠ বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি তো পৃথিবীতে চক্ষুষ্মান ছিলাম, কেন আমাকে অন্ধরূপে ওঠালে? আল্লাহ বলবেন, তুমি তো চোখ থাকতেও অন্ধের মতো ছিলে। কোরআনের নুর তোমার কাছে এসেছিল কিন্তু তুমি তার প্রতি ফিরে তাকাওনি। তাই আজ তোমাকে অন্ধরূপে ওঠানো হলো।’ সুরা ত্বহা : ১২৪-১২৬