জনবলের দক্ষতা
মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রুনি। এই সাংবাদিক দম্পতি ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নিজ বাসায় খুন হন। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের পর মামলা হলে শুরু হয় তদন্ত। প্রথমে তদন্ত শুরু করে শেরেবাংলা নগর থানা-পুলিশ। চার দিনে তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হলে দায়িত্ব পায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। দুই মাসের বেশি সময় ধরে তদন্ত করে তারাও ব্যর্থ হয়। পরে ২০১২ সালে ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশে র্যাবের হাতে তদন্ত ভার তুলে দেওয়া হয়। আজও র্যাব তদন্ত করে চলেছে। মাঝে দশ বছর পার হয়ে গেছে এবং ২৪ আগস্ট ২০২২ এখন পর্যন্ত সর্বশেষ দফায় ৯১তম বারের মতো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়েছে। এই এক দশকে সবাই তদন্তভার গ্রহণ করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের আস্ফালন করেছিলেন। এমনকি মন্ত্রীও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রহস্যের সমাধানের অঙ্গীকার প্রকাশ করেছিলেন। সাংবাদিকদের মতো শক্তিশালী পেশাজীবীদের আন্দোলন-সংগ্রাম সাগর-রুনিকে ন্যায়বিচার দিতে পারল না।
সাগর-রুনি হত্যার ১০ বছর পার হলেও বিচারের জন্য সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ জোরদার আন্দোলন আমরা দেখিনি। সাংবাদিকরা যদি রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভক্তি ভুলে ঐক্য তৈরি করতে পারেন তাহলেই একমাত্র বিচার প্রাপ্তিতে সময় কমার সম্ভাবনা আছে। তা না হলে র্যাবও হয়তো রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হবে। এরপর আবার জনগণকে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে তার পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। তবে যেভাবে তদন্তকার্যক্রম চলমান তাতে বিশ্বাস করা যায় জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে যখন তদন্ত শেষ হবে তখন বিচার চাওয়ার কেউ থাকবে না।
জনবলের দায়বদ্ধতা
দেশে হঠাৎ করে বিদ্যুতের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাস আর ডিজেল সংকটের কারণে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ ঘাটতি হবে, কোন সেক্টরে কত বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় এসব কোনো তথ্য না নিয়েই সরকার এক সপ্তাহের জন্য পালাক্রমে এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকারি নির্দেশ মোতাবেক বিদ্যুৎ বিভাগ শিডিউল প্রকাশ করেছে ২ ঘণ্টা লোডশেডিং করার। কিন্তু প্রকৃত বিচারে লোডশেডিং ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। গত ২২ জুলাই ২০২২, পাঁচবারে প্রায় ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং উপভোগ করতে হয়েছে আমাদের। শহরের বিদ্যুৎ যদি এমন আসা-যাওয়া করে তবে গ্রামের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। সরকার হয়তো রাজধানীর মানুষের জন্য লোডশেডিংয়ের কথা বলেছে আর কর্তৃপক্ষ মনে করেছে সারা দেশের কথা বলেছে। সরকার রাজধানীর বাইরে বসবাসকারী জনগণকে খুবই ভালোবাসে কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা জানে না তাই অতীতের খাম্বা বিদ্যুতের মতো লোডশেডিংয়ের সমস্যাও তারা দেখছে না।
সাধারণ জনগণ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করছে তথ্য-উপাত্ত না সংগ্রহ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে তার দায় নেওয়ার যেন কেউ নেই। যদিও সবাই জানে সত্যিকার অর্থেই দেশে জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার কোনো বালাই নেই। বর্তমান সরকার বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য লাখো কোটি টাকা ব্যয় করায়, উৎপাদন; চাহিদার দ্বিগুণ হওয়ার পরও আজকের লোডশেডিং। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হলে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতো না। সবাই স্বপ্ন দেখার পথে হাঁটলে এর চেয়ে ভালো কী হতে পারে? কিন্তু প্রশ্ন জাগে এখন কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ গেল কোথায়? আজ বলতে চাই, আবাসিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও শিল্পে গ্যাস ব্যবহার করা হোক।
জনবলের জবাবদিহি
বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার সর্বত্র কৃচ্ছ্রসাধনের অবস্থান জানিয়েছে। সবাইকে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে রাশ টানার ঘোষণা দিয়েছে। সরকার নিজের দৃঢ় অবস্থানের কারণে যেভাবে করোনা মহামারি মোকাবিলা করেছে, সে সরকারই যখন এখন কৃচ্ছ্রসাধন চাইছে, তখন এ ব্যাপারে প্রশ্ন করার কোনো জায়গা আছে বলে মনে হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখতে বলেছে, না হলে জেল-জরিমানা-বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর্যন্ত ব্যবস্থা করা হয়েছে। সর্বত্র এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। এমনকি কর্মকর্তাদের ড্রেসের ব্যাপারেও অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আইন তো সবার জন্য সমান নয়। তাই অনুরোধ-আদেশ-নির্দেশও সবার জন্য সমান হতে পারে না। আর সরকার চায় উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা যেকোনো অবস্থায় চলমান থাকুক। এই চাকা চলমান রাখতে প্রধান হাতিয়ার কৃচ্ছ্রসাধন। কৃচ্ছ্রসাধনের এ মহান দায়িত্ব অবশ্যই সাধারণ মানুষের ওপর। কারণ ক্ষমতার বলয়ে থাকা মানুষরা দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে কি নিশ্চুপ বসে থাকতে পারে? এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয় সরকারের কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের কথা। সারা বছর ধরে প্রশিক্ষণের নামে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের নামে, প্রকল্পের যন্ত্রপাতি দেখার জন্য, দরপত্রের পণ্যের মান দেখার জন্য চলে বিদেশ সফর। এ সফরগুলো কার জন্য কোনটা প্রয়োজন তা বিবেচনায় রাখারও প্রয়োজন পড়ে না। শুধু চাই বিদেশ সফর, তা সে যত বিচিত্র বিষয়েই হোক না কেন? দেশের সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারে না, দেশের কোনো মানুষ খিচুড়ি রান্না শিখতে বিদেশে যেতে পারে, পুকুর কাটা শিখতে বিদেশ যেতে পারে। সরকার তার ব্যবস্থাপনা মেধার ভিত্তিতে গড়ে তুলবে নাকি লাঠির শক্তিতে গড়ে তুলবে তার একান্ত স্বাধীনতা মসনদের। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে সরকার লাঠির শক্তির ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর লাঠির ওপর ভর করে চললে তো এমনটাই হওয়ার কথা।
দেশে জনবলের দক্ষতা, দায়বদ্ধতা জবাবদিহির চলমান এমন পরিস্থিতি নিয়েই উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা এগিয়ে চলেছে। রাজনীতিকদের ভবিষ্যৎ তহবিল গঠনের সুযোগ সৃষ্টির পথকে মসৃণ করতে গিয়েই আজকের অবস্থা। চেইন অব কমান্ড বলতে কিছু আছে বলেই মনে করা যাচ্ছে না। সবাই নিজের মতো অবাধে, সবকিছু করার অধিকারী হয়ে গিয়েছে। ঘুষখোর অবাধে ঘুষ খাচ্ছে, সন্ত্রাসী অবাধে রাহাজানি করছে, কালোবাজারি অবাধে কাজ করছে, জুয়াড়ি অবাধে জুয়া খেলছে দেখার কেউ নেই। কখন যে এসব পরিবর্তন এসে গেছে, আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে সাধারণ মানুষ ধারণাই করতে পারছে না। তারা স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের মধ্যেই আটকে আছে।
পরিশেষে, তারাপদ রায়ের ‘আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে’ কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে শেষ করছি :
“আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেবেছিলাম
যার উদ্দেশ্যে ধ্রুপদী বিন্যাসে কয়েক অনুচ্ছেদ
প্রশস্তি লিখেছিলাম
গতকাল বলাই বাবু বললেন, ‘ঐটি বাঁদরলাঠি গাছ’।
অ্যালসেশিয়ান ভেবে যে সারমেয় শাবকটিকে
আমরা তিন মাস বকলস পরিয়ে মাংস খাওয়ালাম
ক্রমশ তার খেঁকিভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের কবে সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
লেখক : প্রাবন্ধিক। সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ
khairulumam1950@gmail.com