জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম শহর সিডনিতে মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) দুপুর আড়াইটায় একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই সমাবেশে অস্ট্রেলিয়া পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য এবং গ্রিনস পার্টির নেতা সিনেটর ডেভিড শুব্রিজ বলেন, সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় ম্যাগনিটস্কি আইন বাস্তবায়ন হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব অপরাধী গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত, অস্ট্রেলিয়ায় তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সাউথ এশিয়ান পলিসি ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল ভয়েস ফর হিউম্যানিটি এ দুটি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই গুমবিরোধী সমাবেশে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি, বিভিন্ন দেশের সামাজিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ, মিডিয়া, মানবাধিকার কর্মীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে পরিচালিত গুমের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের সংহতি জানান।
সাউথ এশিয়ান পলিসি ইনিশিয়েটিভের সেক্রেটারি শিবলী আব্দুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিডনির এই সমাবেশে এদিন গুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সংহতি জানিয়ে আরো বক্তব্য রাখেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি, শ্রীলঙ্কার তামিল প্রতিনিধি, আরাকানের রোহিঙ্গা প্রতিনিধি, ইন্দোনেশিয়ার ওয়েস্ট পাপুয়ান প্রতিনিধি, ভারতের কাশ্মিরী ও শিখ প্রতিনিধি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জামায়াতের প্রতিনিধিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ।
অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি নাদিনা ডিক্সন এবং আঙ্কেল ডেভ বেল যৌথভাবে এদেশের ফার্স্ট ন্যাশন বা আদিবাসীদের কথা স্মরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।
সিনেটর ডেভিড শুব্রিজ বলেন, আমরা যে মাটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলছি একদিন এখানেই আদিবাসীদের বিরুদ্ধে গুম, খুন, অন্যায় গ্রেপ্তারের মতো সহিংস অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। আজ সেই ঐতিহাসিক অপরাধের প্রতিকার চেয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপহরণ করে গুম করার এই মানবতাবিরোধী অপরাধ এখনো পৃথিবীর অনেক দেশে ঘটে চলছে। শ্রীলঙ্কার কোনো রাস্তায় সাদা ভ্যানে, অথবা ওয়েস্ট পাপুয়ার কোন গ্রামে মিলিটারির হাতে অথবা বাংলাদেশের খুনী বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান যে গুমের ঘটনা এখনো ঘটিয়ে চলেছে, সবগুলো অপরাধের প্রকৃতি একই। এই অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের অস্ট্রেলিয়ান সরকারকে আরো কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরো পৃথিবীর মানুষ এই গুমের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান সরকার যদি এখনো চুপ করে থাকে তাহলে তা হবে অদূরদর্শী এক সিদ্ধান্ত। আমাদের সংসদে ম্যাগনিটস্কি আইন অনুমোদিত হয়েছে। এখন এই আইনের মাধ্যমেই আমরা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের মতো খুনিদের এবং তাদের গুরু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারি।
অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন সিনেটর লী রিয়ানন তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সরকার গুমের মতো যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়ন করার জন্য সবাইকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করতে হবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি ভেরোনিকা কোমান বলেন, সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি ছড়ানোর জন্য গুমের মতো জঘন্য অপরাধকে বিভিন্ন দেশে কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার সম্পর্কে আমরা সচেতন। এই জঘন্য অপরাধটি সমাজকে ধ্বংস করে দেয়।
শ্রীলঙ্কার তামিল সংগঠনের প্রতিনিধি রেনুগা ইনপাকুমার তার দেশে তামিল জনসংখ্যার ওপর চালানো সরকারি নির্যাতনের হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা করে বলেন, বাংলাদেশের পর বর্তমান পৃথিবীতে গুমের সংখ্যায় শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলমান এই জঘন্য অপরাধ পুরো পৃথিবীর মানুষের জন্য লজ্জার।
ভারতের শিখ কৃষক সংগঠনের উপর চলমান রাষ্ট্রীয় গুম-খুনের কথা বলেন আমর সিং, কাশ্মীরিদের উপর চলমান নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বর্ণনা দেন আনজুম রফিকী, ওয়েস্ট পাপুয়ান নির্যাতিতদের কথা বলেন জো কলিন্স, আরকানের রোহিঙ্গাদের কথা বলেন মোহাম্মদ রউফ।
সমাবেশে বাংলাদেশে সরকারী বাহিনী কর্তৃক গুমের শিকার মানুষদের ও তাদের স্বজনদের কথা তুলে ধরেন বিএনপি অস্ট্রেলিয়ার নেতা মো. মোসলেহ উদ্দিন হাওলাদার আরিফ এবং জামায়াতের প্রতিনিধি ফারুক হোসাইন।
তারা জানান, বছরের পর বছর চলে যাওয়ার পরও ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, আমান আযমী, ব্যারিষ্টার আরমানসহ গুম হয়ে যাওয়া শত শত মানুষের পরিবারের সদস্যরা আজও অপেক্ষায় আছে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ও অত্যাচারী স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীতে গণপ্রতিরোধ এবং সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের গুম হয়ে যাওয়া মানুষদের স্মরণে এই সমাবেশে গান পরিবেশন করেন জনতার কবিয়াল খ্যাত গায়ক রাহাত শান্তনু এবং কবিতা আবৃত্তি করেন হাবিব রহমান। আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপি নেতা মো. কুদরতউল্লাহ লিটন, সোহেল মাহমুদ ইকবাল, রাশেদ খান, মোহাম্মদ হায়দার আলী প্রমুখ।
আয়োজক কমিটির প্রতিনিধি, অস্ট্রেলিয়া বিএনপির প্রতিষ্টাতা এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত একমাত্র বাংলা পত্রিকা সুপ্রভাত সিডনির প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ইউসুফের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে এদিন সিডনির এই গুমবিরোধী সমাবেশ শেষ হয়।
অনুষ্ঠানটির আগে একই দিন দুপুরে সিডনির বাংলাদেশি কনসুলেট জেনারেল মোহাম্মদ আশফাক হোসেনের কাছে বাংলাদেশ চলমান গুমের বিরুদ্ধে একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করা হয়। স্মাারকলিপিতে আয়োজকরা বাংলাদেশে চলমান এই মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিকারের জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন, গুমের শিকার সকল ভিকটিমের প্রত্যার্পণ এবং জাতিসংঘের কমিশনের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ সহযোগিতার দাবি জানান।