মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটের প্রান্তিক সহকারী ছিলেন এস এম তোহা ও উজ্জ্বল হোসেন (অংকুর)। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মচারী তারা। এখন অবশ্য অন্য জায়গায় বদলি করা হয়েছে তাদের, তবে বিআইডব্লিউটিসিতেই আছেন।
পাটুরিয়ায় থাকার সময় ফেরির টিকিট (নম্বর) ও গাড়ির নম্বর জালিয়াতি করে বিপুল বিত্ত হস্তগত করেছেন তারা। টানা আড়াই বছর জালিয়াতির মাধ্যমে তারা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় ৭ কোটি টাকা। জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হওয়ায় তাদের গত নভেম্বরে বদলি করা হয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ না আসায় তাদের আপাতত শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়েছে। এস এম তোহা আপনার ভাই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ভাই হোক আর যেই হোক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সংস্থার কার্যক্রম আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের মার্চে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ রুটে চলাচলকারী ফেরিতে যানবাহন পারাপারের জন্য সফটওয়্যারের মাধ্যমে টিকিট দেওয়া শুরু করে বিআইডব্লিউটিসি। প্রথম দিকে কম্পিউটার চালনায় পারদর্শীদের ই-টিকিট বিক্রির দায়িত্ব দেয় কর্তৃপক্ষ। অন্য অফিসারদের সঙ্গে দায়িত্ব পান এস এম তোহা শিকদার ও উজ্জ্বল হোসেন অংকুর। দিনে ২৪ ঘণ্টায় তিনটি শিফট ছিল। দুপুরের শিফটে নিয়মিত দায়িত্বপালন করতেন তারা দুজন। তারা কম্পিউটার থেকে একটি সিরিয়াল নম্বর (টিকিটের) ও গাড়ির নম্বর ব্যবহার করে একাধিক টিকিট প্রিন্ট করতেন। ওই টিকিটগুলোতে দেওয়া গাড়ির নম্বর কেটে কলম দিয়ে নতুন নম্বর লিখে দিতেন।
কম্পিউটারে প্রিন্ট করা টিকিটে গাড়ির নম্বর হাতে লেখার বিষয়ে ওই নৌরুটে চলাচলকারী বাসের ঘাট-প্রতিনিধির অভিযোগ আমলে নেননি বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাটের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের ঘাট-প্রতিনিধি দেলোয়ার হোসেন বেশ কয়েকবার অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। কারণ এস এম তোহা শিকদার নিজেকে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামানের আত্মীয় পরিচয় দিতেন এবং উজ্জ্বল হোসেন অংকুরের বাড়ি পাটুরিয়া ঘাট এলাকায়।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা কোনো একটি সিরিয়াল ও গাড়ির নম্বর ব্যবহার করে একাধিক টিকিট প্রিন্ট করে পরে সেগুলোতে গাড়ির নম্বর হাতে লিখে বিক্রি করতেন। কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট হওয়া একটি সিরিয়াল ও গাড়ির নম্বরের বিপরীতে বাস পারাপারের ফেরিভাড়া ১ হাজার ৮৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হতো। কিন্তু হাতে লেখা টিকিটগুলোর ভাড়া বাবদ টাকা তারা নিজেরা নিতেন।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের দেলোয়ার হোসেন অংকুর ও তোহার ডিউটিকালে কাউন্টার থেকে ২০টি বাসের টিকিট নেন। তিনি দেখতে পান, মাত্র একটি টিকিটে কম্পিউটারে প্রিন্ট করা সিরিয়াল ও গাড়ির (বাস) নম্বর ছিল। বাকিগুলোতে গাড়ির নম্বর হাতে লেখা ছিল। বিষয়টি নিয়ে দেলোয়ার হোসেন ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্টে দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন। ওই অফিসারকে তিনি বলেন, ‘আমি ২০টা টিকিট নিয়েছি, ১৯টা টিকিটেরই গাড়ির নম্বর কাটা। আমার কোম্পানির লোক এটা মানবে না। টিকিটগুলো বিআইডব্লিউটিসির ওই কর্মকর্তা হাতে নিয়ে দেখেন একটা সিরিয়াল নম্বরে ২০টা টিকিট প্রিন্ট করা হয়েছে। গাড়ির নম্বরও একই ছিল, তা হাতে কেটে গাড়ির অন্য নম্বর লিখে দেওয়া হয়েছে। ওই অফিসার গ্রুপ লিডার রবিউল হাসান তাহেরী, গ্রুপ অফিসার মহিউদ্দিন রাসেল ও ম্যানেজার আব্দুস সালামকে ডেকে আনেন জিরো পয়েন্টে। তাদের টিকিটগুলো দেখানো হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
আহূত কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সাহস পাননি। কারণ এস এম তোহা পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামানের ভাই। জিরো পয়েন্টে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা বিষয়টি বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানকে জানানোর হুমকি দেওয়ার পর দুই মাস কর্মচারী দুজনকে দায়িত্বপালন থেকে বিরত রাখা হয়। এতে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন অংকুর ও তোহা। জিরো পয়েন্টে দায়িত্বপালনকালে যে কর্মকর্তা টিকিট-জালিয়াতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আনেন, তাকে স্থানীয় সাংবাদিক দিয়ে হেনস্তা করান তারা। ট্রাক পারাপারের কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকালে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফেরিভাড়ার অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে ট্রাকচালকদের বক্তব্য রেকর্ড করে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যানের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেন তারা। পরে পাটুরিয়া ঘাট পরিদর্শনে যান সংস্থার পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান। তিনি তোহা ও অংকুরকে দায়িত্বপালন থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিয়ে আসেন। ২০২১ সালের ১৮ নভেম্বর অংকুরকে দৌলতদিয়া ঘাটে ও তোহাকে পিরোজপুরের বড় মাসুয়া ঘাটে বদলি করা হয়। এস এম তোহা এবং অংকুর যেদিন বাস কাউন্টারে ডিউটিতে থাকেন সেদিন বাস পারাপারের সংখ্যা কমে যায় গড়ে ৪০টি করে। বিষয়টি ধরার জন্য ওই অফিসার বাস-বুকিং এবং ফেরি পারাপার রেজিস্টার মিলিয়ে দেখারও অনুরোধ জানান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া কার্যালয়ের টার্মিনাল সুপারিনটেনডেন্ট রবিউল হাসান তাহেরী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু বলার বা করার নেই।’
প্রতিদিন পাটুরিয়া দিয়ে ফেরি পার হওয়া দুই শতাধিক বাসের মধ্যে গড়ে ৪০টি করে বাসের টিকিট জালিয়াতি করতেন অংকুর ও তোহা। প্রতিটি বাসের তৎকালীন ফেরিভাড়া ১ হাজার ৮৫০ টাকা হিসাবে দিনে প্রায় ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তারা। মাসে গড়ে ২৪ লাখ টাকা। আড়াই বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ কোটি টাকার বেশি।
এ বিষয়ে গোল্ডেন লাইন পরিবহনের পাটুরিয়া ঘাট সুপারভাইজার দেলোয়ার হোসেন গত রবিবার বলেন, ‘একদিন ১৯টি টিকিট হাতে লিখে দেওয়ার পর বিষয়টি ঘাটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হলে আমাকে কম্পিউটার প্রিন্ট টিকিট দেয়। ওই ঘটনার পর থেকে আমার সঙ্গে এমন ঘটনা আর ঘটেনি।’
বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রাসেল গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোল্ডেন লাইন পরিবহনের হাতে লেখা ছয়টি টিকিট পাওয়ার পর থেকে অংকুর ও তোহাকে কাউন্টারে ডিউটি দেওয়া বন্ধ রাখা হয়। পরে উজ্জ্বল হোসেন অংকুরকে দৌলতদিয়া ঘাটে ও এস এম তোহাকে বড় মাসুয়া ঘাটে বদলি করা হয়েছে।’
উজ্জ্বল হোসেন অংকুর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে বদলি করেছেন। পাটুরিয়া ঘাটের বাস কাউন্টারে টিকিট-জালিয়াতির কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ এস এম তোহার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।